দাস প্রথা সমাজের অন্ধকার

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ,
আগস্ট ২২, ২০১৭ ১:২০ অপরাহ্ণ
রাফা নোমান, স্টাফ রিপোর্টার ।।
দাস প্রথাকে মানব ইতিহাসের একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় বলা যায়। এখন দাস প্রথাকে যত অদ্ভুতই মনে হোক না কেন, এক সময় এটিই ছিল স্বাভাবিক। বিত্তশালীদের আভিজাত্যের প্রতীক ছিল দাস। শিক্ষিত বুদ্ধিজীবি শ্রেণীর ঘরেও দাস থাকতো।
অবশ্য এখন সবাই দাস প্রথাকে অমানবিক মনে করেন। এই দাস প্রথাকে উচ্ছেদ করতে গিয়েই যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ বেঁধে গিয়েছিল। সে যুদ্ধে আব্রাহাম লিংকন জিতেছিলেন এবং দাস প্রথার বিলোপ ঘটাতে পেরেছিলেন।
বর্তমান বিশ্বে এখনো ২ কোটি ৭০ লক্ষ দাস রয়েছে। এই সংখ্যা ইতিহাসের যে-কোনো সময়কার দাসের সংখ্যার তুলনায় বেশি। এমন কী প্রায় ৪০০ বছরের ইতিহাসে আফ্রিকা থেকে আমেরিকায় আনা আফ্রিকান দাসের মোট সংখ্যাও এর প্রায় অর্ধেক।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা জোরপূর্বক শ্রম দেওয়াকে দাসত্ব হিসেবে ধরে না। তাদের হিসাব অনুযায়ী এখনো বিশ্বের ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ জোরপূর্বক শ্রম, দাসত্ব, ও দাসত্ব সংশ্লিষ্ট প্রথার কাছে বন্দী।
এই দাসের বেশির ভাগই ঋণ শোধের জন্য দাসে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী মহাজনদের কাছ থেকে অর্থ ধার নিয়ে পরবর্তী অর্থ শোধ দিতে না পারায় দাসে পরিণত হয়েছে। এদের মধ্যে কিছু আছে যারা কয়েক প্রজন্মের জন্য দাস।মানুষ পরিবহন মূলত হয়ে থাকে নারী ও শিশুদের যৌন ব্যবসায় ব্যবসায় খাটানোর জন্য এটিকে বর্ণনা করা হয় ‘ইতিহাসের সর্ববৃহৎ দাস বাণিজ্য’ হিসেবে। অবৈধ মাদকদ্রব্য পরিবহনে ব্যবহার করার কারণে একই সাথে এটি বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অপরাধ ক্ষেত্র। প্রাচীনকালে এবং মধ্যযুগে সমাজে মানুষ কেনা বেচার একটি প্রথা ছিল। যা দ্বারা বিভিন্ন মূল্যের বিনিময়ে মানুষ কেনা যেত। এই প্রচলিত প্রথাটিকেই দাস প্রথা বলা হয়ে থাকে। দাস অথবা দাসী বর্তমান বাজারের পণ্যের মতই বিক্রি হত। বতমার্নে যেমন পণ্য বেচা কেনার বাজার আছে অতীতেও দাসদাসী বিক্রি অথবা ক্রয় এর জন্য আলাদা বাজার ছিল। তখন দাসদাসী আমাদানী এবং রপ্তানীতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হত এবং এটা দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব পড়তো। সাধারণত দাসদাসীরা আফ্রিকান হত। আফ্রিকান দাস এর মধ্যে হাবশি ও কাফ্রির চাহিদা ছিল বেশী। বাংলায় এসব দাসদাসী ৫ থেকে ৭ টাকায় কেনা যেত এবং স্বাস্থ্যবান দাস প্রায় ২০ থেকে ২২ টাকায় কেনা যেত ।দাসদের দিয়ে ২ ধরনের কাজ করানো হত— কৃষি কাজ এবং গার্হস্থ্য কাজ। তখন সমাজে গুটি কয়েক দাস রাখা একটি সামাজিক মযাদার্র ব্যাপার ছিল। তাছাড়া উচ্চ বিত্তরা তাদের দাসদের দিয়ে বিভিন্ন কৃষি কাজ করাতেন। যেমন: হালচাষ, সেচ এর পানি, মাটি উর্বর করানো, গবাদী পশু পালন, তাদের রক্ষনাবেক্ষণ ইত্যাদি কাজ করতো। দাসীদের সাধারণত রাখা হতে যৌন লোভ লালসা পূরণ করার জন্য। তাদের উপপত্নি করে রাখা হত এবং তাদের সন্তানদেরও দাস রুপে রাখা হত বা বিক্রি করা হত।
 প্রাচীন দক্ষিণ এশীয় পণ্ডিত কৌটিল্য দাসপ্রথা তুলে দিতে তার সম্রাটকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। সম্ভবত এটাই দাসপ্রথা বিলোপের প্রথম উদ্যোগ।
প্রাচীনকালের অধিকাংশ বড়মাপের দাস বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ১৪০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৭০ অব্দের মধ্যে। অর্থাত্ রোমান সাম্রাজ্যের একটি বিশেষ পর্বে। খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ক্রমাগত বিদ্রোহের ঘটনা ঘটতে থাকে। যেমন : খ্রিস্টপূর্ব ১৩৬-১৩২ সময়কালে সিসিলির প্রথম যুদ্ধ, ১৩৩-১২৯ সময়কালে এশিয়াতে অ্যারিস্টোনিকাসের অভ্যুত্থান, ১০৪ থেকে ১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত সিসিলির দ্বিতীয় যুদ্ধ এবং খ্রিস্টপূর্ব ৭৩-৭১ সময়কালে বিখ্যাত স্পার্টাকাসের বিদ্রোহ।
আধুনিক সমাজে সেই দাস প্রথা রদ করা হয়েছে। আগামিকাল বুধ বার আন্তর্জাতিক দাস বাণিজ্য স্মরণ ও রদ দিবস। ইউনেস্কোর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি বছর ২৩ আগস্ট আন্তর্জাতিকভাবে দাস বাণিজ্য স্মরণ ও রদ দিবস হিসেবে পালিত হয়।
বন্দীত্বের এই জালে আমরাও জড়িয়ে রয়েছি। কেউ প্রতক্ষ্য, আবার কেউ বা পরোক্ষভাবে। সভ্যতার বিকাশ ঘটলেও, এই প্রথা এখনও বিদ্যমান। হয়তো এর রীতিতে পরিবর্তন এসেছে। ক্ষেত্র বিশেষ পরিবর্ধনও বিদ্যমান। ‘জোরপূর্বক শ্রম আদায়’-এর এই ধারা কী অব্যাহত থাকবে?

 

 

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/২২-০৮-২০১৭ইং/ অর্থ 

Comments are closed.