কুমারী কন্যা লজ্জাবতী : রায়হানা জান্নাত মম 

সাহিত্য ও সংস্কৃতি ।। 

কুমারী কন্যা লজ্জাবতী : রায়হানা জান্নাত মম
===================================

জীবন নদীর তীরে এক সমুদ্রের ঢেউ এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা অনেক পুরানো নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ এক রাজ কন্যার বসবাস। তা অজানা ছিল সবার কাছে। সমুদ্রের মাঝে ঢেউ এর সৌন্দর্যে সুন্দর কোন স্তুপের মত মনে হয়। যেন এই স্তুপের মতই ছলছল আখিঁ আর মুখে হাসি নিয়ে এই পাষান পৃথিবী ও মরুভূমির বুকে তার আগমন।এই রাজকন্যার জীবনে দু:খের কোন অভাব ছিল না। তারপরেও স্বপ্ন দেখে ছিল কোন এক রাজকুমার এসে রাজ কন্যাকে মুক্ত করে নিয়ে যাবে এই সমুদ্রের ঢেউ এর আড়ালে থেকে। রাজকন্যা আরো ভেবে ছিল হয়ত তুমিও আমার জন্য কোন এক অজানা মনে অপেক্ষা করছো। ভেবেছিলাম হয়তো তুমিও একদিন আমার হাতে হাত রেখে বলবে ভালবাসি তোমায়।কিন্তু—কই কি হল” তোমায় দেখা আজও পেলাম না। আামার অপেক্ষার মর্যাদা তুমি দিলেনা শেষ পযর্ন্ত।

স্বপ্ন—তুমি যদি সত্যি না  হও!! আর বাস্তবতা তুমি যদি স্বপ্নে না আসো!!স্বপ্ন আর বাস্তবতার আড়ালে প্রজাপতির সাত রং মেঘে এক অব্যক্ত ভালবাসার মেঘাচ্ছন্ন আকাশ বুকে জড়িয়ে এই সেই রাজ কন্যা।স্বপ্নের আলিঙ্গন মেঘে যখন সে ঘুম থেকে উঠত তখন তার মায়াভরা চোখে নাম না জানা রাজ কুমারই ভাসত। আর মৃদু হাসি  দিয়ে বলত তোমাকে আজও স্বপ্নে দেখলাম, কিন্তু তা কি আর সত্যি হবে না?ছায়া মূর্তির বেশে কয়দিনের জন্য এসে কেমন যেন শূন্যতার আবেদনকে আরো গভীর করে দিয়ে গেছো তুমি হে আমার স্বপ্নে রাজকুমার।অপেক্ষাই এই একাকীত্বের যে পরম বন্ধু এখন শুধুই —-অপেক্ষা। এই ভেবেই রাজ কন্যার দু,চোখে অশ্রু ঝরছে।হয়ত প্রজাপতিরা তার সমৃতির বহু রং মেখে তার বার্তা নিয়ে সামনে এসে রাতে টুকরো টুকরো জোৎস্না চুরি করে জোনাকিরা যখন তার কাছে হয়তো কথা  ওর খুব মনে পড়বে।কিন্তু—কি লাভ এই অবাঞ্চিত অপেক্ষার। যে কিনা স্বপ্নে এসে স্বপ্নেই চলে গেল আমাকে একা করে। বড় একা আমাকে আমার ভালবাসার অপেক্ষা গুলোকে শুধু স্মৃতির ডায়রীতে রেখে গেলে তুমি।

প্রতিদিনের মত আজ সকালেও ঝড় বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভে ঙ্গেছে। তবে আজ একটু অন্য রকম বৃষ্টি। আর তা হলো মিথ্যে স্বপ্ন, বুক ভরা ভালবাসা, আর দু’চোখের বৃষ্টি। এভাবেই হঠাৎ একদিন রাজ কন্যা তার স্বপ্নের রাজকুমারের দেখা পেল এবং বাস্তবে রাজকুমারকে দেখতে পেয়ে আরও বেশি ভালবেসে ফেলে। তারপর রাজকন্যা ভেবেছিল আমি যেদিন এই বেড়াজাল থেকে মুক্তি পাব সেদিন আমার রাজকুমারকে আমার মনের কথা জানাবো।ততদিন না হয় অপেক্ষায় থাকব? ভাগ্যের কি নিমর্ম পরিহাস সেই দিন রাজকন্যা মু্ক্ত হল ঠিক সেই দিনেই রাজকুমার এক প্রবল নদীর স্রোতে হারিয়ে গেল। সেদিন আকাশে চাদঁ ছিল কিন্তু চাদঁনী ছিল না। রাজকন্যার মনের কথঅ আর বলা হল না।বুকের পাথর চাপা দিয়ে মৃত্যুটাকে হাসি মুখে বরণ করে নিল। শুধু একটা কথা এই জনমে তোমাতে আমার করে পাওয়া হল না। কিন্তু পরের জনমে আমার জন্য অপেক্ষায় থেকোও।এখানেই শেষ নয়। বড় আশ্চর্যের কথা হলো এই যে, রাজকন্যা রাজকুমারের পরিবারের খুঁজ জানতে পারল।এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহন করে রাজকুমার।  বাবা মায়ের আদরের ২টি মাত্র সন্তান। বড় সন্তান মারা গেল এবং ছোট সন্তানের হার্টের সমস্যা। অনেক চিকিৎসা করানো হল। রাজকুমারের মায়ের সন্তান হওয়ার ধারন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে।এই অবস্থাই রাজকুমারের পরিবার জীবন্ত লাশের মত জীবন যাপন করছে।

এমন সময় রাজকন্যা নিজের দুঃখ ভুলে গিয়ে তাদের পরিবারের পাশে এসে দাড়ালো। মামী এবং খালার নিমর্ম অত্যাচার সহ্য করেও পড়াশুনার প্রতি আগ্রহ কমে যায়নি বরং দিন বেড়েই চলেছে। এতো কিছুর পরেও পড়াশুনা করল। এত কষ্টের প্ররিশ্রমতো আর বিফলে যেতে পারে না। কিছুদিন পর রাজকন্যা একটা চাকরি হল, প্রতি মাসে ২০-২৫ হাজার টাকা মাইনে পায়।সেই সাথে রাজকুমারের পরিবারে সেবা যত্নে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। আস্তে আস্তে রাজকুমারের ভাইয়ের চিকিৎসা খুব গুরুত্ব সহকারে চলছে।রাজকুমারের বাবা-মা পুত্রের শোকে কাতর ছিল। তা কিছুটা হলেও মুছে যেতে লাগল।তাদের চোখে এখন আর বৃষ্টি নেই, কালো মেঘের ছায়া আস্তে আস্তে কেটে যাচ্ছে এবং তাদের মুখে হাসি, আর মনের আনন্দ অনুভব করতে লাগল। এই সবই সম্ভব হল রাজ কন্যার ত্যাগের জন্য নিজের বুকে কান্না জমা রেখে অন্যের মুখে হাঁসি ফুটানো এত সহজ নয়, এমন উদার মনের মানুষ আজও পৃথিবীতে আছে ভাবতে বড় অবাক লাগে তাই না?

যে বুকে এত কান্না আছে, সে ‍বুকে ভালবাসাতো আসবেই। আজ বুঝেছি আল্লাহ বড় বিচিত্র। কখনো নিমর্ম, কখনো করুনাময়।তিনি সবাইকে সবকিছু দেন না। যে পরিশ্রমের বিনিময়ে সফলতা অর্জন করবে, পরের উপকারে সবদাই নিজেকে নিয়োজিত রাখিবে।অগনিত মানুষের চোখের অশ্রু মোচন করে মুখে হাসি ফুটাবে । সে ব্যক্তিগত জীবনে কিছুতেই সুখী হতে পারে না। নিজের জীবনের চরম অভিঞ্জতা দিয়ে আমি এই সত্য উপলব্ধি করলাম।তবে সুখের সাগরে ডুব দিয়ে অন্যের দুঃখ উপলব্ধি করা যায় না। তার জন্য বিশাল হৃদয়ের অধিকারী হতে হয়।

কুমারী কন্যার লজ্জাবতী তার এই প্রমাণ। সত্যিকারের ভালবাসা কেবলমাত্র দিতে শিখে নিতে নয়।

 

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/০২-০৭-২০১৭ইং/ অর্থ 

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ