রংপুরের বধ্যভূমি (পর্ব-১)

রবিউল ইসলাম জুয়েল, রংপুর জেলা প্রতিনিধিঃ 

মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস সারাদেশে যখন পাকিস্তানি সৈন্যরা হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, তখন উত্তরের জেলা রংপুরের শান্তিপ্রিয় অথচ বিপ্লবী মানুষেরাও রক্ষা পায়নি। রংপুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে  অনেক বধ্যভূমি। সংস্কার ও সংরক্ষণে অবহেলার কারণে নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে এই বধ্যভূমিগুলো। মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে  রংপুরের সকল বধ্যভূমির ধারাবাহিক চিত্র তুলে ধরেছে ‘মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠে’র  প্রতিবেদক রবিউল ইসলাম জুয়েল….. 

“৫০ জন বিবস্ত্র নারীকে উদ্ধার করা হয় (গণ নির্যাতন কেন্দ্র) হল থেকে। যাদের একজন মেয়ে নিজের আঙ্গুল কামড়ে রক্তাক্ত করে সেই রক্তে দেয়ালে লিখেছিলেন ‘আমি বাঁচতে চাই।’ নরপশুরা তাঁকে বাঁচতে দেয়নি।”

রংপুর অঞ্চলের সকল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রাণকেন্দ্র ঐতিহ্যবাহী রংপুর টাউন হল। প্রায় এক শতাব্দীর ঐতিহ্য ও স্মৃতি জড়িয়ে আছে রংপুর টাউন হলের শরীর জুড়ে। এটি শুধু একটি অডিটোরিয়াম বা হলই নয়, বরং অনেক সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক গঠনমূলক কর্মকাণ্ডের সূতিকাগার। রংপুরের অনেক স্থাপনার মতো টাউন হলের সাথেও মিশে রয়েছে কাকিনার রাজা শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব মহিমা রঞ্জন রায়ের নাম। ১৮৯১ সালে এই অঞ্চলের নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিকাশে একটি রঙ্গমঞ্চ বানানোর তৎকালীন রঙ্গপুর নাট্য সমাজকে (রংপুর ড্রামাটিক এ্যাসোসিয়েশন বা আর.ডি.এ) ১০ বিঘা ৩ কাঠা জমি দান করেন তিনি। নির্মিত হয় রংপুর টাউন হল। নিশ্চয়ই তিনি কখনও ভাবেননি নট-নটিদের শিল্পকলা প্রদর্শনের রঙ্গমঞ্চটিতে এক দিন মানব সভ্যতার বর্বরোতম গণ নির্যাতন কেন্দ্রে পরিণত হবে। ১৯৭১ এ যুদ্ধের বিভীষিকায় অসংখ্য মানুষকে এখানে এনে হত্যা করা হয়েছে। আর সেই বিভীষিকাময় দিনের স্মৃতি ধারণ করে এখনও দাঁড়িয়ে আছে রংপুর টাউন হল, যেন জীবন্ত ইতিহাস। যার প্রতিষ্ঠাকালীন নাম ছিল “রংপুর নাট্য সমাজ গৃহ”।

একদিন যে রঙ্গমঞ্চে দর্শক নন্দিত হয়েছিল দত্তা, শর্মিষ্ঠা, কুলীনকুল সর্বস্ব, নীল দর্পণ, সীতা, ছেড়া তার, সিরাজুদ্দৌলা, ইডিপাস, মানময়ী গার্লস স্কুল এর মতো নাটক, আলো ঝলমল এই রঙ্গমঞ্চে নূপুরের ঝংকারে মানুষের হৃদয়ে জাগিয়েছিল সুরের ঢেউ ; একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সেই রঙ্গমঞ্চে রচিত হলো পৈশাচিকতা, নৃশংসতা আর বর্বরতার এক নির্মম ইতিহাস। রংপুর নাট্য সমাজ গৃহ’র রঙ্গমঞ্চ রঞ্জিত হলো অজস্র জানা অজানা শহীদের রক্তে। অনেক সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক গঠনমূলক কর্মকাণ্ডের জীবন্ত সাক্ষী রংপুর টাউন হলের সাথে মিশে আছে অনেক বেদনা ও কষ্টের ইতিহাস। হলের ইট পাথরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে আছে ৭১ এর স্মৃতি গাথা, বীরাঙ্গনাদের আর্ত চিৎকার, গুমোট চাপা কান্না।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এই টাউন হলকে পাক হানাদার বাহিনী বানিয়েছিল “গণ নির্যাতন কেন্দ্র।” বৃহত্তর রংপুরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ধরে আনা হতো নিরপরাধ মুক্তিকামী বাঙ্গালী মানুষজনকে। যাদের একটি বড় অংশ ছিল কম বয়সী নারী। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ধরে আনা সেই সব নারীদের উপরে দিনের পর দিন চলতো পাশবিক নির্যাতন। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস এই টাউন হলে চলেছে মানুষ রুপি হায়েনাদের নজিরবিহীন গণ ধর্ষণ, গণ নির্যাতন আর গণ হত্যা। যে হলে একদা মানুষ ছুটে আসতো সুরের মূর্ছনায় সেই হলের গ্রীন রুম, রিহার্সাল রুম আর মঞ্চে ধর্ষিতার ক্রন্দন আর বুকফাটা আর্তনাদে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে পুরো শহরের মানুষ।

রংপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের দেয়া তথ্য মতে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামাতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের (বর্তমানে ছাত্রশিবির) রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি এবং কুখ্যাত আল-বদর বাহিনীর রংপুর শাখার কমান্ডার এটিএম আজহারুল ইসলাম (যুদ্ধাপরাধ ও মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত এবং কারারুদ্ধ) ৭০ জনের একটি সশস্ত্র আল-বদর স্কোয়াডের নেতৃত্ব দিতেন। সেই স্কোয়াডের ঘাঁটি ছিল রংপুরের টাউন হল এলাকায়। আজহারুল এবং তার সহযোগীরা পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের মনোরঞ্জনের জন্য ভয়-ভীতি দেখিয়ে এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের, এমন কি অপেক্ষাকৃত নিরীহ মুসলিম পরিবারের সুন্দরী তরুণী এবং গৃহবধূদের ধরে এনে সরবরাহ করতো টাউন হল গণ নির্যাতন কেন্দ্রে।

একাত্তরের ঐ নয় মাসে পাক হানাদারেরা তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, শান্তি কমিটির সহায়তায় এই গণ নির্যাতন কেন্দ্রে ঠিক কতো জন মুক্তিকামী নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, কত জন নারী সম্ভ্রম হারিয়েছেন দেশ মাতৃকার স্বাধীনতা অর্জনে, ৪৩ বছরেও সে ইতিহাস লেখা হলো না। নির্মিত হলো না শত সহস্র শহীদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য কোন “স্মৃতিস্তম্ভ।” এখনও যেখানে কান পাতলে শোনা যায় শহীদী আত্মার করুণ আকুতি – “আমরা বাঁচতে চাই! আমরা বাঁচতে চাই”।

অথচ, প্রতিটি জাতীয় দিবসে এই টাউন হল ক্যাম্পাসেই অবস্থিত রংপুর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদী ভরে ওঠে ফুলে ফুলে। অনেকে আসেন শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে। বিনম্র চিত্তে স্মরণ করেন আমাদের জন্য একটি স্বাধীন- সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মাহুতি দেয়া অজস্র শহীদের। কিন্তু শহীদ মিনারের ২০০ গজের মধ্যে যে বধ্যভূমি, যেখানে এখনও শোনা যায় জাতীর জন্য উৎসর্গীকৃত শত শহীদের আহাজারি, আমরা কেউ তাঁদের মনে স্মরণ করি না। এই লজ্জায় আরও কতো দিন লজ্জিত হবে মাওলানা কেরামত আলী, নুরুলদিন, শহীদ প্রফুল্ল চাকী, হেয়াত মাহমুদ, শহীদ জররেজ ভাই, শহীদ মুখতার ইলাহির স্মৃতি ধন্য রংপুর, কবে রচিত হবে টাউন হল হত্যাযজ্ঞের ইতিহাস? এই প্রশ্ন বর্তমান প্রজন্মের। যদিও বছর দুয়েক আগে টাউন হলের পিছনে শিল্প কলা একাডেমী ভবনের সামনে বেসরকারী উদ্যোগে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করেছে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম।

প্রত্যক্ষদর্শী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আকবর হোসেনের কথা : রংপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন টাউন হল বধ্যভূমির প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তিনি ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ টাউন হলের পিছনে শিখা সংসদে গিয়ে পাকবাহিনীর নৃশংসতা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান। তখনও হলের ভিতর থেকে ভেসে আসছিল অসংখ্য নারীর করুণ আর্তনাদ। রঙ্গমঞ্চের গ্রীন রুমের সামনে থেকে কে যেন একজন “পানি পানি” বলে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল। শিখা সংসদের পিয়ন নির্মল এগিয়ে যান গ্লাস হাতে। এক ঢোকে পানি পান করে লুটিয়ে পড়ে জ্ঞান হারালেন সেই যুবতী মেয়েটি। তাঁর জ্ঞান আর ফিরে আসেনি। জানা যায়নি তাঁর পরিচয়। সেদিন ৫০ জন বিবস্ত্র নারীকে উদ্ধার করা হয় হলের ভিতর থেকে। কম বয়সী একটি মেয়ে নিজের আঙ্গুল কামড়ে রক্তাক্ত করে সেই রক্তে দেয়ালে লিখেছিলেন “আমি বাঁচতে চাই।” নরপশুরা তাঁকে বাঁচতে দেয়নি।

মুক্তিযুদ্ধ শেষে বিজয়ীর বেশে নিজ শহরে আসা মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন এগিয়ে যান হলের পিছনের দিকের ইঁদারার কাছে। বাতাসে লাশের গন্ধে তাঁর শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হয়। তার মধ্যেই তিনি এগিয়ে উকি দিলেন ইঁদারার ভিতরে। কিন্তু যা দেখলেন তার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না তিনি। স্বপ্নেও ভাবেননি মানুষ এতোটা নৃশংস হতে পারে। ইঁদারার ভিতরে পড়ে ছিল অগণিত মানুষের মৃত দেহ। সরে আসলেন তিনি, এগিয়ে গেলেন কৃষি ফার্মের (বর্তমান শিল্প কলা একাডেমী হলের পিছনে চিড়িয়াখানায়) ঝোপ জংগলের দিকে। সেখানে তখন ৩০ লক্ষ শহীদদের মধ্যে অজ্ঞাত পরিচয়ের বেশ কয়েক জনের দেহাবশেষ নিয়ে টানা হেঁচড়া করছিল কুকুর-শেয়াল। পুরো কৃষি ফার্মে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল নাম না জানা শহীদদের মাথার খুলী। এতো টুকু দেখার পর আর পারেননি তিনি। সরে এসেছেন ঐ ক্যাম্পাস থেকে।

পরদিন আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে সাথে নিয়ে তিনি আবারও যান টাউন হলে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গলিত-অর্ধ গলিত-ছিন্ন ভিন্ন দেহাবশেষ গুলো মাটি চাপা দিলেন তাঁরা। ১৯ ডিসেম্বর সেখান থেকে সংগ্রহ করেছিলেন ১৬৭টি মাথার খুলি। পরে মাথার খুলীগুলো টাউন হলের পাশে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরীর ভবনে “রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদ”র একটি কক্ষে স্থাপিত “মুক্তি সেনানী সংস্থা”র অফিসে। অত্যন্ত লজ্জাজনক যে, একদিন সে সব চুড়ি হয়ে গেলো। যা হলে পারতো মুক্তিযুদ্ধের স্মারক।

পরবর্তীতে বন্ধ করে দেওয়া হয় সেই ঐতিহাসিক ইঁদারা। বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনকে জায়গা দেয়া হলো ব্যবহারের জন্য। এখনও সেখানে সংস্কৃতির চর্চা হয়, মহড়া হয় নাটকের। কিন্তু এ প্রজন্মের ঐ সব তরুণরা জানে না তারা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। তারা জানেনা তাদের বিচরণ ক্ষেত্রের মাটির নীচে রয়েছে অসংখ্য নাম না জানা শহীদের দেহাবশেষ। ভরাট করা ইঁদারায় রয়েছে নিরপরাধ মানুষের নর কঙ্কাল। উৎসাহী সাংস্কৃতিক কর্মীরা টাউন হলের পিছনে অনেক বৃক্ষের চারা রোপণ করেছে। হয়তো একদিন সেখানে ফুলও ফুটবে। কিন্তু সেই ফুলের সুবাস কি আমাদের অন্তরে নাড়া দিতে পারবে? নর কঙ্কালের উপরে বেড়ে ফুল গাছের ফুল কি তার সুবাস ছড়াতে পারবে?

 

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/০৫-০৩-২০১৭ইং/ অর্থ 

Comments

comments

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ