আকাশ যোদ্ধা শামসুল আলম : মেঘ ফুঁড়ে এসেছিলেন বজ্র হয়ে

এপ্রিল (মাঝামাঝি কোন সময়), ১৯৭১
করাচী, পশ্চিম পাকিস্তান

ফ্লাঃ লেঃ শামসুল আলম এবং অন্যান্য বাঙ্গালী অফিসারদের তখন তেমন কোন কাজ ছিলনা অফিসে। নজরবন্দী হিসেবে থাকছিলেন, অল্প কিছু দাপ্তরিক কাজ ছাড়া অন্য কোন কিছুতে তাঁদের টানা হতনা। এর মধ্যে উনি ছুটি চাইলেন ১ মাসের জন্য পারিবারিক কারন দেখিয়ে। অবাক করে দিয়ে তাঁর ছুটি মঞ্জুর করা হল। পুরো ১ মাসের ছুটি!

সে সময় তাঁর বোন তখন থাকতেন করাচীতে। ছুটি নিয়েই করাচী চলে গেলেন। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা ছিল প্রায় ৬০ হাজার রুপী। ৬০ হাজার রুপী তখন অনেক অনেক টাকা! পুরো মাস জুড়ে সেই ৬০ হাজার রুপীর ৫০ হাজার রুপী তুলে ফেললেন হাবীব ব্যাংক থেকে। এরপর ভাবলেন কাজে যোগ দেবেন নাকি ভারতে পালিয়ে যাবেন? কিন্তু কাজে যোগ দেয়ার ব্যাপারে কিছুতেই মনকে বোঝাতে পারলেন না। আবার ভারতে পৌছানোটাও অনেক দুরুহ ছিল। এজন্য শেষ মুহুর্তে অন্য একটা সিদ্ধান্ত নেন। উনি করাচী থেকে প্রথমে রাওয়ালপিন্ডির প্লেনের টিকেট কাটলেন। আবার একই সাথে ঢাকার টিকেটও কাটলেন। স্কোয়াড্রনে জানিয়ে দিলেন যে রাওয়ালপিন্ডি ফিরছেন।

করাচী থেকে ঢাকার প্লেনে চেপে বসলেন। মনে মনে বেশ খুশিই ছিলেন যে পাকিস্তানীদের ধোঁকা দিতে পেরেছেন এবং যথাসময়ে ঢাকায় এসে পৌছাবেন।

এপ্রিল (মাঝামাঝি কোন সময়), ১৯৭১
ঢাকা, পূর্ব পাকিস্তান

ফ্লাঃ লেঃ শামসুল আলম কিছুক্ষন আগে ঢাকা পৌছেছেন। পৌছানোর পরই অদ্ভুত একটা ব্যাপার দেখলেন। পুরো বিমানবন্দর সৈন্যে ভরা আর তেমন কোন শ্রমিকই চোখে পড়ছেনা। তিনি লাগেজ খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু অনেক পরেও যখন এসে পৌছালোনা, তখন খোঁজে বের হলেন। বিমান বাহিনীর পরিচিত এক অফিসারকে চোখে পরে গেলেন হুট করেই। সেই অফিসার জিজ্ঞেস করলেন,

– “আরে আলম, তুমি এখানে কি মনে করে?”
জবাব দিলেন,
– , “অনেকদিন দেশে আসা হয়না, তাই ছুটি নিয়ে বাড়িতে বেড়াতে আসলাম।“
সেই অফিসার বললো,
– “তো কি খুঁজছো?”
জবাব দিলেন,
– “লাগেজ খুঁজছি, এখনো এসে পৌছাচ্ছেনা কেন বুঝতে পারছিনা।“
সেই অফিসার বললো,
– “এসে যাবে, ওদিকে গিয়ে দেখো। বাঙ্গালী আনলোডাররা নেইতো, তাই এখন ঝামেলা হচ্ছে। অপেক্ষা কর, পেয়ে যাবে।“
এর একটুপর লাগেজ দেখতে পেলেন। তবে সেই অফিসার আরো কয়জন সহ উনার কাছে চলে এলো। বললো,
– “শহরের অবস্থা তো খারাপ, যাবে কিভাবে?”
উনি বললেন,
– “সেটা সমস্যা হবেনা। কোন কিছু জোগাড় করে চলে যাব।“
সেই অফিসার বললো,
– “দেখ, আমি একটা গাড়ি ম্যানেজ করেছি, তুমি ওটাতে করে চলে যাও। “
উনি জবাব দিলেন,
– , “না থাক, আমি নিজেই কিছু একটা জোগাড় করে চলে যাব।“

তবু সেই অফিসার উনাকে প্রায় বাধ্য করলো গাড়িতে উঠতে শহরের নানা পরিস্থিতির কথা বলে। গাড়ি এগিয়ে চলছিলো। কিন্তু ফ্লাঃ লেঃ আলম খেয়াল করলেন যে সেগুনবাগিচার দিকে না গিয়ে গাড়ি যাচ্ছে এখনকার প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় আছে, তার সামনের রাস্তা দিয়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে। জিজ্ঞেস করতেই বলা হল, এখানে কিছু কাজ আছে, এরপর আমাকে বাড়ি পৌছে দেয়া হবে। এরপর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল বর্তমানে এয়ারফোর্স মেসের ওখানে। নিয়ে বললো,

– “তুমি চেঞ্জআপ করে নাও ওই রুমে গিয়ে। আমার অল্পকিছু সময় দেরী হবে।“
ফ্লাঃ লেঃ আলম লাগেজ বের করে ওই রুমে প্রবেশ করলেন। এরপরেই বাইরে থেকে খট করে আওয়াজ আসলো দরজা আটকে দেবার। জানালার ওখান থেকে বলা হল,
– “আমরা জানি তুমি কিভাবে এখানে এসেছো। পালাবার চেষ্টা করে লাভ নেই।“
এরপর রাতে খেতে দেয়া হল। আর কয়েকজন এসে লাগেজ চেক করলো। ব্যাগে এতো টাকা দেখে বললো,
– “তুমি এতো টাকা কেন নিয়ে এসেছো?”
উনি জবাব দিলেন,
– “অনেকদিন পর বাড়িতে আসছি। বাড়িতে কাজ করাবো, এজন্য নিয়ে এসেছি।“

এরপর সকল লাগেজ নিয়ে যাওয়া হয়, যার কিছুই আর ফেরত পাওয়া হবেনা। ঘরে কেবল একজোড়া স্যান্ডেল, জুতা, শার্ট, প্যান্ট আর পরনে লুঙ্গি ফতুয়া। এভাবেই সকাল হল, বাইরে গার্ড ছিল, কড়া পাহারা। তিনি বুঝতে পারছিলেন এখন পালাতে চেষ্টা করে লাভ নেই। কিছুটা সময়ের জন্য নিজেকে ভাগ্যের কাছে ছেড়ে দিতে হবে…
সকালে বেশ ভালো নাস্তা করানো হল। একটু পর সেই অফিসার আবার আসলেন। তাঁকে বললেন,

– “আলম, তোমাকে একটু যেতে হবে আমার সাথে, বেশি সময় নেই, যেভাবে আছো সেভাবেই চল।“
উনি বললেন,
– “আমি একটু ড্রেস চেঞ্জ করে আসি, জুতা পড়ে নেই।“
সেই অফিসার জবাব দিলো,
– “ এর কোন দরকার নেই।“
তিনি প্যান্ট, শার্ট আর সাথে স্যান্ডেল পড়ে গাড়িতে উঠে পড়লেন। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল কুর্মিটোলার দিকে। ওখানে একটা আর্মি ইউনিট ছিল বলে জানতেন, খুব সম্ভবত সেখানেই। সেখানে নিয়ে বলা হল,
– “তুমি এখানে কয়েকদিন থাকবে। কিছুদিন পর তোমাকে চলে যেতে দেয়া হবে।“
এরপর আর্মির এক সুবেদার আসলো। তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলা হল,
– “ইনি আমাদের অফিসার, ভালো করে যেন খেয়াল রাখা হয়।“
সেই অফিসার চলে গেলেন… সেই সুবেদার উনাকে বললো,
– “সামনে চলো।“

উনি দেখলেম সামনে একটা টিনের চালা দেয়া ঘরের মত। সেইদিকে উদ্দেশ্য করে হাটতে থাকলেন। হাটা শুরু করতে না করতেই ধাম করে মোটা কোন লাঠি দিয়ে উনার পেছন দিকে বাড়ি দেয়া হল। উনার প্রায় দম বন্ধ হবার জোগাড় হলো। তাঁকে আবার বলা হল,
– “ সামনে দেখ আর হাটতে থাক।“

তাঁকে সেই ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হল। প্রায় ১৫-২০ জনের মত লোক সেখানে শুয়ে ছিলো। ঢুকতেই একজন ঠোটে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করলো কোন শব্দ না করবার জন্য। বাইরে থেকে দরজা লাগিয়ে চলে যেতেই একজন বললো,
– “কথা কইয়েন না, চুপ কইরা পইড়া থাকেন।“
আসার পথে স্যান্ডেল খুলে যায়, সেটা নিয়ে আসতে চাইলে আরেকজন বললো,
– “কাপড় চোপড়ই থাকবোনা, সাহেবে স্যান্ডেল খোঁজে! মাইরের সময় মুখ বুইজা থাইকেন, সব সইয়া যাইবো।“

একটুপর সবাইকে লাইন ধরে দাড় করিয়ে বাইরে নেয়া হল। একেকজনকে ডাক দেয়, এরপর শুরু হয় বেদম প্রহার। এভাবে প্রায় সারাদিনই চলতে লাগলো। মারতে থাকে আর গালি দিতে থাকে উর্দুতে। সেসবের খুব বেশি কিছু উনার মনে থাকবেনা একসময়।তবে “কুত্তা বাঙ্গাল” আর “শালে মুজিব কে বাচ্চে” এই দুটা স্পষ্ট মনে থাকবে তাঁর।

এভাবেই দিন চলছিলো। খেতে দেয় কি দেয়না। সেটা খেতেও কষ্ট হয়। এভাবে চললো বেশ কয়দিন। মাঝে মাঝে কয়েকজনকে নিয়ে যায়, নতুন কেউ কেউ আসে। যাদের নিয়ে যায় তাদের তেমন কেউই ফেরত আসেনা। অল্প কয়জনকে ফিরে আসতে দেখবেন, কিন্তু তাঁদের দেখে মনে হবে নরকের উদাহরন হয়তো আল্লাহ এই পৃথিবীতেই সৃষ্টি করে রেখেছেন। এভাবে একদিন তাঁরও ডাক আসবে!

মে মাস (হয়তো), ১৯৭১
ঢাকা, পুর্ব পাকিস্তান

ফ্লাঃ লেঃ শামসুল আলমকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সামরিক বাহিনীর কুখ্যাত জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে। সামরিক বাহিনীতে কাজ করার সুবাদে এর সম্পর্কে উনার কিছু জানা ছিল। এখন যেখানে ডিজিএফআই হেডকোয়ার্টার,সেখানে ছিল এর অবস্থান। প্রথমেই উনাকে মেজর পদমর্যাদার এক কর্মকর্তার সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। পাকি মেজর বলে,

– “আলম,তুমি সত্য স্বীকার করে নাও। তাহলে তোমাকে কিছু বলা হবেনা। তুমি স্বীকারোক্তি দাও যে তুমি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেবার জন্য পালিয়ে ঢাকা চলে এসেছো।“
তিনি বললেন,
– “আমিতো ছুটিতে এসেছি ঢাকায়। পরিবারের জন্য খুব খারাপ লাগছিল। আমি কেন এমন স্বীকারোক্তি দেব?“
এরপর বলা হল,
– “তোমার ভালো তুমি বুঝে নেবে। আর কি বলবে,সেটা আমরা ঠিক করে দেব।“

এরপর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হবে ডিটেনশন সেলে। গায়ের সব কাপড় খুলে হাত উপরে বেধে দাঁড় করিয়ে রাখা হবে। এরপর চলতে থাকে অত্যাচার। সেসবের কোন স্মৃতিই সেভাবে মনে করতে পারবেননা উনি অনেক বছর পর। কতবার যে জ্ঞান হারাবেন তিনি নিজেও জানবেননা। আর মাথার উপর ছিল ১০০০ ওয়াটের বাল্ব। মারামারি শেষ হলে তাঁকে চোখের উপরে সেই বাল্ব জ্বালিয়ে রেখে ঝুলিয়ে রাখা হল। তাপে উনার মুখের চামড়া পুড়ে গিয়েছিল। চোখ খুলে তাকাতে পারছিলেননা। প্রচন্ড ক্লান্ত ছিলেন,কিন্তু এক মুহুর্তের জন্যও ঘুমাতে পারছিলেননা। চোখের উপর এমন আলোর উৎস থাকলে ঘুমানো কখনই সম্ভব নয়। দুইদিন পর উনি ঘোরের মধ্যে চলে গেলেন। তাকে বার বার ওই একই কথা জিজ্ঞেস করা হচ্ছিলো আর বক্তব্য লিখতে বলা হচ্ছিলো। উনি বার বার লিখছিলেন,

– “I, Flight Lieutenant Shamsul Alam, PAK/4921, came here to meet my family on my holidays and I would have gone back within few days.”

এরপর নিয়ে যাওয়া হয় পাশের এক সেলে। যেখান থেকে নিয়মিত বীভৎস চীৎকার শুনতে পেতেন। সেখানে যাবার পর দেখলেন মেঝেতে ছোপ ছোপ দলা বাধা রক্ত। মনে হচ্ছিলো যেন কেউ একটু আগে এখানে মুরগী জবাই করেছে। তাঁকে সেখানে নিয়ে আবার নির্যাতন করা হল,যেগুলো বর্ননা করবার ইচ্ছা এই ঘটনা প্রবাহের বাইরেই থাকুক। এরপর আবার তাঁকে বক্তব্য লিখতে দেয়া হল,উনি সেই একই কথা লিখলেন। তাঁকে আবার সেই বাল্বের নীচে ঝুলিয়ে দেয়া হল। ৩-৪ দিন পর তিনি সমস্ত মনোবল হারিয়ে ফেললেন। মাথা কাজ করছিল না। না ঘুমিয়ে এভাবে তীব্র আলো আর তাপের নীচে থাকা একটা অসহনীয় অনুভূতি। তাঁকে আবার জিজ্ঞেস করা হল যে ঠিক বক্তব্য লিখবেন নাকি। এবার বললেন,

– ”তোমরাই বলে দাও আমাকে কি লিখতে হবে। আমি লিখে সই করে দিচ্ছি।“
ওরা উনাকে লিখতে বললো,
– “I, Flight Lieutenant Shamsul Alam, PAK/4921 has deserted PAF which was planned and came in Dhaka to join muktibahini.”
লিখে সই করে দিলেন। পাকিস্তানিরা তাকে বললো,
– “আগে লিখে দিলেই এতো কষ্ট করতে হতনা।“
এবার অনুরোধ করলেন উনাকে তার কাপড়গুলো দিতে। উত্তরে তাঁকে বলা হল,
– “তুমি সেসব পাবে যদি আমাদের সাহায্য কর।“
বললেন,
– “কি সাহায্য লাগবে?”

তাঁকে বলা হল, একজন বন্দী আছে,যার ভাষা ওরা বুঝতে পারছেনা। ওর জন্য ইন্টারপ্রিটার হিসেবে কাজ করত হবে। তাঁর বক্তব্য তাদের বুঝিয়ে বলতে হবে। নিরুপায় হয়ে রাজী হলেন।

সেলে নিয়ে আসা হল একটা লুঙ্গী আর গেঞ্জী পরা ২২-২৩ বছরের এক ছেলেকে। তাঁর পুরো শরীর জমাট বাধা রক্তে কালো হয়ে আছে। ঠোট মুখ ফুলে একাকার,চেহারা বোঝাই যাচ্ছেনা। তাঁকে বলা হল তার সাথে কথা বলতে। তাঁর সাথে কথা বলে বুঝলেন,সে ময়মনসিংহ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে যেটা পাকিস্তানীরা ঠিকভাবে বুঝতে পারছিলনা। যেটা জানলেন তা হচ্ছে,”ভাওয়াল গড়ের কোন এক জায়গায় মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প ছিল। যাদের এই ছেলেটা সাহায্য করতো। তাঁদের অস্ত্র,গুলি এসব বহন করতো। একদিন পাকি বাহিনী ওখানে আক্রমন করলে তাঁকে একটা গুলির বাক্স দেয়া হয় মাথায় করে বহন করবার জন্য আর তাদের সাথে পালাতে।

অবস্থা যখন বেগতিক হয়,তখন মুক্তিবাহিনী অথবা হয়তো ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের কোন ইউনিটের সদস্যরা যে যার মত পিছু হটে সেই এলাকা ত্যাগ করে। কিন্তু তার মাথায় যেহেতু ভারী গুলির বাক্স ছিল,সে সেটা রেখে পালাতে পারেনি। সে পেছনে পরে যায়, এরপর কাউকে খুজে না পেয়ে সেই বাক্স মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আর পাক বাহিনীর ঘেরাওয়ের মধ্যে পরে যায়। তাকে যে দ্বায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, সেই গুলির বাক্স হেফাযতে রাখা তাঁর কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সে গুলির বাক্স সহ ধরা পরে যায়। এরপর তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়,তখন সে এসবই বলছিল,কিন্তু তাঁর ভাষার জন্য কেউ সেভাবে বুঝতে পারছিলনা।“

তাঁর (ওই ছেলেটির) বক্তব্য ফ্লাঃ লেঃ আলম বুঝিয়ে বললেন। এরপর একজন নায়েক কিংবা এমন পদের সৈনিক আসলো। তাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। এরপর বুট দিয়ে মাথার একপাশে লাত্থি দিল। উনার মনে হল যে খুলি ফেটে যাবে। আবার পেটের মধ্যে লাত্থি দিল। যখনই পেটে লাত্থি দিচ্ছিল, তখনই মুখ দিয়ে দল দলা রক্ত বের হচ্ছিল। মাথায় লাত্থি দিলে ছিটকে ছিটকে রক্ত বের হচ্ছিল,যার জন্য পুরা কক্ষে ছোপ ছোপ রক্ত দেখতে পাচ্ছিলেন ফ্লাঃ লেঃ আলম। উনি এতোক্ষনে এরকম দলা দলা আর ছোপ ছোপ রক্তের কারন কি বুঝতে পারলেন!!

মে মাস (মাঝামাঝি কোন সময়), ১৯৭১
ঢাকা, পূর্ব পাকিস্তান

ফ্লাঃ লেঃ শামসুল আলমকে ছেড়ে দেবার জন্য বলা হয়েছে। তাকে নিয়ে আসা হয় অন্য আরেক জায়গায়। ওখানে আগের মতই দিন কাটতে লাগলো। নিয়মিত মারামারি আর অন্য সময় মেঝেতে কোনমতে শুয়ে ঘুমিয়ে থাকা অথবা ঘুমাবার চেষ্টা করা ছাড়া অন্য কিছু করার ছিলোনা।

এরমাঝে এয়ারফোর্সের এক লিগ্যাল অফিসার আসলেন উনার কাছে। সেই অফিসার তাঁকে জানালেন উনার বিরুদ্ধে কোর্ট মার্শাল হচ্ছে এবং তাঁকে পিএএফ এক্টের সেকশন ২৩ দ্বারা দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এরপর তাঁর কাছ থেকে কিছু কাগজ সই করিয়ে নিয়ে যায় আর অভিযোগ পড়ে শোনায়। উনি জানতেন না যে সেকশন ২৩ এ কি আছে। এরমধ্যে অনেক ঘটনা ঘটেছে সেকশন ২৩ এ কি আছে সেটা জানবার প্রচেষ্টায়,যেগুলো হয়তো অপ্রাসঙ্গিক। শেষ পর্যন্ত একটা নিউজপেপার হাতে পাবেন উনি,যেটার একপাশে কৌশলে ফটোকপি করা ছিলো “পিএএফ এক্টের সেকশন ২৩”। ,যাতে বলা আছে, এর শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদন্ড অথবা যাবজ্জীবন। উনি ভাবলেন,হয় জীবন এভাবেই কেটে যাবে। নয়তো কিছুদিনের মধ্যেই মারা যাবেন। এর যেকোন একটার চেয়ে জীবনের ঝুঁকি নেয়াটাই ভালো মনে করলেন।

জুন (হয়তো প্রথম সপ্তাহ), ১৯৭১
ঢাকা, পুর্ব পাকিস্তান

ফ্লাঃ লেঃ শামসুল আলমদের ১ দিন কিংবা দুইদিন পর পর গোসলের জন্য কিছুটা সময় দেয়া হতো। গায়ে দুর্গন্ধযুক্ত কাউকে পেটাতে আসার সময় সেই গন্ধ নাকে আসলেও তো খারাপ লাগে,এজন্যই হয়তো তারা আমাদের গোসলের সুযোগ দিত। আর টয়লেটও ছিল সেখানেই। উনি লক্ষ্য করে দেখলেন,গোসলের জায়গার টিউবওয়েলের সামনে কাঁটাতারের ফেন্সিং আছে,তবে সামনের প্রায় ফাঁকা। আশেপাশে প্রায় কিছুই নেই। আর কিছুদিন যাবার পর দেখলেন যে প্রহরীরা যারা উনাদের নিয়ে যেত সেখানে,তারাও খানিকটা ঢিলেঢালা হয়ে গেছে। গোসলের সময়টায় কি করছেন সেটা সেভাবে খেয়াল করতোনা। তিনি এমনই কোন কিছুর সুযোগ নিয়ে একদিন ভোরে গোসলের সময় প্রহরী একটু অসতর্ক হতেই কাঁটাতারের ফাঁক গলে শরীর বের করে দিয়েই ছুটতে শুরু করলেন। পেছনে কি হয়েছে তাঁর জানা হবেনা।

প্রায় ঘন্টাখানেক এভাবে ছুটবার পর উনি সম্ভবত মিরপুরের দিকের কোথাও আসবেন (উনাকে সম্ভবত মোহাম্মদপুরের আশেপাশের কোন জায়গায়ই রাখা হয়েছিল)। পকেটে একটা পয়সাও নেই, উনি এক ট্যাক্সিওয়ালাকে দেখতে পেলেন। উনি ট্যাক্সিওয়ালাকে বললেন উনাকে সেগুনবাগিচায় নিয়ে যাবার জন্য। তাঁর পোশাকের অবস্থা দেখে সে দ্বিধায় ছিল। এরপর কি মনে করে জানি রাজী হয়ে গেলো। এরপর বাসায় নেমে ভাড়া মিটিয়ে দিলেন।

বাসায় তাঁকে দেখে সবাই তো অবাক, তাঁরা কেউ জানতোনা যে তিনি এতোদিন ধরে দেশে। উনি অল্প কিছু ঘটনা তাঁদের খুলে বললেন। এরপর কিছু জিনিস আর অল্প কিছু টাকা গুছিয়ে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে চলে যাবেন পরিচিত এক জায়গায়। আর পরিবারের অন্যদের উনার সাথে সেখানে গোপনে যোগাযোগ করতে বললেন। বললেন বাসায় কেউ এলে যাতে বলা হয় তারা কোন খোঁজ জানেননা। সেদিনই তাঁর বাসায় তল্লাশী করতে আসবে পাকিস্তানীরা। তাঁর কথা জিজ্ঞেস করাতে পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হবে উনি পশ্চিম পাকিস্তানে আছেন। উনি যে দেশে এসেছেন এ ব্যাপারে তারা কিছুই জানেনা বলে কান্নাকাটি শুরু করে দেবে। এরপর পাকিস্তানীরা চলে যাবে।

এর কিছুদিন গোপন স্থানে থেকে বাসায় ফিরে এসে পরিচিত কিছু মানুষের মাধ্যমে সবকিছু ঠিক করে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন ফ্লাঃ লেঃ শামসুল আলম। সেটা এক অন্য অধ্যায়।

লেখাঃ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট (অবঃ) শরীফ তমাল 

ছবি ১ঃ  বাংলাদেশের স্থপতি ও অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে অমিততেজী বীর শ্রদ্ধেয় শামসুল              আলম বীর উত্তম।

ছবি ২ঃ  নাতিকে কোলে উচ্ছসিত বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রদ্ধেয় শামসুল আলম বীরপ্রতীক।

ছবি ৩ঃ  কিলো ফ্লাইটের ৩রা ডিসেম্বর ১৯৭১ দিবাগত রাতে চালানো বিমান আক্রমণের পর চট্টগ্রাম ইস্টার্ন রিফাইনারি’র                   অয়েল ট্যাঙ্ক জ্বলতে থাকার ছবি। ছবিটি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ফটো সাংবাদিক তুলেছেন ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১। সেইরাতে বহু মাইল দূর থেকেও দেখা গিয়েছিল এই আগুনের আভা। শোনা যায় পুরো তেলের স্টক শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলেছিল সেখানে, একটানা তিন দিন। সূত্রঃ গেরিলা ১৯৭১

 

Comments

comments

You might also like More from author

Leave A Reply

Your email address will not be published.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ