তাড়াইল উপজেলার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থেকে বাদসহ সুযোগ-সুবিধাদি বাতিলের দাবি করেছে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা

আমিনুল হক সাদী, নিজস্ব প্রতিবেদক:

কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনাক্তের পাশাপাশি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতাসহ আনুষাঙ্গিক সুবিধাদি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তাড়াইল উপজেলায় বেশ কয়েকজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। এর মধ্যে আপাতত তিনজনের বিষয়ে সরেজমিনে তদন্তে একজনের বয়স কম, একজন সরাসরি রাজাকার ছিলেন আর অন্য আরেকজন মুজিবনগর কর্মচারী পরিচয়ে অবৈধভাবে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে মোঃ আসিদ মিঞা, পিতামৃত-জহুর আলী, গ্রাম-মাগুরী, ডাকঘর-কাজলা, ইউনিয়ন-দামিহা, উপজেলা-তাড়াইল, জেলা-কিশোরগঞ্জ। তার গেজেট নং-৩৪৪৩, মুক্তিবার্তা লাল বইতে নাম নাই,বর্তমান সরকারের পরিপত্র অনুযায়ী জাতীয় পরিচয় পত্রে জন্মসাল ১৯৬৩। ১৯৭১ সালে তার বয়স মাত্র ৮ বছর। আরেকজন মৃত- নাজিরুল হক, পিতামৃত-সুলতান আহম্মেদ, গ্রাম-সাচাইল, ডাকঘর-সাচাইল, ইউনিয়ন-তাড়াইল-সাচাইল, উপজেলা- তাড়াইল, জেলা-কিশোরগঞ্জ। তার গেজেট নাম্বার নাই, মুক্তিবার্তা লাল বইতে নাম নাই। তাড়াইল উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল কর্তৃক কার্যবিবরণীতে কুখ্যাত রাজাকার হিসেবে নাম দাখিল করা হয়েছে। এছাড়াও মৃত-মঈন উদ্দিন, পিতা মৃত-নিজাম উদ্দিন, গ্রাম-চর তালজাঙ্গা, ডাকঘর-তালজাঙ্গা, উপজেলা-তাড়াইল, জেলা-কিশোরগঞ্জ। তার গেজেট নং-৩৪৪০, মুক্তিবার্তা লাল বইতে নাম নাই, ভারতীয় তালিকায় নাম নাই, প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরিত সনদ নাই, সে একজন প্রতারক মুক্তিযোদ্ধা। মুজিবনগর মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তার নাম নাই। তিনি ১৯৭১ সন থেকে ১৯৭২ সন পর্যন্ত তালজাঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সে একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মানীভাতার বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এদের বিষয়ে এমনই প্রতিবেদন পাওয়ায় তাড়াইল উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সভাপতি সুলতানা আক্তার এর সভাপতিত্বে মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা প্রদান কার্যক্রম বাস্তবায়ন উপজেলা কমিটি গত ০৮-০৯-২০১৬খ্রিঃ তারিখের সভা নং-৩০ এর মাধ্যমে কমিটির সদস্য-সচিব তাড়াইল উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) হুমায়ুন কবীর ভূঞা ও অন্যান্য সদস্যদের সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্তগুলো জেলা পর্যায়ের পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য পাঠিয়েছেন। এদিকে অনুসন্ধানে আরোও জানা গেছে, মঈন উদ্দিন ও নাজিরুল হক মারা যাওয়ার পর সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত মোতাবেক উপজেলা প্রশাসন তাদেরকে ওইসময় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান করেনি। এই তিনজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সরকারের কাছ থেকে সম্মানীভাতাসহ নিজে ও তাদের সন্তানরা সরকারী চাকুরীতে যোগদান করে বেতন-ভাতাদি মিলিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এদের মধ্যে গুরুতর অপকর্ম করেছেন মঈন উদ্দিন নামের একজন। তিনি মুজিবনগর কর্মচারীর ভুয়া সনদ দিয়ে ১৯৭৬ সালে থানা শিক্ষা অফিসার হিসেবে পাকুন্দিয়া উপজেলায় যোগদান করেন এবং সরকারের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। বর্তমানে তিনি মারা যাওয়ায় তার স্ত্রী ফাতেমা মঈন স্বামীর পেনশনসহ মুক্তিযোদ্ধা সম্মানীভাতা একই সাথে উত্তোলন করছেন। পাশাপাশি তার ছেলে মেয়েরা বয়স কমিয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ পত্র দিয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে সরকারী চাকুরী করছেন। তার ১ম সন্তান হোসনেয়ারা রুবী তাড়াইল স্বাস্থ্যবিভাগের সেকান্দর নগরে মাঠকর্মী হিসেবে কর্মরত আছেন। ২য় সন্তান বরকত উল্লাহ ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ খাদ্য বিভাগে এম.এল.এস.এস। ৩য় সন্তান বোরহান উদ্দিন বাচ্চু ঢাকার সেগুনবাগিচার কর অফিসে এম.এল.এস.এস হিসেবে কর্মরত। ৪র্থ সন্তান মিজানুর রহমান মিন্টু ঢাকার মগবাজার কর অফিসের এম.এল.এস.এস। ৫ম সন্তান মোঃ মাহফুজ ঢাকার সেগুনবাগিচা সদর দপ্তর এন এস আই এর ওয়াচার। ৬ষ্ঠ সন্তান রওশনারা পলি ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার। ৭ম সন্তান ইয়াসমিন কিশোরগঞ্জের সোনালী ব্যাংকে ক্যাশ অফিসার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। আর এভাবেই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানরা সরকারী চাকুরীসহ অন্যান্য সুয়োগ-সুবিধা ভোগ করে আসছেন। এ ব্যাপারে তাড়াইল উপজেলার তালজাঙ্গা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও তালজাঙ্গা আর সি রায় উচ্চ বিদ্যালয়ে সভাপতি চান মিয়া জানান, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তালজাঙ্গা আর সি রায় উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং ভারতে যান নাই। এছাড়াও তিনি নিয়মিত বিদ্যালয়ের মাসিক বেতন-ভাতাদি গ্রহন করেছেন। এদিকে এসব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ নিয়ে একটি চক্র টাকার বিনিময়ে সরকারের বিভিন্ন লোকজনকে ম্যানেজ করে ফায়দা হাসিলে লিপ্ত রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে জানতে চাইলে তাড়াইল উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মোঃ আঃ হাই জানান, তারা প্রতারণা ও তথ্য গোপন করে বিগত দিনে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম উঠিয়েছেন। স্থানীয়ভাবে কেউ আজ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাদেরকে চিনেন না ও জানেনও না। এদের বিষয়ে স্থানীয়ভাবে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারাও অভিযোগ করেছেন। আর তাই রাজাকার ও অমুক্তিযোদ্ধা যারা মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় আছেন তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যাবস্থা নেয়ার দাবি করেছেন।

 

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/০২-০১-২০১৭ইং/ অর্থ 

Comments

comments

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ