রোজাদারের যে সব কাজ করা উচিত নয়!

ইসলামিক রিপোর্ট :

মাহে রমজানের ১০ম রোজা আজ। অর্থাৎ রহমতের দশক শেষ আজ। আগামীকাল শুরু হবে মাগফিরাতের দশক। মাহে রমজান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি বরকতময় মাস। এমাসের মর্যাদায় তিনি তাঁর রহমতের ভাণ্ডার উন্মোচন করে দেন। করুণা ও নেয়ামতের আধার জান্নাতের দরজা খুলে দেন। আর শাস্তির আবাস জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ এবং মানুষের চির শত্রু প্রকাশ্য দুশমন শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করেন। যাতে করে মানুষ তাঁর রহমত, করুণা ও মাগফিরাত লাভে ধন্য হয়।

কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো গাফিলতির কারণে আমরা আল্লাহ তাআলার রহমত ও করুণা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। মাহে রমজানের রোজা পালন করলেও তা আমাদের পরিশুদ্ধ করতে পারে না। কেননা আমরা অনেকেই সঠিকভাবে রোজা পালন করছি না। আমরা অনেকেই রোজা রেখে শরীয়ত বিরোধী কাজ করছি যার ফলে স্রষ্টার করুণা লাভে ব্যর্থ হচ্ছি।

রোজা রেখে আমরা অনেকে তার আদব মেনে চলি না। যেসব কাজ করা অনুচিত সে সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

আগেভাগে সাহরি খাওয়া : আমরা অনেকে আগেভাগে সাহরি খেয়ে ফেলি। কেউ কেউ রাত বারোটা বা একটার দিকে সাহরি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু এটি একদিকে সুন্নত বিরোধী কাজ। অন্যদিকে শেষ রাতে সাহরি গ্রহণে যে বরকত তা থেকে বান্দা বঞ্চিত হয়। আগে সাহরি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে ফজরের নামাজও ছুটে যেতে পারে। আর তা হলে আরও বড় ধরনের অপরাধ হবে তাতে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- ‘তোমরা সাহরি খাও কারণ এতে বরকত রয়েছে।’ বোখারি ও মুসলিম)। অন্য হাদিসে এসেছে- ‘আমাদের ও আহলুল কিতাব (ইহুদী-খ্রিষ্টানদের) রোজার মাঝে পার্থক্য হল সহারি খাওয়া।’ অর্থাৎ তারা সাহরি না খেয়ে রোজা পালন করে আর আমরা সাহরি খেয়ে তা পালন করি। (মুসলিম ও তিরমিযি)

দেরি করে ইফতার করা : অনেকে সূর্য ডুবে যাওয়ার পরও অধিক সতর্কতার যুক্তিতে দু’তিন মিনিট দেরিতে ইফতার করেন। এটা শয়তানের ওয়াসওয়াসার অনুসরণ ছাড়া আর কিছু নয়। কেননা নবি করিম (সা.) বলেন- ‘ততদিন যাবত আমার উম্মত কল্যাণের মাঝে থাকবে যতদিন আগেভাগে (সূর্য ডুবার সাথে সাথে) ইফতার করবে।’ -(সহিহ বোখারি)

রাত জাগা ঘুমিয়ে দিন কাটানো : এ অভ্যাসের কারণে বান্দা বিভিন্ন ধরণের কল্যাণ থেতে মাহরূম হয়ে যায়। কখনো এর কারণে জামাতের সাথে সালাত বা নামাজ আদায় করা হয় না। অনেক সময় সালাতের সময়ও পার হয়ে যায়।

খাদ্যপানীয় গ্রহণে বাড়াবাড়ি : রমজান মাস সংযমের মাস। সিয়ামের তাৎপর্য হচ্ছে সংযম পালন করা। অথচ অনেককেই রমজানে খাওয়া-দাওয়ার বিষয়ে অসংযমী হতে দেখা যায় যা একবারেই অনুচিত। রমজান মাস হচ্ছে গরীব-দুঃখীর অভাব ও দুঃখ বেদনা অনুধাবন করার মওসুম।

অসদাচরণ বা খারাপ ব্যবহার করা : অনেক রোজাদার রোজা রেখেও দ্রুত রেগে যায়, অসৎ আচরণ কিংবা মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার করে। মিথ্যা, গীবত ও চোগলখুরিতে লিপ্ত হয়। অথচ এরূপ করা রোজা উপকারিতা ও হিকমতের পরিপন্থী। এর মাধ্যমে সিয়ামের সওয়াব বিনষ্ট হয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে ছিয়াম ব্যক্তিকে পবিত্র করে, তার চরিত্রকে সুন্দর করে, মুসলিম ব্যক্তিকে উদ্বুদ্ধ করে ছবর-ধৈর্য, দয়া-অনুকম্পা ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করতে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-‘যখন তোমাদের কারো সিয়ামের দিন উপস্থিত হয় তখন সে যেন কোন অশ্লীল কথা ও কাজ না করে এবং অহেতুক উঁচু কণ্ঠে কথা বা ঝগড়া-বিবাদ না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা তার সঙ্গে ঝগড়া করতে আসে তবে সে যেন তাকে বলে দেয়, আমি রোযা আছি।’(বোখারি ও মুসলিম)

অন্য একটি হাদীছে এসেছে- যে ব্যক্তি রোজা রাখা অবস্থায় মিথ্যা কথা ও কাজ পরিত্যাগ করে না, আল্লাহর কোনই দরকার নেই তার পানাহার ত্যাগ করাতে। -(বোখারি)

রোযার ফজিলত তার বিধিবিধান সম্পর্কে অজ্ঞতা : রোজাদারদের অনেকেই রোজার ফজিলত, মাসআলা-মাসায়েল ও বিধি-বিধান সম্পর্কে তেমন জ্ঞান রাখে না। রোজা অবস্থায় কি করণীয় ও বর্জনীয়, কি করলে রোজা হালকা হয়ে যায়, কিসে সিয়াম নষ্ট হয়ে যায়, এ মাসে কোন ধরণের কাজ আল্লাহ পছন্দ করেন সে সম্পর্কে  জ্ঞান রাখে না বা রাখার প্রয়োজন অনুভব করে না।

রাতে স্বপ্নদোষ হলে গোসল করতে দেরি করা : অনেকে লজ্জাবশতঃ রাতে গোসল করে না। আর এভাবে ফজর নামাজ পরিত্যাগ করে বা সূর্যোদয়ের পর গোসল করে ফজর পড়ে। এটা নিতান্তই অজ্ঞতা ও গুনাহর কাজ। স্বপ্নদোষ হলে কিংবা স্বামী-স্ত্রী মিলনের মাধ্যমে নাপাক হলে, নাপাকি অবস্থাতেই সাহরি খাওয়া যায়। তবে অবশ্যই ফজর নামাজের আগে গোসল করতে হবে এবং নামাজ আদায় করতে হবে।

তারাবিহ নামাজ আদায় না করা : তারাবিহ ছালাত আদায় না করে কোন অনর্থক কাজে লিপ্ত থাকা উচিত নয়। বিশেষ করে তারাবিহ নামায না পড়ে ডিশ, ভিডিও, সিডি প্রভৃতির মাধ্যমে নাটক, সিনেমা ও অশ্লীল ছবি দেখে বা তাস, গুটি বোর্ড প্রভৃতি অনর্থক খেলা খেলে বা গল্প-গুজব করে সময় অতিবাহিত করা আরও বড় ধরণের অপরাধ ও পাপ।

রমজান শেষ হলে মসজিদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা : কিছু রোজাদার আছে রমজান মাসে নামাজ-রোজা ভালই করেন। কিন্তু রমজান শেষ হয়ে গেলে তাদের আর মসজিদে খুঁজে পাওয়া যায় না। দুনিয়াদারীতে তারা এতই ব্যস্ত যে, তাদের মসজিদে খুব কমই দেখা যায়। অথচ মসজিদের সাথে সম্পর্ক রাখা ঈমানের বাহ্যিক পরিচয় ও মুনাফেকি থেকে মুক্তি পাওয়ার অন্যতম উপায়। আর রমজান মাস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নামাজ ছেড়ে দেওয়া আরও বড় অপরাধ। কেননা ঈমানের পর নামাজ ইসলামের সবচেয়ে বড় রোকন। নামাজ হচ্ছে ঈমান ও কুফরির বাহ্যিক মানদণ্ড। কিয়ামত দিবসে সর্ব প্রথম নামাজ সম্পর্কেই প্রশ্ন করা হবে।

রাব্বুল আলামিন আমাদের মাহে রমজানে কোরআন-সুন্নাহ তথা শরিয়ত বর্জিত ও আল্লাহর অপছন্দনীয় গুনাহের বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকার এবং ফজিলতপূর্ণ আমল বেশি করে আদায় করার তাওফিক দান করুন। -আমিন।

 

 

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/০৬জুন২০১৭ইং/নোমান

Comments

comments

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ