রংপুরের বধ্যভূমি (পর্ব-২)

মোঃরবিউল  ইসলাম জুয়েল, রংপুর প্রতিনিধিঃ 

মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস সারাদেশে যখন পাকিস্তানি সৈন্যরা হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, তখন উত্তরের জেলা রংপুরের শান্তিপ্রিয় অথচ বিপ্লবী মানুষেরাও রক্ষা পায়নি। রংপুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক বধ্যভূমি। সংস্কার ও সংরক্ষণে অবহেলার কারণে নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে এই বধ্যভূমিগুলো। মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে রংপুরের বধ্যভূমি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠের এর বিশেষ আয়োজন “রংপুরের বধ্যভূমি” শিরোনামে আজকে প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় পর্ব। 

নিসবেতগঞ্জ বধ্যভূমি:

“শৈলেন দত্তের দুই পা শক্ত করে বেঁধে সেই দড়ি জিপের পিছনে বাঁধলো। লিচু বাগান থেকে নিসবেতগঞ্জ যাওয়ার পথে জিপের পিছনে বাঁধা শৈলেন দত্ত ছিন্ন ভিন্ন হয়ে মিশে গেছেন পথের ধুলায়।”

মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস সারাদেশের মতো রংপুরেও পাকিস্তানি হানাদাররা তাদের এ দেশীয় দোসর আলবদর, রাজাকারদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় নির্বিচারে হত্যা করেছে নিরীহ সাধারণ মানুষকে। রংপুর জেলার চিহ্নিত গণহত্যার স্থানগুলোতে নিরীহ মানুষকে ধরে এনে হত্যা করা হতো। তেমনি একটি বধ্যভূমি হচ্ছে নিসবেতগঞ্জ বধ্যভূমি। এখানেই হত্যা করা হয় রংপুরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় বুদ্ধিজীবী সবার প্রিয় পাখিদা (এ্যাড বিজয় চন্দ্র মৈত্র), এ্যাডঃ পূর্ণচন্দ্র সরকার, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শংকর বনিকসহ নাম না জানা অসংখ্য মানুষকে।

২৩ মে ১৯৭১ রোববার, রংপুর শহরের লিচু বাগান (গোমস্তা পাড়া) এলাকা। প্রায় সব বাসাতেই রাতের খাবার প্রায় শেষ। খেতে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ইলেকট্রিক মিস্ত্রী শৈলেন দত্ত। এমন সময় বাইরে হটাৎ করেই গালিগালাজের শব্দ। স্পষ্ট বাংলাতেই শোনা গেলো “শালা মালাউনের বাচ্চা দরজা খোল।” বাধ্য হয়েই দরজা খুললেন শৈলেন দত্তের বড় বোন ইলা দত্ত। দেখলেন মহল্লারই কয়েকজনের পিছনে পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা। দরজা খোলার সাথে সাথেই হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়লো তারা। শৈলেন দত্তকে ধরার জন্য মিলিটারিদের পথ দেখিয়ে এনেছে ছয় সাত জন বাঙ্গালী। শৈলেন দত্তকে হানাদারদের হাতে তুলে দিয়ে রাজাকারের দল গিয়ে ঢুকলো অন্য দুইটি বাড়ীতে। ধরে আনা হলো রংপুরের প্রবীণ আইনজীবী পূর্ণ চন্দ্র সরকার ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শংকর বনিককে।

পুরো এলাকায় তখন পিনপতন নীরবতা। মারধোর করতে করতে এ্যাড পূর্ণচন্দ্র সরকার ও শংকর বনিককে একটা আর্মি জিপে তোলা হল। কিন্তু শৈলেন দত্তকে জিপে উঠানো হলো না। ঘাতকের দল এবার শৈলেন দত্তের দুই পা শক্ত করে বেঁধে সেই দড়ি জিপের পিছনে বাঁধলো। চলতে শুরু করলো জিপ। ছুটে চললো ক্যান্টনমেন্টের দিকে। শৈলেন দত্তের আর্তনাদে পুরো পাড়া প্রায় মৃতপ্রায় । এক সময় শৈলেনের আর্তনাদ মিলিয়ে গেলো। কিন্তু মহল্লার কেউই ঘর থেকে বের হতে সাহসী হলো না। পরদিন সকালে পাড়ার মোড়ে পাওয়া গেলো শৈলেনের রক্তাক্ত লুঙ্গি। সবাই যা বোঝার বুঝে নিলো। কারও মুখে কোন কথা নেই। পুরো মহল্লা সুনসান। বেলা বাড়তে থাকলো। এগারোটার দিকে খবর পাওয়া গেলো ক্যান্টনমেন্টের পিছনে নিসবেতগঞ্জ হাটে গত রাতে পঞ্চাশ ষাট জন বাঙ্গালীকে হত্যা করেছে পাক বাহিনী। অনেকেই দেখে এসেছেন সেখানে পড়ে থাকা লাশগুলো। এ্যাড পূর্ণচন্দ্র সরকার ও শংকর বনিকের লাশ সেখানে থাকলেও ছিল না শৈলেন দত্তের লাশ। কেননা, লিচু বাগান থেকে নিসবেতগঞ্জ যাওয়ার পথে জিপের পিছনে বাঁধা শৈলেন দত্ত ছিন্ন ভিন্ন হয়ে মিশে গেছেন পথের ধুলায়।

এই ঘটনার দুই দিন পরেই রংপুরের মানুষ হারায় তাঁদের একজন প্রিয় মানুষকে। তিনি হলেন সবার প্রিয় পাখিদা। পুরো নাম বিজয় চন্দ্র মৈত্র। ১৯২৮ সালে রংপুরে আইন পেশায় যোগ দেন তিনি। দুই ছেলে চুনী, মুকুল, মেয়ে গীতা এবং বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে থাকতেন শহরের গুপ্ত পাড়ায়। সর্বজন শ্রদ্ধেয় এই ব্যক্তিটি ছিলেন শহরের বুদ্ধিজীবী মহলের মধ্যমণি। রংপুরের সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে আড্ডায় বসতেন নিজ বাড়িতে। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পরে অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে গেলে দুই পুত্রকে শ্বশুর বাড়ি নলডাংগায় পাঠিয়ে দেন এপ্রিল মাসে। কিন্তু পাক হানাদার বাহিনীর ঘাতকেরা সেখানেই দুই ছেলে চুনী ও মুকুলকে হত্যা করে। এই ঘটনায় মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলেন পাখিদা। বাসা থেকে বের হতেন না খুব একটা। প্রাণ খোলা এই মানুষটিকে সবাই দেশত্যাগের অনুরোধ জানালেও মাতৃভূমি না ছাড়ার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অনড়। শুভাকাঙ্ক্ষী যারা তাঁকে দেশ ত্যাগের অনুরোধ জানিয়েছিলেন তাঁদের তিনি বলেন, “জন্মভূমির দুর্দিনে দেশ ত্যাগ করা মহাপাপ এবং অন্যায়।” জন্মভূমির প্রতি তাঁর এই ভালোবাসার মূল্য তাঁকে দিতে হয় নিজের জীবন দিয়ে। ২৫ মে মধ্য রাতে গুপ্ত পাড়ার বাসা থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে যায় পাক হানাদারেরা। অন্য আরও কয়েকজনের সাথে তাঁকেও নিসবেতগঞ্জে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়। তারও লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায় অন্যান্যদের সাথে। খোলা আকাশের নীচে পরে থাকে অর্ধ শতাধিক লাশ। যাদেরকে হত্যার একমাত্র কারণ তাঁরা বাঙ্গালী।

মুক্তিযুদ্ধে পুরো নয় মাস জুড়েই পাকিস্তানি হানাদাররা তাদের এ দেশীয় দোসর আলবদর, রাজাকারদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় রংপুর ও আশে পাশের অঞ্চল থেকে মুক্তিকামী বাঙ্গালীদের ধরে নির্বিচারে হত্যা করেছে নিসবেতগঞ্জ এলাকায়। হত্যা করে খোলা আকাশের নীচেই লাশ ফেলে রাখতো হায়েনার দল। রংপুরের অন্যতম প্রধান এই বধ্যভূমিকে ঠিক কতজন বাঙালীকে হত্যা করা হয়েছে সে হিসেব আজও অজানা। স্বাধীনতার দীর্ঘ দিন পরেও এই বধ্যভূমিটি অনাদরে অবহেলায় পরে ছিল। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পথিক হয়তো জানতোও না এখানেই মুক্তিযুদ্ধের সময় কি বর্বর হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হয়েছিল পাক বাহিনী কর্তৃক। অবশেষে ২০০০ সালে নিসবেতগঞ্জ বধ্যভূমি সংলগ্ন এলাকায় সেনা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয় স্মৃতিস্তম্ভ “রক্ত গৌরব”, যা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় ঐ বছরেরই ০৭ ফেব্রুয়ারী।

তথ্য সূত্র: মুক্তিযুদ্ধের কিশোর ইতিহাস,রংপুর জেলা,মোস্তফা তোফায়েল বইটির লেখক।

 

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/২৯-০৩-২০১৭ইং/ অর্থ 

Comments

comments

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ