হাওড়ের কৃষকের কান্না স্বচক্ষে দেখে এলাম : আলহাজ্ব মোঃ মেহের উদ্দিন

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডেস্কঃ 

কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার মোট আয়তন ৫০৩ বর্গকিলোমিটার। এখানে ৯টি ইউনিয়ন, ৬৮টি মৌজা ও ১৪২টি গ্রাম আছে। হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মের মানুষ এখানে মিলেমিশে বসবাস করছে। এই উপজেলার উত্তরে নেত্রকোণা জেলার মদন ও খালিয়াজুড়ি উপজেলা, দক্ষিণে কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলা, পূর্বে- সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা ও হবিগঞ্জ জেলার আজমিরিগঞ্জ উপজেলা এবং পশ্চিমে কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ ও তাড়াইল উপজেলা। ইটনা উপজেলার বোর আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ৩৬,২২৩.৮৬ একর। এই উপজেলায় জলমহাল আছে ৮৬টি, যাহা সরকারি ভাবে ইজারা বন্দোবস্ত প্রদান করা হয়।

ইটনা উপজেলা দুটি অঞ্চলে বিভক্ত, ৫টি ইউনিয়ন নিয়ে পূর্বা ল এবং ৪টি ইউনিয়ন নিয়ে পশ্চিমা ল অবস্থিত। পূর্বাঞ্চলের পশ্চিম সীমানা ঘেঁষে ধনু নদী (বৌলাই নদী) প্রবাহিত হয়েছে। ধনু নদীর অন্য একটি শাখা পশ্চিম অ লের মধ্যভাগ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ধনু নদী (বৌলাই নদীর) পশ্চিম তীরে ইটনা সদর ইউনিয়নের বেতাগা ও ধনপুর ইউনিয়নের বাকসাই, সিলুন্দিয়া গ্রাম অবস্থিত। আর পশ্চিম অ লের ধনু নদীর পূর্ব তীরে বড়িবাড়ী ইউনিয়নের তিয়ারকোণা, শিমুলবাঁক, বড়িবাড়ী ও এন.সহিলা গ্রাম, বাদলা ইউনিয়নের বাদলা, সিন্নিপাড়া ও শেরপুর গ্রাম এবং রায়টুটী ইউনিয়নের গন্দবপুর ও ধারা গ্রাম অবস্থিত। ইটনা উপজেলার দক্ষিণ সীমানায় এলংজুরি ইউনিয়নের বড়হাতকবলিয়া গ্রাম ও উত্তর সীমানায় রয়েছে রায়টুটী ইউনিয়নের আড়ালিয়া গ্রাম। এই সীমানার ভিতরে আগলহা, কুনিয়া, হুনাতুলা, ভান্ডা, বাহির চাতল, যায়া, জোয়ারিয়া, বাগোলিয়া, কৈছর, আংগান, বলদাসহ আরও অনেক বিল রয়েছে। এই সকল বিল থেকে সরকার প্রচুর পরিমাণ রাজস্ব আয় করে থাকেন। উপরোক্ত সীমানা ও বিল গুলি নিয়া রয়েছে কয়েক হাজার একরের বোর জমির অনেক গুলি হাওর। এই হাওর গুলির ভিতরে কোন গ্রাম নেই। আমি বিগত ১০/০৪/২০১৭ ঈসায়ী থেকে ১৫/০৪/২০১৭ ঈসায়ী তারিখ পর্যন্ত মোট ৬ দিন ইটনা উপজেলার পশ্চিমা লের হাওর গুলি সরজমিনে দেখে এসেছি। ইটনা উপজেলার উত্তরে আড়ালিয়া গ্রাম থেকে দক্ষিণে বড়হাতকবিলা গ্রামের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার এবং পূর্বে ইটনা বেতেগা থেকে পশ্চিমে এন.সহিলা, বাদলা গ্রাম। এর দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। এর ভিতরে কোন গ্রাম নেই। শুধু একমাত্র বোর জমির হাওর আর হাওর। এই হাওরের ধান ফসল তখনও সবুজ, পাকে নাই। অকাল পাহাড়ি ঢলে সব তলিয়ে গেছে। এই হাওরে তাকালে শুধু পানি আর পানি থই থই করছে। ইঞ্জিন চালিত ছোট বড় নৌকা অবাদে এদিক ওদিক চলাফেরা করছে। জিরাতীরা গরু বাছুর ও গোয়ালা ঘর নৌকায় করে কোন রকমে কাঁদতে কাঁদতে শূণ্য হাতে বাড়ী ফিরছে। কোন কৃষকই এক শতাংশ জমিও কাটতে পারে নাই। এই অ লে ক্ষতির পরিমাণ শতভাগ। এন.সিহলা গ্রামের কৃষক আঃ কদ্দুছ বলেন, আমি কুনিয়ার হাওরে ৬ একর জমি চাষ করে ছিলাম। পাকার আগেই পানিতে তলিয়ে গেছে। ৬টি মুড়িও কাটতে পারি নাই। একই গ্রামের কৃষক হবিক মিয়া বলেন, আমি হুনাতুলা হাওরে ৪ একর জমি করেছিলাম, এক শতাংশ জমিও কাটতে পারি নাই। চোখের সামনে পানিতে তলিয়ে গেছে। থানেশ্বর গ্রামের এশাক মেম্বার বলেন, ‘‘আমি ভান্ডা ও হুনাতুলা হাওরে ৮ একর জমি লাগিয়েছিলাম। এলাকাবাসীকে নিয়া অনেক কষ্ট করে সীমের খালের সুইজ গেইট ও হুনাতুলা বাঁধ রক্ষা করেছিলাম। কিন্তু পূর্বের হাওরের পানি এসে এবং নদীর পাড় ডুবে ২ ঘণ্টার ভিতরে ভান্ডা ও হুনাতুলা হাওরের সবুজ ফসল এক সাথে ডুবে গেছে। এক ছটাক জমিও কাটতে পারি নাই। এক মন ধানও ঘরে নিতে পারি নাই। কি দিয়ে ছেলে মেয়েকে খাওয়াব? মাথায় হাত রেখে হতাশায় ভুগছি।’’ কৃষক কৃষাণীরা মাথায় হাত দিয়ে শুধু হাওরের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের আংশকা কি করে তারা খাদ্য বিহীন অবস্থায় ছেলে মেয়েদের নিয়ে দিন কাটাবে, ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ যোগাবে, মহাজনদের ঋণ, ব্যাংকের ঋণ, এনজিও ঋণ পরিশোধ করবে। গতকাল রাতের ঝড়ে পাঁচকাহনিয়া গ্রামের বাদতি খালের বাঁধ ভেঙ্গে পাঁচকাহনিয়া দেড়কান্দি, চন্দ্রপুর, ঘরভাঙ্গা কিষ্টপুর, কিষ্টপুর ও মাওরা গ্রামের প্রায় তিন হাজার একর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। আমি কিশোরগঞ্জস্থ ইটনা সমিতির পক্ষে বাংলদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও সরকার প্রধানের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছি যে, ইটনা উপজেলাকে দূর্গত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে অত্র এলাকায় আগামী এক বছরের খাদ্যের ব্যবস্থা করুন। সকল প্রকারের কৃষি ঋণ, এনজিও ঋণ, মহাজনি ঋণ মওকুফ করুন। শিক্ষার্থীদের বিনা বেতনে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করার ব্যবস্থা করুন। ইটনা উপজেলার ধনপুর, মৃগা, জয়সিদ্ধি, ইটনা সদর, এলংজুরী, রায়টুটী ও চৌগাংগা ইউনিয়নে অনুরোপ ভাবে ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। ইটনা উপজেলার সীমানায় খালিয়াজুড়ি, মদন, শাল্লা, আজমীরিগঞ্জ, মিঠামইন উপজেলার সম্পূর্ণ ফসল ইটনা উপজেলার মত পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে। ইটনা সমিতির পক্ষে সরকার প্রধানের নিকট আকুল আবেদন ইটনা উপজেলাকে দূর্গত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে দূর্গত এলাকার অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান। এদের জীবন রক্ষার ব্যবস্থা করুন। মহান আল্লাহ ইটনাবাসীসহ সকল উপজেলার দূর্গত লোকদের প্রতি সহায় হোন। খোদা হাফেজ।

 

লেখক পরিচিতি:

আলহাজ্ব মোঃ মেহের উদ্দিন
সাধারণ সম্পাদক, ইটনা সমিতি, কিশোরগঞ্জ।

 

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/১৬-০৪-২০১৭ইং/ অর্থ 

Comments

comments

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.