ক্রাইম ডায়েরী - এপ্রিল ১৩, ২০১৫

চট্টগ্রামে নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘শহীদ হামজা ব্রিগেড’

hamza brigade
চট্টগ্রামে ‘শহীদ হামজা ব্রিগেড’ (এসএইচবি) নামে নতুন একটি সামরিক জঙ্গি সংগঠনের সন্ধানের দাবি করেছে র‌্যাব। যাদের প্রতিটি ইউংয়ে সাতজন করে সদস্য ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’ হিসেবে প্রশিক্ষিত। মিয়ানমারের নির্যাতিত মুসুলমানদের সাহায্য করতেই নাকি তারা ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে নগরীর ফয়েস লেক এলাকার একটি হোটেলে এই জঙ্গি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটান।

রোববার রাতে এক অস্ত্রব্যবসায়ীসহ তিন জঙ্গিকে আটক করার পর সোমবার দুপুরে পতেঙ্গা সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্টে কর্ণেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ এ দাবি করেন।

তিনি আরো দাবি করেন, ‘শহীদ হামজা ব্রিগেডের সদস্যারা

পূনাঙ্গ সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে তাদের পরিকল্পনা মত কাজ শুরু করেছিল। তবে তিন স্তরের ভাগ হয়ে অপারেশনে অংশ নেয়া নতুন এই জঙ্গি সংগঠনের কার্যক্রম র‌্যাবের তৎপরতায় আর বেশি দূর এগুতে পারেনি। তাদের প্রত্যেককেই ইতোমধ্যে আটক করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে হাটহাজারীর আলীপুর মাদ্রাসা, বাঁশখালীর লটমনি পাহাড় ও হালিশহরে আবাসিক এলাকায় জঙ্গি আস্তানার সন্ধানের সাথে আটক তিন জঙ্গির কার্যক্রম একই সূত্রে গাঁথা। তারা মূলত মিয়ানমারের নির্যাতিত মুসুলমানদের সহযোগিতা করতেই নতুন এই জঙ্গি সংগঠন গড়ে তোলেন।’

র‌্যাবের অভিযানে আটক হওয়া তিন জঙ্গি সদস্য হলো-সাব্বির আহমেদ মুহিত (২৩), কামাল উদ্দিন মোস্তাফা (২৪) ও আশরাফ আলী আদনান (২৫)। এছাড়া তাদের অস্ত্র সরবরাহকারি ব্যবসায়ী মোজাহের হোসেন (৩৫)।

এসময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়, ৫টি একে ২২, ৫টি বিদেশী পিস্তল, ৩ হাজার ৬৬৮ রাউন্ড গুলি ও ১৪টি ম্যাগাজিনসহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি।

সোমবার দুপুর আড়াইটায় র‌্যাব-৭ এর সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লে.কর্ণেল মিফতাহ জানান, র‌্যাব গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পায়, জঙ্গিদের কাছে অস্ত্র বিক্রির জন্য নগরীর কোতোয়ালী থানার মিড টাউন হোটেলে ২৫৯ নম্বর কক্ষে অস্ত্র ব্যবসায়ী মোজাহের হোসেন অবস্থান করছেন। সোমবার রাত সাড়ে ১০টায় সেখানে অভিযান চালিয়ে জঙ্গি সদস্য সাব্বির আহমেদ ও মোজাহেরকে আটক করা হয়। এসময় হোটেলর ওই কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয়-৪টি বিদেশী ৭.৬৫ মিলি মিটারের পিস্তল, ৪টি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ১ হাজার রাউন্ড পয়েন্ট ২২ বোরের গুলি, ১২ রাউন্ড ৭.৬৫ মিলি মিটার পিস্তলের গুলি এবং ১টি মটর সাইকেল।

তাদের স্বীকারোক্তিতে রোববার রাতে ঢাকায় যাওয়ার প্রস্তুতিকালে আকবর শাহ থানার এ কে খান মোড়ের শ্যামলী বাস কাউন্টার থেকে কামাল উদ্দিন ও আশরাফ আলীকে আটক করা হয়। এসময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়-২টি ট্যাব, ৪টি মোবাইল ফোন।

পরবর্তীতে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদে এই চারজনের স্বীকারোক্তিতে, নগরীর পাঁচলাইশ থানার কসমোপলিটন আবসিক এলাকার ৯ নম্বর রোডের ৫১ নম্বর হাউসের গ্রীন বাংলা জাহানারা এপার্টমেন্টের ৭ম তলায় জনৈক মাসুদ রানা ফাহদের বাসায় তাদের অস্ত্র ভাণ্ডার মজুদ রয়েছে। সোমবার সকালে সেখানে অভিযান চালিয়ে একটি স্টিলের আলমারির ভেতরের ভেতর সুকৌশলে লুকিয়ে রাখা ৫টি একে ২২, ১টি বিদেশী পিস্তল, ১টি এসবিবিএল বন্দুক, ১টি এলজি, একে-২২ এর ১০টি ম্যাগাজিন, ১টি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ২১৫৫ রাউন্ড পয়েন্ট ২২ বোরের গুলি, ৫০১ রাউন্ড শর্টগানের গুলি উদ্ধার করা হয়। একই সাথে বিভিন্ন প্রকারের অস্ত্র সঞ্চালন, গোয়েন্দা নজরদারি ও সমর কৌশল বিষয়ক কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়।

কর্ণেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘চট্টগ্রামের হাটহাজারীর আলীপুর থেকে আটক ১২ জন, বাঁশখালীর লটমনি পাহাড় থেকে আটক ৫জন ও হালিশহর থেকে ৩ জনকে গ্রেপ্তারের পর তাদেরই স্বীকারোক্তিতে নতুন এই জঙ্গি সংগঠনের সন্ধান পায়। গত রোববার রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে এক অস্ত্র ব্যবসায়ীসহ তিন জঙ্গিকে আটক করা হয়। শহীদ হামজা বিগ্রেড নামে একটি নতুন জঙ্গি সংগঠন তৈরি করেছে তারা। এই সংগঠনে প্রাথমিকভাবে ২৫ জনের জড়িত থাকার সম্পৃক্ততা পেয়েছি। এদের প্রায় সকলকেই আমরা গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। বাকীদেরও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘মূলত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অভাবী ছেলেদের নিয়ে এসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্যাতিত মুসুলমানদের ভিডিও চিত্র দেখিয়ে তাদের জিহাদে উদ্বুব্ধ করা হয়। সেখান থেকে শারীরিক, মানসিক ও অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশ-বিদেশে বিশেষ করে মিয়ানমারে নির্যাতিত মুসুলমানদের ওপর নির্যাতনের প্রতিশোধ নেয়। একাজে তারা দলে নিচ্ছেন, যারা জঙ্গি মনোভাবাপন্ন, উগ্রধর্মীয় চিন্তা চেতনায় বিশ্বাসী ও ইসলামী ছাত্র-শিবিরের উচ্চ বিলাসী কর্মীদের।’

‘তারা অন্য জঙ্গি সংগঠনের মত করে নিজেরাই একটি জঙ্গি সংগঠন দাঁড় করিয়েছে। এর নাম হচ্ছে ‘শহীদ হামজা ব্রিগেড’ (এসএইচবি)। এই সংগঠনের তিনটি অংশ আছে, ব্লু, গ্রিন ও হোয়াইট। এই সব অংশ হচ্ছে তাদের সামরিক ইউং। এছাড়া তাদের একটি মিডিয়া ইউংও করার কথা ছিল। ব্লু ও গ্রিন ইউংয়ের প্রধান হচ্ছেন মনিরুজ্জামান মাসুদ। তার সেকেন্ড ইন কমান্ড হচ্ছেন তারেক বা ডন। আর মিডিয়া ইউংয়ের প্রধান হচ্ছেন আবদুল্লাহ। এরা তিন জনই আমাদের হাতে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাদের এই তিনটি ইউংয়ের প্রতিটিতে সাতজন করে সদস্য রয়েছে। এই জঙ্গি সংগঠনে এখনো পর্যন্ত ২৫ জনের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।’ বলেন র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক।

জঙ্গি অভিযোগে আটক সকলের কাছ থেকে উদ্ধার করা সরাঞ্জামাধি ও প্রশিক্ষণের সাথে সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণের সাদৃশ্য থাকার দাবি করছে র‌্যাব। তাদের সাথে সাবেক বা বতর্মান কোন সামরিক বাহিনীর সদস্য জড়িত কিনা ? এমন প্রশ্নের উত্তরে লে.কর্ণেল মিফতাহ বলেন, ‘তাদের জিজ্ঞাসাবাদের সামরিক বাহিনীর সাবেক বা বর্তমান কোন সদস্য জড়িত থাকার তথ্য আমরা পায়নি। এছাড়া তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা একে ২২ অস্ত্রও আমাদের সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে না। এগুলো চাইনিজ অস্ত্র তারা চোরাই পথে এসব অস্ত্র কিনে ব্যবহার করছে। তবে তারা গ্রেনেড কিংবা ভারী মরণাস্ত্রের ব্যবহারবিধি ভালো করেই কাগজে কলমে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এজন্য ইন্টারনেট থেকে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে থাকে তারা।’

জঙ্গিদের কৌশল সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আটক হওয়া এসব জঙ্গিরা শুধুমাত্র অস্ত্রের কিংবা শারীরিক প্রশিক্ষণই নিচ্ছেনা। তারা আইন-শৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে মোবাইল ব্যবহার পদ্ধতির উপর প্রশিক্ষণ নিয়েছে। তারা কোন সিম ব্যবহার করবে, কিভাবে করলে মোবাইল ট্র্যাকিং এড়ানো যায়, ফোনে আড়িপাতা রোধ করা যায় এসব সবই তাদের জানা আছে। তারা শুধুমাত্র নিজেদের মধ্যেই ফোনে যোগাযোগ মেইনটেইন করে থাকে।’

মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আটক চার জনের মধ্যে মোজাহের মূলত একজন পেশাদার অস্ত্র ব্যবসায়ী। তিনি ভারতের মিজরাম থেকে অস্ত্রগুলো নিয়ে এসে ২ লাখ টাকায় কিনে এদের কাছে তিন লাখ টাকায় বিক্রি করছেন। এছাড়া সাব্বির আহমেদ মুহিত এই মোজাহেরের কাছ থেকে অস্ত্র কিনতে গিয়ে মূলত র‌্যাবের হাতে ধরা পড়ে। তার স্বীকারোক্তিতেই মোজাহেরসহ আটক অন্য দুই জঙ্গি কামাল উদ্দিন ও আশরাফ আলীকে আটক করা হয়। তারা তিনজনই হাটহাজারীর আলীপুরের আবু বক্কর মাদ্রাসা থেকে তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ শেষে বাঁশখালীতে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘আটক হওয়া এসব জঙ্গিদের মূলত মানিসক, শারীরিক ও সামরিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন ওয়ান ম্যান আর্মি হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। কিভাবে কথা বলতে হবে, চলতে হবে, অস্ত্র চালাতে হবে এসব প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এমনকি ধরা পড়ার পর যাতে রিমান্ডে কোন তথ্য স্বীকার না করে সেই ব্যাপারেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাদের কি কি করা হতে পারে তার আগাম একটি মহড়া তাদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে। চোখ বেঁধে, হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করে, গরম পানির ছিটা দিয়ে এসব বিষয়ে অভ্যস্ত করা হয়েছে।’

আটক হওয়াদের সাথে আফগান ফেরত বা আইএস এর কোন জঙ্গি জড়িত কিনা জানতে চাইলে মিফতা বলেন, ‘এখন পর্যন্ত তদন্তে বা স্বীকারোক্তিতে এদের সাথে এরকম কোন সংগঠনের জড়িত থাকার সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। বাকীটা তদন্ত করে বলা যাবে। তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।’

তাদের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এখনো পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম চট্টগ্রামেই সীমাবদ্ধ বলে মনে হচ্ছে। তবে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ইয়াং ছেলেদের নিয়ে এসে এসব জঙ্গি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।’

অর্থের সন্ধানের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘তাদের অর্থের সন্ধানদাতাদের সনাক্তে কাজ চলছে। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়েছি। তবে তাদের যে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে সেখানে কোন টাকা জমা হতো না। হুন্ডির মাধ্যমে তাদের কাছে টাকা আসতো এরপর তারা নিজেদের অ্যকাউন্টে এসব টাকা জমা করতো আর উত্তেলন করতে।’

তবে সংবাদ সম্মেলনে আটক তিন জঙ্গিসহ চারজনেক হাজির করা হলেও তাদের সাথে কোন কথা বলতে দেয়নি র‌্যাব সদস্যরা।


আরও পড়ুন