প্রবাসের ঈদ!

মোঃ দ্বীন ইসলাম খাঁন, কাতার থেকে :
২০০৫ সালে ছিলাম বাবা মায়ের বেকার সন্তান। ৫ ভাইবোনের সংসার আমাদের। অভাবের সংসারে ক্ষনে ক্ষনে বুঝতে পারছিলাম বাবা মায়ের সংসারের বোঝা ছিলাম আমি। অনেক কষ্ট আর ঋন করে পারি দিলাম মরুদেশ কাতারে । দীর্ঘ ৭ বছর প্রবাসে কাটিয়ে দিলাম সংসারের ঘানি টানতে টানতে। এক কথায় সংসারের সুখের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিলাম নির্লজ্জ অসহায় হয়ে প্রবাসের মাটিতে। নিজেকে অমানুষ মনে করে যেকোন কাজ করতে দ্বিধাবোধ করি নাই কখনো। সংসারের সুখের পিছনে ছুটতে ছুটতে কখন যে ৩৪ বসন্ত শেষ হলো বুঝতে পারিনি। যৌবনে বাতাস এসে বার বার মনে করে দিত যৌবনের সুখে হারিয়ে যেতে। তাই দীর্ঘ ৭বছর পর যৌবনের ডাকে সারা দিতে দেশে গেলাম।
বিয়ে সব কাজ ঠিকঠাক করে রাখলো বাবা মা। মেয়ে ও ঠিক করে রাখলো। মেয়েকে আগে থেকে চিনি বলে আমার এ আপত্তি ছিল না। বিয়ে ৩দিন আগের রাতে পরিবারের সবাই আমাকে নিয়ে মিটিং এ বসল। প্রথমে বাবা বলল বিয়ের সব আয়োজন করতে ৬লক্ষ টাকা লাগবে। তখন বাবা বললো আমাকে টাকা দিতে।বাবার কথা শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম। মনে হলে আকাশটা ভেঙে মাথার উপর পড়ল। বাবাকে বললাম আমার কাছে টাকা নাই। যা টাকা বেতন পেতাম সবাইতো আপনাকে দিয়েছি মাসে মাসে। বাবা সহ কেউ আমার কথা বিশ্বাস করলো না। বাবা রেগে সরাসরি বললো টাকা দিলে বিয়ে হবে নয়তো সে কালকে বাড়ি থেকে চলে যাবে। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না । দুচোখে অন্দকার দেখতে লাগলাম। বাড়ি চেনা মানুষগুলো অচেনা হয়ে গেল। আমি সবাইকে বার বার বলে কেউকে বিশ্বাস করাতে পারলাম না আমার কাছে টাকা নাই। বিয়ে না হলে মান সম্মান বলতে কিছু থাকবে না,সেই চিন্তা সারা রাত অনিদ্রায় কাটিয়ে দিলাম।
সকাল বেলায় না খেয়ে এক বন্দুর বাড়ি গিয়ে বন্দুকে সব খুলে বললাম। বলার পর ১লাখে বছরে ৩০হাজার টাকা সুদে ৪লাক্ষ টাকা ঋন নিলাম বাকি ২লক্ষ টাকা প্রবাসি বন্দুদের থেকে ধার নিয়ে বাবাকে দিলাম। তো বাবা টাকার কথা সব খুলে বললাম কিভাবে জোগাড় করলাম। বাবা আমার কথার কোন উত্তর দিল না। অবশেষে অনেক জামেলার পর বিয়ে সম্পন্ন হলো। বিয়ে প্রথম ক’মাসে আল্লাহ রহমতে বাবা হব খবরটা পেলাম,তাই ছুটির ৩মাস বাকি থাকতে আবার চলে এলাম কাতারে । এসে শুরু করলাম দিনরাত কাজ।
নিজেকে বিলিয়ে দিলাম কাজের মধ্যে। ঋন যন্ত্রনায় ঘুম আসতো না,কখন শেষ হবে ঋন। আর ক্ষনে ক্ষনে বুঝতে পারলাম ঋন থাকলে প্রবাস জীবনটা যে কত যন্ত্রনার আর কষ্টের। মাসে মাসে যা বেতন পাই সবই ঋন দেই। আগের মত টাকা বাড়িতে দিতে পারি না বলে বাড়ি সবাই আমাকে সন্দেহ করতে লাগলো। শশুর বাড়িতে দেই। এই নিয়ে শুরু হলো শ্বশুর বাড়ি লোকদের সাথে আমাদের বাড়ির ঝগড়া। ঝগড়ার কারনে আমার মেয়েকে আর বউকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ আমি বাবাকে আগেই বলছি আমার ঋনের কথা কেউ আমাকে বিশ্বাস করেনি,কি ছিল আমার ভুল? কি ছিল আমার অপরাধ?
যে ভুলের কারনে আজ একা একা জ্বলছি দূরপ্রবাসে। আমি তো চেয়ে ছিলাম সবাইকে নিয়ে সুখে থাকতে। কি পেলাম নিজের আপনজনদের থেকে যন্ত্রনা ছাড়া? যাদের জন্য জীবনের অনেকগুলো বছর যন্ত্রনার প্রবাসে। যাদের সুখের জন্য জীবনে সকল চাওয়া পাওয়া গুলোকে কবর দিয়ে ছিলাম কাতারের মরুতে। আজ আমার মেয়েটি বলে আব্বু তুমি কবে আসবে বাড়ি? তোমার কি আমাকে দেখতে মন চায় না? যখন মেয়ের কথা গুলো শুনি তখন আর ধরে রাখতে পারি না চোখের পানি গুলোকে। কি বলব আমার মেয়েটিকে? আমি জানি না তো কবে দেশে যাবো। এখনো যে ঋন শেষ করতে পারলাম না, একদিকে ঋন আবার সংসারের খরচ।
মেয়েটিকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বলি আগামী মাসে আসবো, কিন্তু আমার তো আগামি মাস আসে না!!

 

 

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/২৪জুন২০১৭ইং/নোমান

Comments

comments

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ