ভাষার চর্চা ও ব্যবহারে আমি অসন্তুষ্ট : অধ্যক্ষ শামসুল হুদা

samsul-huda-2

রুমন চক্রবর্তী (স্টাফ রিপোর্টার) : বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ছিল মায়ের ভাষাকে রক্ষার সংগ্রাম। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই ছিল ‘ভাষা আন্দোলন’। মায়ের গর্ভ থেকে যে শিশুটি বুঝতে পেরেছিল তার মুখের ভাষা বাংলা, তার ভাষাকে রক্ষার দাবি জানিয়ে ছিল ভাষা আন্দোলনে। এটা পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আমাদের যোগ্যতারও লড়াই।

 

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠের সঙ্গে তার নিজ বাসভবন ইমামবাড়াতে একান্ত সাক্ষাৎকারে কথাগুলো বলছিলেন কিশোরগঞ্জের ভাষাসৈনিক আ ফ ম শামসুল হুদা।

 

তিনি তখন গুরুদয়াল কলেজের বিএ পরীক্ষার্থী। বাংলা ভাষাকে রক্ষার দাবিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন ভাষা আন্দোলনে। গোপনে মিছিল-মিটিং করেন স্টুডেন্ট ইউনিয়ন সংগঠনের মাধ্যমে।

 

কিশোরগঞ্জ জেলা সদরের কাজী নজরুল ইসলাম রোডে ‘ইমাম বাড়া’ নামক নিজ বাসভবনে বসবাস করছেন ৮৩ বছর বয়সের এ ভাষাসৈনিক। দীর্ঘ ৩৪ বছরের প্রভাষক পদে চাকরিজীবন শেষ করে স্ত্রী, ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

 

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ : স্যার কেমন আছেন?

অধ্যক্ষ আ ফ ম শামসুল হুদা : আল্লাহর রহমতে সুস্থ আছি, ভালো আছি।

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ : আপনি কি  আমাকে কিছু সময় দেবেন?

অধ্যক্ষ আ ফ ম শামসুল হুদা : অবশ্যই। কেউ তো আর এখন জানতে চায় না ভাষা আন্দোলনের কথা। তুমি যখন এসেছ, তোমাকে অবশ্যই বলব।

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ : ভাষা আন্দোলনের সময় আপনার পড়াশোনা কোন পর্যায়ে ছিল?

অধ্যক্ষ আ ফ ম শামসুল হুদা : তখন আমি বিএ পরীক্ষার্থী। গুরুদয়াল কলেজ পড়াশোনা করতাম। ১৯৪৮ সালে করিমগঞ্জ থানার নানশ্রী হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করার পর গুরুদয়াল কলেজে ভর্তি হই।

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ : আপনার সঙ্গে কতজন ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন?

অধ্যক্ষ আ ফ ম শামসুল হুদা : তখন আমরা গুরুদয়াল কলেজের ৯ জন ছাত্র ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম। তৎকালীন সময়ে আমাদের কলেজে স্টুডেন্ট ইউনিয়ন ছিল। স্টুডেন্ট ইউনিয়নের ভিপি ছিলেন আবদুল হক, এজিএস ছিলাম আমি, জিএস ছিলেন গোলাম মহিউদ্দিন, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু তাহের খান পাঠান, আরো অনেকেই ছিল- এ মুহূর্তে সবার নাম মনেও করতে পারছি না। খুব কষ্ট লাগে সেই দিনটির কথা মনে হলে, ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় মুক্তিযুদ্ধে গোলাম মহিউদ্দিনকে বদর বাহিনীর সদস্যরা ডেকে নিয়ে রাতের আঁধারে মুখে গামছা দিয়ে মেরে নরসুন্দা নদীতে ফেলে রাখে।

 

samsul-huda

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ : ভাষা আন্দোলনে আপনার স্মৃতিবিজড়িত কিছু বলুন?

অধ্যক্ষ আ ফ ম শামসুল হুদা : ১৯৫১। তখন মুসলিম লীগ ছিল। যখন জানতে পারলাম উর্দুই হবে এ দেশের রাষ্ট্রভাষা, ছাত্র-জনতার মাঝে অনেক ক্ষোভ আর ঘৃণার জন্ম নিল। আমরা স্টুডেন্ট ইউনিয়নের মাধ্যমে গোপনে গোপনে মিটিং করতাম। আমাদের প্রথম মিটিংটি হয় আশরাফ সাহেবের নেতৃত্বে। নিরাপত্তাজনিত কারণে গোপনে যশোদল ইউনিয়নের জাইল্লা বাজারে। এ ঘটনাগুলো স্মৃতিবিজড়িত এ কারণেই শুধু ছাত্র নয়, ভাষার জন্য আশরাফ সাহেব, রেশন ডিলার সুন্দর আলী, তরুণ লাইব্রেরির মালিক আমিনুল হকদের মতো সাধারণ মানুষও আমাদের সহযোগিতা করেছেন।

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় ভাষা আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা কি আপনার মনে আছে?

অধ্যক্ষ আ ফ ম শামসুল হুদা : ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাবস্থায় আমরা ছাত্র-জনতা মধুর ক্যান্টিনের পাশে আমতলায় মিটিং করতাম। আর মিটিং করার ফলে প্রায় সময়ই সেখানে পুলিশি আক্রমণ হতো। কয়েকবার পুলিশের লাঠিপেটায় আঘাতও পেয়েছি। একবার প্রায় ৪০ জন ছাত্রকে সেখান থেকে গ্রেফতার করে লালবাগ থানায় নিয়ে আসা হয়। পরে শেরেবাংলা ফজলুল হকের মধ্যস্থতায় তাদের ছাড়িয়ে আনা হয়। এ ছাড়া বিশিষ্ট লেখক ও কলামিস্ট বদরুদ্দীন উমরের পিতা আবুল হাসেম ভাষা আন্দোলনের একজন সংগঠক। আমরা প্রায়ই উনার বাসায় গোপনে বিভিন্ন মিটিং করেছি।

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ : যে উদ্দেশ্য আর স্বপ্ন নিয়ে ভাষা আন্দোলন করেছেন, তার কতটুকু সফল বলে মনে করেন?

অধ্যক্ষ আ ফ ম শামসুল হুদা : ভাষা আন্দোলন তো অবশ্যই সফল হয়েছে। আমরা এখন বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারছি, এটা তো ভাষা আন্দোলনেরই ফসল। কিন্তু যতটুকু উচ্চতায় আমাদের ভাষাকে নিয়ে যাওয়ার দরকার ছিল, সেখানে আমরা যেতে পারিনি। এ ব্যাপারটি এখনো আমাকে পীড়া দেয়।

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ : ভাষা আন্দোলনের পর কবে কখন কীভাবে চাকরি জীবন শুরু করলেন? ভাষা আন্দোলনের ওপর কোনো বই কি লিখেছেন?

অধ্যক্ষ আ ফ ম শামসুল হুদা : আমি প্রথম শ্রীকাইল কলেজে ১৯৫৫ সালে দর্শনের প্রভাষক হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করি। তারপর সেখানে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হই, কিছুটা সুস্থ হয়ে ১৯৫৬ সালে কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজে যোগদান করি। পরে গুরুদয়াল কলেজেই টানা ৩৪ বছর চাকরি জীবনে প্রভাষক থেকে অধ্যক্ষ হয়ে কিছুদিন পর অবসর নিই। গুরুদয়াল কলেজের ছাত্র হিসেবে আমিই প্রথম উক্ত কলেজের অধ্যক্ষ হই। ওই রকমভাবে কোনো বই আমি লিখিনি। তবে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন স্কুল, কলেজের সাময়িকীতে লেখালিখি করেছি।

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ : দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে কোনো উল্লেখযোগ্য সম্মাননা কি পেয়েছেন?

অধ্যক্ষ আ ফ ম শামসুল হুদা : উল্লেখযোগ্য সম্মাননা বলতে কি বোঝায় এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। তবে গত ৭-৮ বছর যাবৎ আমাদের প্রশাসনিকভাবে সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে। এবারও চিঠি পাঠিয়েছে। তবে একটু কষ্টের সঙ্গে বলতে হয়, কেন্দ্রীয়ভাবে আন্দোলন যারা করেছেন তাদের নিয়ে বরাবরই আলোচনা করা হয়। কিন্তু মফস্বলে তৃণমূল পর্যায়ে যারা আন্দোলন করেছে, সরকার, জনগণ এবং মিডিয়া কখনোই তাদের নিয়ে আলোচনা করেনি।

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ :  ভাষাসৈনিক হিসেবে নতুন প্রজন্মের জন্য কিছু বলুন?

অধ্যক্ষ আ ফ ম শামসুল হুদা : আমি চাই নতুন প্রজন্ম জানুক, শিখুক। আজ তারা যে ভাষায় কথা বলছে, সে ভাষার জন্য কারা যুদ্ধ করেছিল, কাদের প্রচেষ্টার ফলে আজ আমরা বাঙালি, তাদের জানতে হবে। কিন্তু আমার কিছুটা আক্ষেপ থাকবে কিছু কারণে বছর ২১ ফেব্রুয়ারিতে আমাদের মঞ্চে ওঠানো পর্যন্ত হয়নি এবং কোনো কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। যাদের জন্ম ভাষা আন্দোলনের অনেক পর তারাই আজ বাংলা ভাষা নিয়ে বড় বড় কথা বলছে। নতুন প্রজন্মকে সঠিক তথ্য জানাতে আমাদের বলার সুযোগ করে দিতে হবে।

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ : দেশের বর্তমান ভাষাচর্চা নিয়ে কোনো আক্ষেপ কি রয়েছে আপনার মনে?

অধ্যক্ষ আ ফ ম শামসুল হুদা : অবশ্যই রয়েছে। যত্রতত্র যেভাবে ভাষার চর্চা বা ভাষার ব্যবহার হচ্ছে, আমি তাতে মোটেই সন্তুষ্ট নই। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও আজও আইন-আদালতসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার অত্যন্ত দুঃখজনক। এফএম রেডিও এবং টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভাষার যে ব্যবহার হচ্ছে, এতে ভাষার শালীনতা নষ্ট হচ্ছে।

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ : স্যার আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ, ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়ার জন্য।

অধ্যক্ষ আ ফ ম শামসুল হুদা : তোমাকে ও তোমার সংবাদমাধ্যমকে অনেক ধন্যবাদ আমাকে কিছু বলার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। আমি মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করি।

 

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/০৬-০২-২০১৬ইং/মইনুল হোসেন 

 

 

Comments

comments

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ