পুরুষ নির্যাতন প্রকাশ হয় না : বৈষম্যের শিকার নির্যাতিত পুরুষরা

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ,
অক্টোবর ২৫, ২০১৬ ১২:৪৬ পূর্বাহ্ণ

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ রিপোর্টঃ 

নারী নির্যাতনের খবর ফলাও করে প্রতিদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হলেও পুরুষ নির্যাতনের কথা সেভাবে আসে না। নির্যাতিতদের কেউ শারীরিক, কেউ মানসিক, কেউ দৈহিক-আর্থিক, কেউ সামাজিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন। ঘরে-বাইরে এ ধররের নির্যাতন প্রায়ই ঘটছে। তুলনামূলক কম হলেও নির্যাতিত পুরুষের সংখ্যা এদেশে কম নয়। অথচ নির্যাতনের খবরে নারীদের প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে বর্তমান সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন পুরুষরা। কারণ নারীদের মর্যাদা রায় বিভিন্ন আইন জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০’ এবং ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন-২০১০’ অন্যতম। ‘পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধ’ আইন এখনো সৃষ্টি হয়নি বাংলাদেশে! পুরুষ নির্যাতনবিরোধী ট্রাইব্যুনালও নেই দেশে। ফলে আইনি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেক ভুক্তভোগী। এতে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান, বিদ্যমান আইনেও বৈষম্যের শিকার নির্যাতিত পুরুষ। অথচ সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান।

মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর কাছে নারী নির্যাতনের পরিসংখ্যান থাকলেও নেই পুরুষ নির্যাতনের সঠিক পরিসংখ্যান। ফলে নারী নির্যাতনের খবর ফলাও করে প্রকাশ করা হলেও অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে পুরুষ নির্যাতনের ঘটনাগুলো।

অবস্থাদৃষ্টে নারী কর্তৃক নির্যাতিত অনেক পুরুষের মতো ‘পুরুষ নির্যাতন দমন’ আইনের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করছেন দেশের খোদ প্রধানমন্ত্রীও। যিনি নিজেও একজন নারী। চলতি বছরের মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইনের মতো ভবিষ্যতে পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধ আইনও করা লাগতে পারে। হয়তো সেদিন আসতে পারে, দেখা যাবে আমাদের ও রকম আইনও (পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধ আইন) করতে হচ্ছে।’ গত বছর জাতীয় সংসদের এক অধিবেশনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিমও পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধ আইন করার দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু তার দাবির দৃশ্যত কোনো প্রতিফলন ঘটেনি আজও।

সমাজবিজ্ঞানী ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বর্তমান সময়ে দাম্পত্য জীবনে ভালবাসার বন্ধন আগের চেয়ে অনেক হালকা হয়ে উঠেছে। মূল্যবোধের অবক্ষয়, নৈতিক স্খলন, লোভ-লালসা, উচ্চ বিলাসিতা, পরকীয়া, মাদকাসক্তি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, স্বাবলম্বী হওয়া, বিশ্বায়নের ক্ষতিকর প্রভাব, অবাধ ভিনদেশি সাংস্কৃতিক প্রবাহসহ নানা কারণেই এমনটা ঘটছে। যার চরম পরিণতি হচ্ছেÑ সংসারের ভাঙন ও নির্যাতন। যেখানে ভুক্তভোগী উভয়ই। উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত শ্রেণির অনেকেই প্রতিনিয়ত ভুগছেন পারিবারিক যন্ত্রণায়। নির্যাতিত নারীর পাশে সমাজের অনেকেই সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসেন। কিন্তু পুরুষশাসিত এ সমাজে পুরুষও যে নির্যাতিত হতে পারে তা ভাববার অবকাশ যেন নেই কারোরই। ফলে আড়ালেই থেকে যাচ্ছে পুরুষ নির্যাতনের ঘটনাগুলো। ফলে দিনের পর দিন বাড়ছে পুরুষ নির্যাতনের ঘটনা।

তাদের মতে, প্রতিনিয়ত স্ত্রী কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হলেও আইনের আশ্রয় নিতে পারছেন না অনেক পুরুষ। সন্তানের ভবিষ্যৎ, সামাজিক মর্যাদা রা, লোকলজ্জা, জেল-পুলিশ আর কোর্টকাছারির ভীতির কারণে বাধ্য হয়ে স্ত্রীর নির্যাতন নীরবে সহ্য করেও মানিয়ে নিচ্ছেন তারা। মুখ খুলে বলতে পারছেন না নির্যাতনের কথা। কিন্তু একজন নারী আইনি ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ইচ্ছে করলেই ঘটনা সাজিয়ে পুরুষের বিরুদ্ধে থানা কিংবা আদালতে সহজেই নারী নির্যাতনের মামলা ঠুকে দিতে পারছেন। কিন্তু ভুক্তভোগী হয়েও একজন পুরুষ নির্যাতনের শিকার হয়ে থানায় গিয়ে সহজে অনেক সময় মামলা করতে পারছেন না। ফলে আদালতের দারস্থ হচ্ছেন। স্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে অনেকে আবার নিত্যসঙ্গী করেছেন পারিবারিক অশান্তি। বিয়ে একটি যৌথ প্রকল্প, এই প্রকল্পে দুজনের বোঝাপড়া থাকা খুবই জরুরি। তা না হলে এর প্রভাব সন্তানদের ওপরও পড়তে পারে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার (বিএমবিএস) প্রজেক্ট অফিসার (লিগ্যাল এইড) অ্যাডভোকেট সালমা সুলতানা বলেন, স্বামীর নির্যাতনে স্ত্রীরা নির্যাতিত হয়Ñ এ ধারণা সত্য। তবে উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত শ্রেণির অনেক পুরুষও প্রতিনিয়ত স্ত্রী কর্তৃক শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, এটাও আমাদের মানতে হবে। নারীদের মর্যাদা রার জন্য সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন আইন। কিন্তু পুরুষ নির্যাতনের জন্য এখনো সুনির্দিষ্টভাবে কোনো আইন তৈরি হয়নি। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনে ৫টি ট্রাইব্যুনাল তৈরি হলেও পুরুষদের জন্য নেই একটিও। ফলে ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা দেওয়াটা অনেকটাই দুরূহ হয়ে পড়ছে। বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতনের আইনে নারীরা নির্যাতন মামলা করছেন পুরুষের বিরুদ্ধে। আবার পুরুষরাও ওই আইনেই মামলা করছেন নির্যাতিত নারীর বিরুদ্ধে। এতে করে নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।

তিনি বলেন, শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে শিতি সামাজিকভাবে উচ্চ পদধারী থেকে নিম্নশ্রেণির রিকশাচালক পর্যন্ত অনেক পুরুষই আইনি সহায়তা পাওয়ার জন্য আসছেন আমাদের কাছে। মিউচুয়াল পরামর্শের জন্যও আসছেন কেউ কেউ। সম্প্রতি এ হার বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৫ সালে স্ত্রীর নির্যাতনের শিকার বিএমবিএস থেকে ১৪ জন পুরুষ আইনগত সহায়তা নিয়েছেন। পরিবার টিকিয়ে রাখতে মৌখিকভাবে পরামর্শ নিয়েছেন ৫ শতাধিক পুরুষ। আর চলতি বছরের গত ৬ মাসে (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর) ২৬ জন পুরুষ স্ত্রী কর্তৃক বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন সংস্থায়। গত ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) মৌখিকভাবে সহায়তা নিয়েছেন ৭শরও বেশি ভুক্তভোগী পুরুষ, যা অনেকটাই ভাবিয়ে তুলছে আমাদের।

তিনি বলেন, সম্প্রতি আইনি সহায়তা নিতে বিএমবিএসে আসেন ধানমন্ডিতে বসবাসকারী এক প্রকৌশলী। অভিযোগ, কিছুদিন আগে তিনি বিয়ে করেন বুয়েটের কোয়ার্টারে বসবাসকারী উচ্চ শিক্ষিত এক তরুণীকে। প্রথমত শারীরিক সম্পর্ক গড়তে না দেওয়ায় ওই প্রকৌশলী ধারণা করেছিলেন নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারছেন না তার নববধূ। পরে হানিমুনের উদ্দেশে ব্যাংককে গিয়ে ভুল ভাঙে তার। সেখানে ছেলেবন্ধুদের সঙ্গে রাতযাপন, মাতাল অবস্থায় ঘরে ফেরার দৃশ্য রীতিমতো মুষড়ে দেয় তাকে। দেশে ফিরে কিছুদিন অপেক্ষার পর অবস্থা সামাল দিতে না পারায় বিষয়টি তিনি মেয়েটির অভিভাবকদের জানান। এতে ঘটে হিতে বিপরীত। নারী নির্যাতনের মামলা ঠুকে দেন ওই নারী। পরে কাবিননামার ২০ লাখ টাকা দেন মোহরানা আদায় করে প্রকৌশলীকে ডিভোর্স দেন।

মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকার আগা সাদেক খান সড়কের পাশে অবস্থিত এক বস্তির বাসিন্দা লিখিত অভিযোগে জানান, প্রতিদিন তিনি রিকশা চালিয়ে আসেন মধ্যরাতে। মাসখানেক আগে অসুস্থ বোধ করায় সন্ধ্যারাতেই বাড়িতে ফেরেন। দরজা ধাক্কা দিতেই ঘরে স্ত্রীর সঙ্গে বস্তিরই এক যুবককে দেখতে পান তিনি। ঘটনা বুঝতে পেরে প্রতিবাদ করায় স্ত্রী এবং ওই যুবক বেধড়ক পেটায় তাকে। একপর্যায়ে বঁটি নিয়ে তেড়ে আসেন তার দিকে। এই নিয়ে কথা বললে কেটে বস্তায় ভরে নদীতে লাশ ফেলারও হুমকি দেওয়া হয় ওই রিকশাচালককে। অগত্যা সন্তানদের মুখের দিকে চেয়ে আতঙ্ক নিয়েই সংসারধর্ম পালন করছেন। এ ধরনের অসংখ্য নির্যাতনের বর্ণনা এই প্রতিবেদকের কাছে তুলে ধরেন অ্যাডভোকেট সালমা সুলতানা।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন’ আইনের অপব্যবহার হচ্ছে বহু ক্ষেত্রে। এ আইনে দায়ের করা মামলার সিংহভাগই শেষ পর্যন্ত মিথ্যা মামলা হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে। এই মামলায় গ্রেপ্তারের পর ৩ মাস জামিন না দিয়ে আটক রাখার অংশটুকু বৈষম্যমূলক, যার কারণে ৯৯ শতাংশ পুরুষ নীরবে সহ্য করতে বাধ্য হয় স্ত্রীর নির্যাতন। তাই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর অপপ্রয়োগ রোধে এর প্রায়োগিক পদ্ধতির কিছু পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। পাশাপাশি ‘পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধ’ আইন তৈরিও অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। কারণ বিচারপ্রার্থীর বিচার পাওয়ার অধিকার যেমন আছে, ঠিক বিচারটিও বাদী-বিবাদীর সমান সুযোগের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। পুরুষ নির্যাতনবিরোধী আইন করা মানে নারীকে ছোট বা হেয় করা নয় আবার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন মানেও কথায় কথায় পুরুষকে হেনস্তা করা নয়। আইন দুটি থাকবে একটি আরেকটির পরিপূরক, সম্মান ও সম্ভ্রম রার কৌশল হিসেবেÑ যোগ করেন অ্যাডভোকেট সালমা।

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/২৫-১০-২০১৬ইং/ অর্থ 

Leave A Reply

Your email address will not be published.