একজন রহস্যজনক সৌখীন মস্তিষ্ক বিকৃত মানুষের গল্প

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডেস্কঃ 
আব্দুল আওয়াল, স্বাধীনতার ২ বছর পূর্বে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার সর্প যশোদল ভুবির চর গ্রামে আঃ রহমান ও জরিনা আক্তার খাতুনের পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার পিতা আঃ রহমান মুক্তিবাহিনীর ভিটিপাড়া ক্যাম্পে কমান্ডার শাহাবুদ্দিন এর অধীনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতো। দেশ স্বাধীন হওয়ার আনুমানিক ৫ দিন আগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের করমূলি অপারেশনের সময় রণক্ষেত্র থেকে আঃ রহমান আলবদর বাহিনীর কাছে ধরা পড়েন। পরবর্তীতে তাকে সিদ্ধিস্বরী বাড়ি কালীমন্দিরের নরসুন্দা নদীর ঘাটে নিয়ে বেয়নেট সার্চ করে হত্যা করে আলবদর বাহিনী।
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর সারা বাংলা স্বাধীন হলেও কিশোরগঞ্জ শত্রু মুক্ত হয় তার পরের দিন ১৭ই ডিসেম্বর। সেই থেকে মা জরিনা আক্তার খাতুন মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতে থাকেন এবং ছেলে আঃ আওয়াল কে কিশোরগঞ্জের আজিমুদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার জন্য ভর্তি করান। ১৯৮৫ সালের দিকে আঃ আওয়ালের এস এস সি পরিক্ষা শুরু হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে তার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত সে এভাবেই রহস্যজনক কায়দায় দিনযাপন করছে। দিনরাত কিশোরগঞ্জ শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে দাঁড়িয়ে থাকে, কেউ জোর করেও বসাতে পারেনা, ঠিক যেন ঘোড়ার মতো। রাতের বেলায় যশোদল বাজারের কাছে একটি দোকানের বারান্দায় অল্প কিছু সময় বিশ্রামের তাগিদে ঘুমিয়ে থাকে। এবং সকাল থেকে আবার দাঁড়িয়ে থাকার যাত্রা শুরু করে। বিশেষ করে কিশোরগঞ্জ শহরের পুরান থানা এবং একরামপুর এলাকায় রাস্তার ধারে তাকে প্রায় সময়ই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সে ভিক্ষুক নয়, কিন্তু তার চেহারা দেখে অভ্যস্ত কিছু মানুষ তাকে এমনিতেই টাকা দেয়। তবে যখন তার টাকার প্রয়োজন তখনই সে টাকা গ্রহন করে। সেই টাকা দিয়ে কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাজ হোটেলে নিজ হাতে খাবার প্লেটে নিয়ে খাওয়াদাওয়া করে, হোটেলের কোন কর্মচারী খাবার এনে দিলে সেই খাবার সে খায় না এবং খাবারের জন্য এই একটি মাত্র হোটেলই তার পছন্দ।
img_20161218_110255
বর্তমানে সে বিভিন্ন রোগে ভুগছে। শরীরে তার রক্তের পরিমান ৪.২ গ্রাম পার ডেসিলিটার। ডাঃ নির্দেশে তাকে ৩ ব্যাগ রক্ত দেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, আঃ আওয়ালের দাদা আঃ হাফিজ ও তার মেয়ে জামাই শুক্কুর মামুদকে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় একই ভাবে আলবদর বাহিনী বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে ডাকবাংলোয় আটকে রাখে এবং তাদের বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। সেইদিন রাতেই ধুলদিয়া ব্রিজের উপর তাদের ব্রাশফায়ার করে হত্যাকরে আলবদর বাহিনী।
রিপোর্টটি লেখার সময় আঃ আওয়ালের মা জরিনা আক্তার খাতুন ও তার চাচা আঃ অহিদ এর কাছে তথ্য সংগ্রহের সময় আঃ আওয়াল তাদের সঙ্গে এসেছিল। আমি আঃ আওয়াল কে আমার কক্ষে অভ্যর্থনা জানাই এবং বসতে বললে, সে মুচকী হাসি দিয়ে আমার টেবিলের অপর প্রান্তের চেয়ারে বসে। তাকে দেখে তার স্বজনরা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে এটা কিভাবে সম্ভব ! আপনি বলা মাত্রই বসে পড়লো !!!
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, সকালে কি খাইছেন?
সে বললো, তাজ হোটেলের রুটি খাইয়া আইছি।

আমি বললাম, সারাদিন দড়িয়ে থাকতে পরিশ্রম লাগেনা? 
সে মুচকী হাসি দিয়ে কোন কথা বললো না।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থেকে কি চিন্তা করেন?

সে বললো, কিছু ছিন্তা হরিনা।
img_20161218_110322
আমাদের আসেপাশে এমন অনেক মস্তিষ্ক বিকৃত মানুষ ঘোরা ঘুরি করে। মেডিক্যাল সাইন্সের ভাষায় সাইকো (phycho) আর সমাজের ভাষায় তাদের বদ্ধ পাগল বলা হয়। আসলেই কি তারা পাগল? এমনই একজন রহস্যজনক সৌখীন মস্তিষ্ক বিকৃত মানুষকে আমরা পাগল না বলে শহীদ পরিবারের সন্তান আঃ আওয়াল বলে ডাকতে পারিনা?
এটা ১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ প্রান এবং ২ লক্ষ সম্ভ্রমের বিনিময়ে একটি মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন হওয়া বাঙালী জাতির বিবেকের কাছে আমার খোলা চিঠি।।

লেখকঃ

মিজবাহ উদ্দিন আহমদ (নিঝুম)
বার্তা সম্পাদক
মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম 
www.muktijoddharkantho.com 



মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/২০-১২-২০১৬ইং/ অর্থ 

 

Comments

comments

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ