কিশোরগঞ্জে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ : সরগরম রাজনীতির মাঠ

সরগরম কিশোরগঞ্জের রাজনীতির মাঠ

মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ ।।

আগামী ১১তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন সংসদীয় আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপে রাজনীতির মাঠ সরগরম হয়ে উঠেছে। জেলার মোট ছয়টি সংসদীয় আসনে বড় দুই দল আওয়ামীলীগ ও বিএনপির একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থীরা রয়েছেন। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আবার সাবেক ও বর্তমান ছাত্রনেতারও মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন।

জেলার ছয়টি আসনে আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দলের অর্ধশতাধিক প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত জামায়েত ইসলামীর কোনো প্রার্থীর তত্‍পরতা এখনও দৃশ্যমান নয়। তবে বাম দলগুলোর মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টি ও বাসদের প্রার্থীর পদচারণরা লক্ষ্য করা গেছে।

প্রধান দুই দলেই রয়েছে হেভিওয়েট প্রার্থী। তাদের মধ্যে কেউ কেউ হাওর এলাকায় অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যে ছুটে বেড়াচ্ছেন। কেউ কেউ আবার সংসদীয় আসনের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটাছুটি করে প্রার্থীতার জানান দিচ্ছেন। এ ছাড়াও অনেকে আবার পোস্টার, ব্যানার লাগিয়ে নিজেদের প্রার্থীতার জানান দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এর আগে রোজার ঈদকে সামনে রেখে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন ইফতার মাহফিল, সুধী সমাবেশ,কর্মী সমাবেশ,সাধারণ মানুষের মাঝে ঈদ সামগ্রী বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দলীয় নেতা-কর্মীসহ জনগণের দৃষ্টি আকষর্ণের চেষ্টা করেছেন।

পিছিয়ে নেই সরকার দলের বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্যরাও। তারা এখন ঘন ঘন এলাকায় এসে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে জনগণের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মনোনয়ন প্রত্যাশীর এমন দৌড়ঝাঁপে অনেকটাই সরগরম ক্ষমতাশীন দলের নেতারা।

এ বিষয়ে নীতি নির্ধারকরা বলছেন, দলীয় সরকার গঠনের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে আগামী নির্বাচনে দল থেকে যাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে তাদেরকে বিজয়ী করাই দলের মূল লক্ষ্য।

কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) : এ আসনে আওয়ামীলীগের বর্তমান সাংসদ দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বর্তমান প্রেসিডিয়াম সদস্য ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামই শেষ কথা। তিনি এ আসন থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার অবদানেই এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে।

অন্যদিকে এ আসনে বিএনপি থেকে জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাসুদ হিলালী এর আগে তিনবার মনোনয়ন পেলেও জয়লাভ করতে পারেননি। বর্তমানে তিনি ছাড়াও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দৌড়ে জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খালেদ সাইফুল্লাহ (ভিপি সোহেল), জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওয়ালিউল্লাহ রাব্বানী, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি রেজাউল করিম খান চুন্নু, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইসরাইল মিয়া, পৌরসভার সাবেক মেয়র আবু তাহের, হোসেনপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম মবিনের নাম শোনা যাচ্ছে।

এ আসনে জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আশরাফ উদ্দিন রেণু। কমিউনিস্ট পার্টি থেকে জেলা সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক ও বাসদ থেকে জেলা সমন্বয়ক শফীকুল ইসলাম কাজ করে যাচ্ছেন।

কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) : এ আসনে আওয়ামীলীগের বর্তমান সংসদ সদস্য মো. সোহরাব উদ্দিন। তবে দলীয় কোন্দলে তিনি অনেকটা কোণঠাসা। এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দৌড়ে পুলিশের সাবেক আইজিপি ও সমাজসেবক নূর মোহাম্মদ অনেকটা এগিয়ে আছেন।

এ ছাড়াও জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমএ আফজল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালের প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান বাদল, সাবেক কটিয়াদী উপজেলা চেয়ারম্যান লায়ন আলী আকবর, আওয়ামীলীগ নেতা ড. জায়েদ মো. হাবিবুল্লাহ, মঈনুজ্জামান অপু ও যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা রফিকুল ইসলাম আওয়ামীলীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রপতির মেজ ছেলে রাসেল আহমেদ তুহিন এ আসনে নির্বাচন করতে আগ্রহী ছিলেন বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইবেন সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রঞ্জন। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় সক্রিয়। এ ছাড়াও বিএনপি থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী গণসংযোগ করছেন জেলা সহ-সভাপতি ও সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা রুহুল আমিন আকিল। এ ছাড়া জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আশফাক আহমেদ জুন ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শহীদুজ্জামান কাঁকন, জেলা বিএনপির উপদেষ্টা ইদ্রিস আলী ভূঁইয়া, সাবেক মেয়র জালাল উদ্দিন, সাবেক ছাত্রনেতা সেলিমুজ্জামান, অ্যাডভোকেট মাহমুদুল ইসলাম জানু ও শাহিদুল ইসলাম মনোনয়ন তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ আসনে জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থী জেলা জাতীয় পার্টির শিক্ষা ও সংস্কৃতি সম্পাদক, বাংলাদেশ শিশুকল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি সৈয়দ সাদরুলউলা মাজু এবং কমিউনিস্ট পার্টি থেকে জেলা সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া বাসদ থেকে আশরাফউদ্দিন মেনুর নাম শোনা যাচ্ছে।

কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) : মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন পেয়ে এ আসনে বিগত দুটি নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বর্তমান শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু। জোটগতভাবে নির্বাচন হলে তিনিই জোটের সম্ভাব্য প্রার্থী। এর আগে এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ড. মিজানুল হক। বর্তমানে তিনি ছাড়াও বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে প্রার্থিতা জানান দিচ্ছেন করিমগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের সদস্য এমরান আলী ভূঁইয়া, ঢাকা বিভাগীয় সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সিনিয়র সহ-সভাপতি শেখ কবীর আহমেদ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এরশাদ উদ্দিন, করিমগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক নাসিরুল ইসলাম খান আওলাদ ও যুক্তরাজ্য প্রবাসী আওয়ামীলীগ নেতা ড. আনিসুর রহমান।

বিএনপি থেকে এ আসনে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুকই দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থী। তবে কোনো কারণে তিনি নির্বাচন করতে না পারলে তার স্ত্রী রানা ফারুকও দলের মনোনয়ন পেতে পারেন। এ ছাড়াও এ আসনে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা, উপজেলা চেয়ারম্যান তাইফুল ইসলাম (ভিপি সুমন) ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি জালাল মোহাম্মদ গাউস মনোনয়ন প্রত্যাশী।

এ আসনে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে সাবেক জেলা সভাপতি ডা. এনামুল হক ইদ্রিস কাজ করে যাচ্ছেন।

কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) : এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতির বড় ছেলে ইঞ্জিনিয়ার রেজওয়ান আহমেদ তৌফিক। তিনি এ আসন থেকে দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। দলীয় কর্মসূচিতেও তিনি সক্রিয়। এ ছাড়া এ আসনে জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি কামরুল আহসান শাহজাহানের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে শোনা যাচ্ছে।

বিএনপি থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ফজলুর রহমান।

এ ছাড়াও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম রতন, কিশোরগঞ্জ বারের সহ-সভাপতি ফজলুর রহমান শিকদার ও ড্যাব নেতা ফেরদৌস আহমদ চৌধুরী লাকী মনোনয়ন তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থী অষ্টগ্রাম উপজেলা সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা কাজী আফতাব। বাসদ থেকে তপু ভূঁইয়ার নাম শোনা যাচ্ছে।

কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) : এ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বর্তমান সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আফজাল হোসেনের নাম শোনা যাচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অজয় কর খোকনও শক্ত প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বাজিতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আলাউল হক, জেলা কৃষক লীগের সহ-সভাপতি সাংবাদিক ফারুক আহমেদ,সংসদীয় আসনের দুঃসময়ের কান্ডারী আব্দুল লতিফের ছেলে ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিল্টনের নাম বেশি শোনা যাচ্ছে।

বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি, বাজিতপুর উপজেলা সভাপতি ও দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল অনেকটাই নিশ্চিত। ঢাকা ও লন্ডন থেকে সবুজ সংকেত পেয়ে তিনি নির্বাচনী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। এবারের আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে জনপ্রতি ৫০ কেজি করে আটা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। এছাড়াও বিএনপির অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থীরা হলেন জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি সালেহুজ্জামানু খান রুনু, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও নিকলী উপজেলা সভাপতি বদরুল মমিন মিঠু, বাজিতপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র এহেসান কুফিয়া, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ইশতিয়াক আহমেদ নাসির, প্রয়াত সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান মঞ্জুর ছেলে মাহমুদুর রহমান উজ্জ্বল ও অধ্যাপক তোফাজ্জল হোসেন বাদল।

এ ছাড়া ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে মুসলিম লীগ সভাপতি সাবেক গভর্নর মোনায়েম খানের ছেলে খসরুজ্জামান খান নির্বাচন করতে পারেন। এ আসনে জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জেলা জাতীয় পার্টির সদস্য মাহবুবুল হক ও বাসদ থেকে সাজেদুল ইসলাম সেলিমের নাম শোনা যাচ্ছে।

কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ারচর) : এ আসনে আওয়ামীলীগ থেকে বর্তমান সংসদ সদস্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। এলাকার উন্নয়নেও তার যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। আগামীতেও তিনিই প্রার্থী হবেন বলে শোনা যাচ্ছে। তিনি ছাড়াও প্রার্থী হিসেবে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. মুছা মিয়া (সিআইপি) নাম শোনা যাচ্ছে।

বিএনপি থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী জেলা সভাপতি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শরিফুল আলম। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই দলীয় কর্মসূচিসহ বিভিন্নভাবে এলাকায় তৎপরতা চালাচ্ছেন।

জাতীয় পার্টি থেকে এ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী ভৈরব উপজেলা সভাপতি আবদুস সালাম। বাসদ থেকে এ আসনে জুনায়েদুল ইসলামের নাম শোনা যাচ্ছে।

 

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/০৮-০৮-২০১৭ইং/ অর্থ

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.