বৈষ্ণবচূড়ামণি ‘শ্রীল বংশীদাস বাবাজি’ ও লীলা মাহাত্ম্যের কিছুকথা

সুমিত বণিক ।। আপন জন্মের ব্যাপারে মানুষের নিজের কোনো ভূমিকা থাকে না। উঁচু-নিচু, ধনী বা দরিদ্র পরিবারে তার জন্ম হওয়াটা তার ইচ্ছা বা কর্মের ওপর নির্ভর করে না। কিন্তু কর্ম জীবনে তার ভূমিকা ও অবদানের দায় তার নিজের ওপর বর্তায়। তাই পৃথিবীতে মানুষের প্রকৃত বিচারে তার জন্ম-পরিচয় তেমন গুরুত্ব বহন করে না। বরং কর্ম-অবদানের মাধ্যমেই মানুষ পায় মর্যাদার আসন, হয় বরণীয়- স্মরণীয়। সমাজে এক শ্রেণির লোক আছে যারা বংশ আভিজাত্যে নিজেদের সম্ভ্রান্ত মনে করেন। তারা বংশ মর্যাদার অজুহাতে সমাজে বিশেষ মর্যাদা দাবি করেন। কিন্তু তাদের এই প্রয়াস বাস্তবতা বিবর্জিত ও হাস্যকর। সমাজের নিচু তলায় জন্ম নিয়েও মানুষ কর্ম ও অবদানে মহামানব হতে পারে। মানব সমাজের ইতিহাসে এ রকম উদাহরণ অজস্র।

ছোট বেলায় দাদুদের মুখে তেমনই একজন মহাপুরুষের নাম শুনেছি, তিনি হলেন বৈষ্ণবচূড়ামণি শ্রীল বংশীদাস বাবাজি। যিনি ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার মজিতপুর গ্রামে আবির্ভূত হন। ছোট বেলায় শুনেছি ও দেখেছি তিরোধান দিবসের উৎসবে যোগ দিতে আমার দাদু স্বর্গীয় অমুল্য চন্দ্র বণিকসহ অন্য দাদুরা মিলে প্রতিবছর নৌকা যোগে রাতেই রওনা হতেন। ঐখানে উনারা গিয়ে কীর্তন করতেন। তখনও জানার সুযোগ হয়নি যে, উনি কে ছিলেন? কি ই বা উনার মাহাত্ম্য?

সম্প্রতি শ্রীমৎ ভক্তিবিকাশ স্বামীর লেখা ইসকন্ এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান হরেকৃষ্ণ পাবলিকেশন্স এর প্রকাশিত শ্রীল বংশীদাস বাবাজি গ্রন্থটি পড়ে অনেক অজানা তথ্য জানার সুযোগ হয়েছে। সুযোগ হয়েছে তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার কথা জানার, সর্বোপরি তিনি যে একজন কৃষ্ণপ্রেমের আনন্দসাগরে সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত এক মহামানব ছিলেন, যিনি অবিচ্ছেদ্য বন্ধু ও সঙ্গীরূপে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কে তাঁর সাথে সর্বত্র নিয়ে যেতেন এবং ‍তিনি শ্রী বিগ্রহের সাথে কথা বলতেন, যা তিনি ভিন্ন অন্য কেউ শুনতেন না। গ্রন্হটির বংশীদাস চরিত অংশে লেখা আছে- গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধারার পরমহংস বাবাজিগণ শাস্ত্রবিধি অনুসরণ করতেন না, এমনকি বর্ণাশ্রম ধর্ম বা পারমার্থিক উন্নতির জন্য সাধনভক্তিও অনুশীলন করতেন না। তাই তাঁদের বলা হতো অবধূত। অবধূত মানে সাধারণ বিধি বিধানের অতীত এবং যাদের আচরণ সাধারণের কাছে অদ্ভুত বলে প্রতীয়মান হয়। অবধূত বাবাজিদের মধ্যেও বংশীদাস বাবাজির আচরণ ছিল অনন্য। তাঁর ব্যবহার এতই ব্যতিক্রম ছিল যে, পারমার্থিক সংস্কৃতি দূরে থাক ভারতের কোন সংস্কৃতিই তাঁর আচরণের সাথে মিলত না। তাই লোকজন তাকে পাগল বলত। এ জড়জগতের প্রতি তাঁর কোনো আকর্ষণই ছিল না। তিনি ছিলেন ছয় ফুট লম্বা ও স্বাস্থ্যবান। তাঁর চুল-দাড়ি ছিল লম্বা, জটা পাকানো ও অগোছালো। তিনি কদাচিৎ স্নান করতেন, তাঁর চক্ষুদ্বয় ছিল বন্য, গভীর অরণ্যের মতো।

গ্রন্থকার ভক্তিবিকাশ স্বামী নিজেই প্রারম্ভিক অংশে লিখেছেন-শ্রীল বংশীদাস বাবাজির হাবভাব যেমনই হোক না কেন, তিনি ছিলেন গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের একজন খাঁটি সাধু। গৌড়ীয় মঠ এবং তৎশাখা-প্রশাখাসমূহের বর্ষপঞ্জিতে তাঁর তিরোভাব তিথি উল্লেখ থাকে। এ গ্রন্থটি প্রকাশের পূর্বে পাশ্চাত্যদেশীয় ভক্তদের খুব কম সংখ্যকই তাঁর নাম শুনেছিলেন। তিনি যবনিকা টানেন এই বলে যে, শ্রীল বংশীদাস বাবাজির করুণা ভিক্ষা করে, আমি গ্রন্হটি পাঠকদের সামনে তুলে ধরলাম। শ্রীল বংশীদাস বাবাজির অপ্রাকৃত চরিত্র বর্ণনে অক্ষমতার কথা নিষ্কপটে স্বীকার করে আমি গ্রন্থ প্রণয়নের যেকোন ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি।  

গ্রন্হটির বংশীদাস চরিত অংশে আরো লেখা আছে-যদিও বাবাজি দেখতে নোংরা ছিলেন এবং অনেকদিন পর্যন্ত নির্জলা উপবাস করতেন, তবুও তিনি ছিলেন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। তিনি এমন অসংলগ্ন কথা বলতেন যে, এক বাক্যের সাথে অন্য বাক্যের কোনো সম্পর্ক থাকত না। তাঁর কথা আরও অবোধ্য হতো ময়মনসিংহ উপভাষায় বলতেন বলে। প্রায়ই তিনি স্বরচিত ভজনগীতি গাইতেন। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে রচিত গানগুলোর কোনো সুর, তাল বা ছন্দ ছিল না। এমনকি একসময় তিনি শুধু কৌপিন ছাড়া অন্য কিছু পড়তেন না। এমনতর ভিন্ন তথ্য সম্বলিত অনেক অজানা কাহিনী ঠাঁই পেয়েছে এই গ্রন্থটিতে।

তিনি ৮৫ বছরের ক্ষণ জীবন পরিক্রমায় ঘুরে বেড়িয়েছেন নবদ্বীপ, করুণাময় পুরোষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিত্যলীলাধাম বৃন্দাবন, পুরী। বইটিতে গ্রন্থকার শ্রী যতিশেখর প্রভুর লেখা পুস্তিকা ও যতি প্রভুর সাথে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে বাবাজির বিভিন্ন ঘটনা-আলোচনা ঠাঁই পেয়েছে শ্রীল বংশীদাস বাবাজি গ্রন্থটিতে। গ্রন্থটির প্রস্তাবনা অংশে যতিশেখর প্রভু বংশীদাস বাবাজি মহারাজ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘‘আমি অযোগ্য ও মায়াগ্রস্ত, তাই তাঁর সম্পর্কে সবকিছু যথাযথভাবে বর্ণনা করতে অক্ষম। আমার যতটুকু মনে এসেছে তাই শুধু বলেছি। ক্ষমা করবেন। সকল বৈষ্ণবচরণে নিবেদন, আমাকে কৃপা করবেন যেন সর্বাবস্থায় বংশীদাস বাবাজিকে স্মরণ করতে পারি। বংশীদাস স্মরণে সকল বিঘ্ননাশ। বংশীদাস বাবাজিকে স্মরণ করলে সব বিপদ দূর হয়। বহু দূরে অবস্থান করলেও ভজনকালে যেন আমি তাঁকে স্মরণ করতে পারি।   

অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা জানাই গ্রন্থকার ও প্রকাশক কে। এই প্রকাশনার মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম ও সনাতনধর্মালম্বীগণ এই মহাপুরুষের লীলা মাহাত্ম্যের কিঞ্চিৎ রস আস্বাদনে সমর্থ হবেন বলে আমার বিশ্বাস।     

 

লেখক- সুমিত বণিক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক।

 

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/০২-০৮-২০১৭ইং/ অর্থ 

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.