ক্রাইম ডায়েরী - মে ১৩, ২০১৫

রহস্যময় আনসারুল্লাহর সিরিয়াল কিলিং

Bloger death
ঢাকা: একের পর এক মুক্তমনা লেখক ও ব্লগার খুনের ঘটনায় কোনো কুলকিনারা করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিশেষ করে এসব হত্যার দায় স্বীকার করা আনসারুল্লা বাংলা টিমের নেতাদের কোনো হদিসই বের করতে পারছে না তারা। অনলাইনে সংগঠনটির নানা কার্যক্রম চোখে পড়লেও বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে একের পর এক খুন এবং আনসারুল্লা কর্তৃক তার দায় স্বীকারের ঘটনা আরো রহস্য তৈরি করছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, বিচ্ছিন্নভাবে এবং কয়েকটি হত্যার ঘটনায় কয়েকজন কর্মী ধরা পড়লেও আনসারুল্লার নেতৃস্থানীয় কারো ব্যাপারে কোনো তথ্য মিলছে না। এমনকি দেশে অথবা বিদেশে কোন স্থান থেকে কারা এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে সে ব্যাপারেও অন্ধকারে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফলে হাজার চেষ্টা করেও মুক্তমনা লেখক ও ব্লগারদের হত্যার ঘটনা ও হুমকির বিষয় তদন্ত করতে গিয়ে বেশিদূর এগোতে পারছে না পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

গত তিন মাসে একে একে তিন ব্লগার খুন হয়েছেন। আড়াই মাসের মধ্যে অভিজিৎ রায় ও ওয়াশিকুর রহমান বাবু রাজধানীতে প্রকাশ্যে হত্যার শিকার হন। সে ঘটনার রেশ কাটার আগেই মঙ্গলবার সিলেটে অনন্ত বিজয় দাশ খুন হলেন। প্রতিটি ঘটনায়ই আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামের জঙ্গী সংগঠন জড়িত বলে ধারনা করা হচ্ছে।

অনন্ত বিজয় দাশ খুনের পর টুইটারে এ হত্যার দায় স্বীকার করেছে অনসারুল্লাহ বাংলা টিম-৮। কিন্তু এ বার্তা প্রেরকদের ব্যাপারে কোনো তথ্য নেই পুলিশের কাছে। অনসারুল্লাহর মাঠ পর্যায়ের কিছু কর্মী-সমর্থকের সন্ধান পেলেও নেতৃত্ব ও সংগঠনের অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছে না তদন্তকারীরা।

জঙ্গিগোষ্ঠী তালিকা প্রকাশ করে প্রগতিশীল ও মুক্তমনাদের হত্যার ধারাবাহিক কার্যক্রম চালালেও বাংলাদেশে তাদের অস্তিত্ব ও নেতৃত্ব সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি অনলাইনভিত্তিক তৎপরতা প্রতিরোধেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে অনেকটা বেকায়দায় পড়েছেন পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দারা।

পুলিশের মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক মঙ্গলবার বলেন, বাংলাদেশে আল-কায়েদার অস্তিত্বের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে বাংলাদেশের কোনো সংগঠন তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষা করে কাজ করছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কিছু ব্যক্তি ব্লগারদের হত্যার জন্য ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। তারা ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যোগাযোগ রাখে। কিন্তু মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে না। ফলে হত্যাকাণ্ডের পর তাদের গ্রেপ্তারে নতুন করে কৌশলী হতে হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন হত্যাসহ ঘটনার দায় স্বীকার করে টুইট বার্তা দিলেও আনসারুল্লাহ গ্রুপের নেতৃত্ব ও অবস্থান সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়নি। তবে অভিজিৎ হত্যায় জড়িত বলে কয়েকজনকে সনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আল কায়েদাসহ আর্ন্তজাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীর পক্ষে বাংলাদেশে কারা কাজ করছে তা জানতে অনুসন্ধান চলছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা অনলাইনভিত্তিক কাজ করছে। আর তারা মাঠ পর্যায়ে নিজেদের কোনো সদস্য নয় এমন লোক বিশেষ করে মাদ্রাসা ছাত্রদের ব্যবহার করছে কৌশলে।’

মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ইতোমধ্যে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের মাধ্যমে জানা গেছে আল-কায়েদাসহ আর্ন্তজাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীর সদস্য তারা নয়। কিন্তু ‘মোটিভেশনের’ কারণে তারা অন্যদের কাজে সহায়তা করেছে।’

র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘জঙ্গিবাদ নির্মূলে র‌্যাব বরাবরই তৎপর। সিলেটে ব্লগার খুনের ঘটনা জানার পর সেখানে কর্মকর্তারা গেছেন এবং পর্যবেক্ষণ করছেন। এ ব্যাপারে তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে র‌্যাব কঠোর ব্যবস্থা নেবে। র‌্যাব ইন্টিলিজেন্স জঙ্গিদের ব্যাপারে নানা খোঁজ খবর নিচ্ছে।’

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের অক্টোবরে আনসরুল্লাহ বাংলা টিমের তাত্ত্বিক নেতা মুফতি জসিম উদ্দিন রাহমানিকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সে সময় কয়েকদফা হেফাজতে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মেলে। পরবর্তীতে এই তাত্ত্বিক নেতার তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় ওই নেতার কার্যালয়ে তল্লাশি চালিয়ে ৮৪ জনের নাম সম্বলিত ৩২ পৃষ্টার একটি তালিকা পায় ডিবি। ওই তালিকাভুক্তদের মধ্যে অনন্ত বিজয়, অভিজিৎ রায়, রাজিব হায়দার, আসিফ মহিউদ্দিনের নামসহ আরো অনেক ব্লাগারের নাম পাওয়া যায়। সে তালিকা থেকে এরই মধ্যে তিনজনকে খুন করা হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন হামলার শিকার হয়েছে। গোয়েন্দাদের ধারণা, হত্যার উদ্দেশ্যেই ওই তালিকা তৈরি করে আনসারুল্লাহ। মুফতি জসিম উদ্দিন রাহমানিকে ব্লাগার রাজিব হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ইতিমধ্যে এ মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা সবাই নিজেদের আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য বলে দাবি করেছে। কিন্তু কারাবন্দী রাহমানির অবর্তমানে কারা সংগঠন চালাচ্ছে সে ব্যাপারে মুখ খুলছে না কেউই।

সিরিয়াল ব্লগার হত্যার ব্যাপারে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার বলেন, ‘মুক্তচিন্তায় বাধাদানকারীরাই ব্লগারদের টার্গেট করে হত্যা করছে। আর খুনিরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় একের পর এক ব্লগারকে হত্যা করা হচ্ছে। উগ্রবাদী এ চক্রকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় তারা এখন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।’

হত্যার তদন্তে অগ্রগতি নেই: ব্লগার অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত এখনো পর্যন্ত কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। গোয়েন্দা পুলিশের দাবি, তারা অন্তত চার জন সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিনেও এসব সন্দেহভাজন আটক না হওয়ায় বাড়ছে হতাশা। অন্যদিকে ওয়াশিকুর হত্যাকাণ্ডে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও হত্যার প্রধান আসামি ও মূল পরিকল্পনাকারীরা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। এমনকি হত্যাকাণ্ডে প্রকৃতপক্ষে কোনো সংগঠন জড়িত কি না তা নিয়েও অন্ধকারে রয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। তবে ওয়াশিকুর হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তারকৃত একজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ফেসবুকে ইসলাম বিরোধী লেখালেখির কথিত কারণে ওয়াশিকুরকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার তিন জনের মধ্যে সাইফুল নামে একজন আদালতের জবানবন্দিতে বলেছে, গত ২৩ মার্চ যাত্রাবাড়ির নয়ানগরের একটি বাসায় বৈঠক করে হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করা হয়। ওই বৈঠকে ‘মাসুল’ (ইকবাল), প্রশিক্ষক ‘বড় ভাই’, শরীফ, তাহের, আবরার, জিকরুল্লাহ, আরিফুল ও সে (সাইফুল) উপস্থিত ছিল। হত্যার মূল দায়িত্বে ছিল তাহের। তাদের জঙ্গি প্রশিক্ষকের নাম হাসিব ওরফে আবদুল্লাহ। এই হাসিব আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের সদস্য বলে ধারণা করা হচ্ছে।’

সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা এক সময় জেএমবির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে তারা আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের প্রধান জসিমউদদীন রাহমানির আদর্শে অনুপ্রাণিত হন।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর ঢাবি ক্যাম্পাসের টিএসসির সামনে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় অভিজিৎ রায়কে। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একই কায়দায় ড. হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা করা হয়েছিল। ওই বছরের ১১ আগস্ট জার্মানিতে মারা যান তিনি। ব্লগার রাজীব হায়দারকে ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি পল্লবীতে নিজ বাসার সামনে হত্যা করা হয়। গত ৩০ এপ্রিল তরুণ ব্লগার ওয়াশিকুর রহমানকে তেজগাঁওয়ে একইভাবে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া গত বছরের ২৭ আগস্ট রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় চ্যানেল আইয়ের ইসলামী অনুষ্ঠানের উপস্থাপক নুরুল ইসলাম ফারুকীকে গলা কেটে হত্যা; ২০১৩ সালে রাজধানীর গোপীবাগে সিক্স মার্ডার, বুয়েটের ছাত্র দ্বীপ হত্যা; গত বছর রাজশাহী বিশ্বদ্যিালয়ের শিক্ষক ড. শফিউল আলম হত্যা এবং আশুলিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আশরাফুল হত্যাসহ বেশ কয়েকটি ঘটনায় একই ধরনের জঙ্গিদের সন্দেহ করা হচ্ছে।


আরও পড়ুন