অষ্টগ্রামে হাওর অঞ্চলে বোরোর বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা

মন্তোষ চক্রবর্ত্তী, অষ্টগ্রাম (কিশোরগঞ্জ) :

কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সংযোগস্থল অষ্টগ্রামের হাওরে হাওরে এখন সবুজের সমারোহ। এ অঞ্চলের প্রতিটি হাওরে সবুজ ধানের সাগরে এখন বাতাসের দোলায় যেন ঢেউ খেলে যাচ্ছে। অধিকাংশ বোরো জমিতে এখন ধানের শীষ বেরুতে শুরু করছে। এলাকার কিষান-কিষানি আর ক’দিনের মধ্যেই সোনালী ধান কেটে গোলায় ওঠাবেন। তাদের প্রত্যাশা, কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা না দিলে এ অঞ্চলে এবার বোরোর বাম্পার ফলন হবে। কৃষকরাও ধান কাটার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করেছেন।

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন ছাড়াও হবিগঞ্জের আজমিরিগঞ্জ, বানিয়াচং, লাখাই, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল, নাছির নগর ইত্যাদি হাওর অধ্যুষিত উপজেলার অধিকাংশ আবাদি জমিতেই বোরোর আবাদ হয়েছে। এসব এলাকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ ভাগই একমাত্র ফসল বোরো উৎপাদনের ওপর জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। বাকিরা জেলে, মৎসজীবী, কামার, কুমারসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। এক জরিপে জানা গেছে, এলাকার আবাদি ভূমির ৮০ ভাগের মালিক মাত্র ১৪ ভাগ মানুষ। বাকি ২০ভাগ জমি ছোট, মাঝারি, প্রান্তিক ও বর্গা চাষির হ। একটি মাত্র ফসল ছাড়া বিকল্প কোন কর্মসংস্থান না থাকায় এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই ভূমিহীন ক্ষেতমুজুর ও শ্রমজীবী। কার্তিকে ধানের বীজতলা তৈরি থেকে শুরু করে বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসে হাওরের ধান কেটে কৃষকদের গোলায় পেঁৗছানো পর্যন্ত এসব শ্রমজীবী নর-নারী মুজুরি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে। স্থানীয় শ্রমিক ছাড়াও ধান কাটার মৌসুমে উত্তরবঙ্গের রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুরসহ বিভিন্ন জেলার অসংখ্য ক্ষেতমুজুর এ অঞ্চলে ধান কাটতে আসেন। ভৌগলিক ও প্রাকৃতিক কারণে এ অঞ্চলের প্রতিটি হাওরে প্রায় ৬ মাস বর্ষার পানি আটকা পড়ে থেকে পলি পড়ে জমির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এছাড়াও প্রায় প্রতিটি হাওরের পাশেই রয়েছে কোন না কোন নদী, খাল, বিল বা বৃহৎ জলাভূমি। এসব জলাশয় থেকে সেচের পানি সরবরাহ করা হয়। এ অঞ্চলে উৎপাদিত বোরো ধানে স্থানীয় খাদ্য চাহিদা পূরণ করে একটি বড় অংশ জাতীয় খাদ্য ভা-ারে যোগান হয়ে থাকে।

তবে এ অঞ্চলের জমিগুলোর অধিকাংশই নিম্নাঞ্চলে হওয়ায় এবং নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে পড়ায় প্রায়ই ধান কাটার মৌসুমে আগাম বন্যায় ফসল তলিয়ে যায়। তখন ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে কৃষকদের পথে বসতে হয়। নতুন করে আরও ঋণের ফাঁসে আটকা পড়তে থাকেন। বিশেষ করে স্থানীয় মহাজন ও বিভিন্ন এনজিওর কাছে এসব বিপদগ্রস্ত কৃষক জিম্মি হয়ে পড়েন। সরকারি ঋণ পাওয়ার জটিলতা ও অপ্রতুলতা কারণে কৃষকরা বাধ্য হয়েই এনজিও এবং মহাজনদের দ্বারস্থ হন। এভাবে অনেক গরিব চাষি শেষ পর্যন্ত ভূমিহীনে পরিণত হন।

এ অঞ্চলের বড়হাওর, বড়গোপ, বলি্ল, গায়েলা, মেকুরা, লুগ্রা, মুগ্রা, কালনী, সুন্তিকালী, ছাইন্না, এলংজুরী, ঘাগড়া, ঢাকি, ধনপুর, বাহারপুর, কুমড়ী, মৃগা, বামই, দোবাজাইল, কাকুরীয়া, বিলমাকশা, নাছিরপুর, চাতলপাড়, ভলাকুট, মাছমাসহ প্রতিটি হাওরেই এবার সময়মত বীজ, সার, সেচ আর সময়মত বৃষ্টি পাওয়ায় বাম্পার ফলনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এবারের আবাদকৃত ধানের মধ্যে ব্রিধান-২৮, ব্রিধান-২৯, হীরা-২, হীরা-৪, সুপার হাইব্রীড, বি আর ১৪ এবং ব্রিধান ৫৮ জাতের ধানের আবাদই বেশি হয়েছে। প্রায় দেড় লক্ষাধিক হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। কদিনের মধ্যেই প্রতিটি হাওরে শুরু হয়ে যাবে ধান কাটার ধুম। ইতোমধ্যে কিষাণ-কিষাণীরা ধান মাড়াই ও শোকানোর জন্য খলা তৈরির কাজে নেমে পড়েছেন। প্রতিটি বাজারেই এখন কাস্তে-কুলাসহ যাবতীয় উপকরণ বিক্রি হচ্ছে। হাওরের ধান বাড়ি নিতে গরু-মহিষের গাড়ি মেরামতেরও কাজ চলছে।

এ ব্যাপারে জেলা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম, হবিগঞ্জের উপ-পরিচালক মো.ফজলুল রহমান, ও অষ্টগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: আব্দুল মোন্নাফ জানান, এবার প্রতিটি হাওরেই বোরো আবাদ অত্যন্ত ভালো হয়েছে। ফলে ধানের বাম্পার ফলন হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/২৪-মার্চ-২০১৭ইং/নোমান

Comments

comments

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ