ধিরুভাই আম্বানির সফলতার গল্প

সফলতার  গল্প

আমরা সকলেই হয়তো মুকেশ আম্বানির নাম জানি। শুধু ভারতের নয় বরং পুরো বিশ্বের সেরা ধনীদের একজন। তার ভাই অনিল আম্বানি ও ভারতের অন্যতম ধনী ব্যক্তি। তাদের এই ধনী হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে রিলায়েন্স গ্রুপ। আর এই গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ধিরুভাই আম্বানি। আম্বানি ব্রাদারস এর পিতা ধিরুভাই আম্বানি।

 

বলতে গেলে একেবারেই শূন্য থেকে শুরু করেছিলেন ধিরুভাই আম্বানি। ছিল না কোনো পুঁজি। স্বল্প শিক্ষিত এই ব্যক্তি সম্পূর্ণ নিজের বুদ্ধি দিয়েই গড়ে তোলেন সম্পদের পাহাড়। চলুন জেনে নেই এই মহান বিজনেস আইকন এর জীবনের আদ্যোপান্ত।

 

ধিরুভাই আম্বানির প্রকৃত নাম ধিরাজলাল হীরাচাঁদ আম্বানি। কিন্তু ধিরুভাই আম্বানি নামেই সকলে চেনেন। হীরাচাঁদ গোভারধান দাস এবং জামনার দ্বিতীয় সন্তান। বাবা হীরাচাঁদ ছিলেন সামান্য স্কুল শিক্ষক। ধিরুভাই ছোট থাকতেই বুঝতেন বাবার সামান্য আয় দিয়ে সংসার চলছে কোনো মতে। তাই চিন্তা করতেন কিভাবে অর্থ আয় করা যায়। মহাশিবরাত্রি মেলায় ধীরুভাই বন্ধুদের সঙ্গে মিলে ঐতিহ্যবাহী গানথিয়া মিষ্টি বিক্রি করত। পরিবারের আর্থিক সংকট অনুধাবন করেই কিনা ম্যাট্রিক পাস করার পর পড়াশোনার ইতি টানলেন। নেমে পড়লেন কর্ম সন্ধানে। তখন তার বড় ভাই রামনিকলাল আম্বানি কাজ করতেন ইয়েমেনের বন্দর নগরী এডেনে (ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল তখন)। বড় ভাই জানালেন, কাজের অভাব নেই এখানে। ধিরুভাই চলে গেলেন এডেন। সেখানে গিয়ে এ. বেসে অ্যান্ড কোং. (কোম্পানি)-তে মাত্র ৩০০ রুপির বিনিময়ে কাজ নিলেন।

 

এ কোম্পানিতে চাকরি করে তেলের ব্যবসা ভালোভাবে বুঝে গিয়েছিলেন। কর্মক্ষেত্র ছিল একটি পেট্রোল স্টেশন, কাজ ছিল গ্যাস ভরা ও অর্থ আদায় করা। একপর্যায়ে বিক্রয় ব্যবস্থাপকে উন্নীত হন। সেখানে কাজ করেন পাঁচ বছর। এর মধ্যে আরবি ভাষাটাও রপ্ত করে নেন ভালোভাবেই। বেতন বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১০০ রুপিতে। বিয়ে করলেন কোকিলাকে। ধিরু ভাই এর চার সন্তান। দুই ছেলে মুকেশ আম্বানি এবং অনিল আম্বানি, দুই মেয়ে নিনা কথারি এবং দিপ্তি সালগাকোর।

 

১৯৬২ সালে ধিরুভাই ভারতে চলে আসেন। কারখানা গড়তে টাকার জন্য যখন হন্যে হয়ে ছোটার সময় ব্যাংকগুলো ফিরিয়ে দিয়েছিল তাকে। এ অবস্থায় তার সামনে খোলা পথ ছিল একটিই, সাধারণ বিনিয়োগকারী। তখনকার চর্চা ছিল, টাকার দরকার হলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের দ্বারস্থ হওয়া। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহের বিষয়টা ছিল চিন্তা থেকে দূরে, বেশ দূরে। আম্বানি উপলব্ধি করেছিলেন, তার ব্যবসায়িক উদ্যোগে মানুষকে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তুলতে এমন কিছুর প্রস্তাব করতে হবে, যাতে তারা অভ্যস্ত নয়। যখন তিনি দৃশ্যপটে আসেন, তখন কোম্পানি ব্যবস্থাপকরা তাদের কোম্পানির শেয়ারের দর নিয়ে মোটেই চিন্তা করতেন না। তাদের ধ্যান-জ্ঞান ছিল লাভ করা আর লভ্যাংশ ঘোষণা দিয়ে বসা। কিন্তু আম্বানি এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে এসে বিনিয়োগকারীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়ার উদ্যোগ নেন। কোম্পানির দায়িত্বেরই এক অংশ হিসেবে সারাজীবন এ মনোভঙ্গি পোষণ করে গেছেন। ধিরুভাই আম্বানির প্রতিষ্ঠিত রিলায়েন্স গ্রুপ প্রথম দিকে ইয়েমেন থেকে মসলা আমদানি করতো। পরবর্তীতে তারা সুতার ব্যবসা শুরু করে। ধিরুভাই আম্বানি তখন মুকেশ আম্বানিকে দেশে ফিরতে বলেন এবং তাকে একটি পলেস্টার কারখানার দায়িত্ব দেন।

 

১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি মুকেশ তার বাবার কোম্পানিতে সুতা উৎপাদনের ব্যবসায় ব্যুৎপত্তি লাভ এবং ভারতের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত এ ব্যবসাকে সম্প্রসারণ করেন। তার নেতৃত্বগুণে কোম্পানির ব্যবসা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী বছরগুলোতে রিলায়েন্স পেট্রোকেমিক্যাল, পেট্রোলিয়াম পরিশুদ্ধকরণ, টেলিকমিউনিকেশন, বিনোদন, সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা এবং তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ইত্যাদি ব্যবসায় নিজেদের সম্প্রসারিত করে।

 

বর্তমানে আম্বানি ব্রাদারস এর যৌথ সম্পদের পরিমাণ ২৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০২ সালে ধিরুভাই আম্বানি মৃত্যু বরণ করেন। তিনি যখন মারা যান তখন দুই ভাই মুকেশ ও অনিলের মধ্যে রীতিমতো যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এ যুদ্ধ কোম্পানির মালিকানাকে কেন্দ্র করে। রিলায়েন্সকে কেন্দ্র করে এ যুদ্ধ শেষ হয় তাদের মায়ের হস্তক্ষেপে এবং একটি মধ্যস্থতা হয়। মধ্যস্থতার মাধ্যমে অনিল রিলায়েন্সের টেলিকমিউনিকেশন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং বিনোদনের মালিকানা পান। মুকেশ পান কোম্পানির তেল, টেক্সটাইল এবং সব শোধনাগারের ব্যবসা।

 

ধিরুভাই আম্বানি বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন বড় বড় ডিগ্রি কিংবা পরিবারের কোনো পুঁজি ছাড়াও জীবনে সফল ব্যবসায়ী হওয়া যায়। তিনি হাজার হাজার উদ্যোক্তাদের নিকট অনুকরণীয় হয়ে থাকবেন। বেঁচে থাকবেন কোটি মানুষের স্বপ্নে, যে স্বপ্ন শুধুই এগিয়ে যাবার।

 

 মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/  ২৩-১১-২০১৬ ইং / মো: হাছিব

Comments

comments

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ