আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি চাই : জীবন তাপস তন্ময়

জীবন তাপস তন্ময় ।। জীবনে তিনটি বিষয়ের উপর খেয়াল রাখলেই হয়, আর কিছুই নয়। আত্মসমালোচনা আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি। বঙ্গবন্ধু তাঁর সারা জীবনের অভিজ্ঞানের নির্যাস আমাদের জন্য তুলে এনেছেন। জোড় গলায় তিনি এই তিনটি বিষয়ের অবতারণা করেছেন। আমরাও তাঁর বর্ণাঢ্য মহাকাব্যিক জীবনে এর প্রতিফলন দেখেছি। জাতির জনকের অন্তরবাসনা এই তিনটি বিষয়েই যদি আমরা সমান যত্মবান হই, তাহলে আমাদের যাপিত জীবনে কোন অশুভ শক্তি, বিষাদের কালো ছায়া ও দু:স্বপ্নের রাত নেমে আসবে না। মানুষ বড় শান্তিপ্রিয়। কেউই চায় না অশান্তি রেখাপাত করুক জীবনে। কিন্তু রিপুর তারণে মাঝে মাঝে যখন বিবেক লয় পায়, তখন অনভিপ্রেত দু:খ নেমে আসে জীবনে। মানুষ সৃষ্টি-সেরা জীব। কেন? শুধু মনুষ্যপরায়নতা বা বিবেকবান হেতু সহজেই অন্যান্য প্রাণীকুল থেকে আলাদা করা যায় মানুষকে।

জীবন পরিচালনার বহুমাত্রিক প্রয়াস রয়েছে। জীবনাচারে থাকে নানারূপ মাত্রা। আমি জীবন সংস্কৃতি বলি। সংস্কৃতি হচ্ছে আমাদের পরিচয়। আমাদের চলা বলা ও কলা। ধারাবাহিকতায় উৎকর্ষ লাভের প্রক্রিয়াই সংস্কৃতি। ব্যক্তিগত,পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভাবে যে রীতিনীতি ধরণ প্রতিভাত হয়, তা-ই সংস্কৃতি। ব্যক্তিই মূখ্য এখানে। ব্যক্তি যদি সুন্দর ইতিবাচক ও ধ্রুপদী মননধর্মী না হয়, ব্যক্তি যদি মৌলিক ও সহনশীল না হয়, ব্যক্তি যদি সাম্য মৈত্রি সম্প্রীতি পরায়ণ না হয়__ তাহলে সবই ব্যর্থতায় পর্যভূষিত হয়।’যতো মত ততো পথ’। ব্যক্তিভেদে চিন্তার ভিন্নতা থাকবে, ভাবনা ও প্রতীতি স্বত্ত্বাও অভিন্ন হবে না। এটিই সহজাত ও স্বতঃস্ফূর্ত আত্মচরিত আমাদের। কারও মতের প্রতি আমি সমর্থন পোষণ না-ও করতে পারি, কিন্তু সেই মত প্রকাশের স্বাধীনতা তাকে আমার দিতে হবে। বাক স্বাধীনতা ও মুক্তচিন্তা চাই সবার আগে। গণতন্ত্রের সুরক্ষা বিন্যাস ও প্রসার চাই সর্বত্র। সহনশীলতা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক মূল্যবোধ চাই সবার। এইসব সামগ্রিক ইতিবাচকতা প্রতিষ্ঠিত হবে শুধু তিনটি বিষয়ের উপর অনুশীলনে,তা হলো আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি। প্রতিনিয়ত অহর্ণিশ এই সর্বত্র এই তিনটি বিষয়ের অনুশীলন ঘটলে কোন সমাস্যাই আর হওয়ার কথা নয়।

রাজনীতি একটি দরকারি বিষয়। সব কিছুর নিয়ন্তা হচ্ছে এই রাজনীতি। রাজনীতির বাইরে আমরা কেউ নই। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যদি উল্লেখিত বিষয়ের অনুশীলন না হয়, তাহলে দেশ অন্ধকারের গভীর খাদের কিনারে এসে পতিত হবে। গণতন্ত্র সুরক্ষা যদি না হয়, তাহলে অশান্তির কালো ছায়া নেমে আসবে সবখানেই। থেমে যাবে সব। থেমে যাবে দূয়ারে সুন্দরের আবাহন। রোদ্দুরের ডাক।রাজনীতিতে উত্থান-পতন থাকবে। জোয়ার-ভাটা থাকবে। সময় খারাপ হবে। ভাগ্যও বিদ্রুপের হাসি হাসবে। কাছের মানুষটিও বেঈমানি করবে। রক্তজ আর আত্মজ সম্পর্কও মাঝে মাঝে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে। অভিমানে দূরে চলে যাবে। প্রতিহিংসা পরায়ণ হতে কুণ্ঠাহীন হবে। জীবনভর যার বিপক্ষে যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে কপটতার বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেও জীবন সায়াহ্নে সেই আদর্শহীন বুকপীঠহীন অপশক্তির সঙ্গেও লোভে আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে আঁতাত করতেও বুক কাঁপে না যাদের, তাদের নিয়ে আমার মায়া হয়। আপনি জীবনভর যে আদর্শহীন অপশক্তির বিরুদ্ধে দ্ব্যর্থহীন উচ্চকিত ছিলেন, লোভলালসায় অন্ধ হয়ে সেই সমাজবিমুখ প্রান্তরে যদি নিজেকে উজাড় করে দেন, এর মূল্য আপনাকে দিতেই হবে। আজ কাল পরশু, যেকোন দিন আপনাকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে। আত্মশ্লাঘায় আত্মদহনের জ্বালায় আপনাকে দগ্ধ হতেই হবে। নিজের ভুল ঠিকই আপনি বোঝবেন। ফেরার দায় বোধ করবেন। তখন আর ফেরা হবে না। সময়ও আপনাকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করবে। আপনি লজ্জায় নত হতে হতে মুখ লুকাতে ব্যর্থ চেষ্টা করবেন। এই প্রকৃতি এই আকাশ এই অমেয় সমীরণ এই জল এই মৃত্তিকা __ কেউই আর আপনাকে নেবে না। মুখ ফিরিয়ে নেবে। রাজনীতি প্রতিযোগিতা থাকা চাই। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা চাই। কিন্তু প্রতিহিংসা থাকতে নেই। রাজনীতিতে এক কথা বলে কিছু নেই। এক মত বলে কিছু নেই। মতপথের ভিন্নতা থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু জাতীয় স্বার্থে দেশের কল্যাণে ঐকমত্য ভাষা মেনে নিতে হবে। বৃহত্তর কল্যাণে অনেক এক হওয়ার প্রতীতি থাকা চাই।

সৃষ্টিশীল নয়, মননধর্মী নয়, রুচিঋদ্ধ নয়, স্বতন্ত্র মণ্ডিত নয়__ এমন বন্ধু আমার না হলেই চলে। মত পথ ভিন্ন হোক, সমস্যা নেই। পরিশীলিত অনুশীলন থাকলে, যেকোন মতের লোকই আমার বন্ধু হতে পারে। অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, হোক তা ভুল অন্ধ-অনুকরণ, হোক তা সমাজ বিযুক্ত _ আমি তাকে বন্ধু ভাবতেই পারি।টোটাল মানুষটাকে অস্বীকার করার হীনমন্যতা আমার নয়। কখনওই ছিল না। যা কিছু নেতিবাচকতা পরিলক্ষিত ব্যক্তির চরিত্রে, তার দায় ব্যক্তির নিজের। আমার নয়। সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত নিগৃহীত ঘৃণিত মানুষটিকেও আমি চষে দেখেছি। কোথাও কোথাও তার এমন সুন্দর সুদূর প্রসারী চিন্তাপ্রসুত আলোর বিচ্ছুরণ দেখেছি যে, মুগ্ধতায় নত হতে হয়েছে। তথাকথিত সমাজপ্রভুদের থেকেও তারা কতো ভাবনাপ্রবণ ও স্বপ্নমুখর। অবাক লাগে। সময়ের প্রহসনে তারা বিপথে চলে যায়, অভিমান থেকে ক্ষোভ থেকে। তাদের জন্য আমার গভীর মায়া। ফেরার দায় অনুভব করেন তারা, কিন্তু সমাজ তাদের ফেরার বড় অন্তরায় হয়।

আমাকে নিয়ে যদি কেউ নেতিবাচক পন্থায় যায়, তাকে অস্বীকার করতে আমার কষ্ট হয়। আমি সবার মাঝেই থাকতে চাই। সবার মাঝে থাকা যায় বুঝি? যায়। ব্যক্তির টোটাল মানুষটির সাথে নয়। যা কিছু ইতিবাচক, অন্তত সেটুকুর প্রতি আমার সমর্থন। অন্তত সেটুকুর মধ্যে আমি আছি। থাকতে চাই। সেই অর্থে সব মানুষের সাথেই আমার বন্ধুতা।

বিভাজন নয়, চাই জাতীয় ঐক্য। ঐক্যবদ্ধ জাতিকে কেউ হারাতে পারে না। গণতন্ত্র উন্নয়ন ও চিরায়ত শান্তির লক্ষ্যে ঐক্যবোধ, ঐকতান এবং ঐক্যবদ্ধতা থাকা চাই। পারস্পরিক মূল্যবোধ বজায় রাখা চাই। আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি অত্যাবশ্যকীয়। উৎসব পালনে আমরা এই অভিষ্ঠ লক্ষ্য অর্জনে সফল হবো। উৎসবই পারে সবাইকে এক ও অভিন্ন প্লাটফর্মে এনে দাঁড় করাতে। উৎসব হচ্ছে ঐক্যের প্রতীক। বিভাজন নয়। যেকোন আচার সংস্কার কৃষ্টি কালচার নিয়ে পালিত সব উৎসবেই ঐকতানের সুর বাজে, ঐক্যের ডাক দেয়।  বাংলাদেশ যখন ক্রিকেটে অন্য একটি দেশকে হারিয়ে জয়লাভ করে, তখন কোন ধর্ম বর্ণ রাজনীতি সংস্কৃতি উঁচু নীচু অন্ধকার আলো __ সব মতাবলম্বীই যারপরনাই খুশি হয়। আনন্দে উদ্দীপিত হয়। সবাই নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে দেশের জন্য এক ও অভিন্ন কণ্ঠে যুথবদ্ধ হয়। এক কাতারে এসে দাঁড়ায়। এই দেশটি যখন তেমনি করে দৈবকৃত অন্য একটি দেশের কাছে হেরে যায় ক্রিকেটে, সবার মনের আকাশে দেখা দেয় বিষাদের কালো মেঘ। কখনো তা বৃষ্টি হয়ে কান্না হয়ে ঝরে পড়ে। চোখে ভেঙে চৌচির হয় স্বপ্ন।

আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির অনুশীলন করি সদা-সর্বদা। তাহলেই সব নেতিবাচকতা হ্রাস পাবে। চিরশান্তির আস্বাদন পাবে সবাই। বঙ্গবন্ধু এমনটিই স্বপ্ন দেখতেন। আমরা তাঁর এই মহতি স্বপ্ন পুরণে আজ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ও বদ্ধপরিকর। 


লেখক- জীবন তাপস তন্ময় (সাংবাদিক ও গবেষক) 

 

 

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/০৪-০৮-২০১৭ইং/ অর্থ 

 

 

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.