বগুড়ার সেই তুফানের চাঁদাবাজ চক্র এখনো সক্রিয়

এম নজরুল ইসলাম, বগুড়া থেকে ।। 

বগুড়ায় কিশোরী ছাত্রীকে ধর্ষণের পর তার এবং তার মায়ের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার মূলহোতা বহিস্কৃত শ্রমিকলীগ নেতা তুফান সরকার কাশিমপুর কারাগারে থাকলেও থেমে নেই চাঁদাবাজ চক্রটির কর্মকান্ড। কিশোরীকে ধর্ষণ, এরপর মাসহ তার মাথা ন্যাড়া করে নির্যাতনের মতো বর্বর ঘটনায় দায়ের মামলায় গ্রেফতার বগুড়া শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক তুফান সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। তুফানের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি, জুয়ার আসর পরিচালনার অভিযোগ থাকলেও ভয়ে কেউ এ বিষয়ে থানায় অভিযোগ করার সাহস দেখাননি। তুফান সরকার কারাগারে থাকলেও তুফান বাহিনীর সদস্যরা এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তুফানের গড়ে তোলা অটোভ্যান সমিতির নামের জেলার কাহালু, দুপচাঁচিয়া, শাজাহানপুর ও নন্দীগ্রামে চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট নির্বিঘ্নেই তাদের কর্মকান্ড চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মা-মেয়েকে নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠে তুফান সরকার। এরমধ্যে এই তুফান সরকারের বিভিন্ন অপকর্ম একেক করে উঠে আসতে শুরু করে। তুফান কারাগারে, এরপর অনেকেই মুখ খুলতে শুরু করেছেন।

খোজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার নন্দীগ্রাম সদর, ধুন্দার বাজার, রনবাঘা, ওমরপুর, সিমলা বাজার, পন্ডিতপুকুর এলাকাতেও তুফান বাহীনির চাঁদাবাজ চক্রটি অটোভ্যান থেকে প্রতিদিন চাঁদা গুনছে। একইভাবে কাহালু উপজেলার মাল া, বিবিরপুকুর, মুড়ইল, বারমাইল, দুপচাঁচিয়া সদর, শাজাহানপুর উপজেলার রানীরহাট ও টেংড়ামাগুর এলাকায় এখনো সক্রিয় এই তুফান বাহীনি। তুফান কারাগারে, তবে এই অটোভ্যান চাঁদার টাকা যাচ্ছে কার পকেটে ? প্রশ্ন সচেতন মহলের।
সম্প্রতি বগুড়া-৪ আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য রেজাউল করিম তানসেন এমপি জেলার কাহালু উপজেলার বারমাইল বাজারে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সাথে মতবিনিময়কালে তুফান বাহীনির চাঁদাবাজ চক্রটির অভিযোগ তুলে ধরে সেখানকার প্রায় অর্ধশত অটোভ্যান চালক। ভ্যান চালক আজাহার, লতিফ, দুলাল সহ অনেকেই বলেন, তুফান বাহীনির চাঁদাবাজীতে আমরা অতিষ্ঠ। প্রতিদিন প্রত্যেক অটোভ্যান ১০ টাকা থেকে ২০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। বারমাইল বাজারের বিভিন্ন সড়কে তজু ও অরুন নামের দুই ব্যক্তি নিচ্ছে চাঁদার টাকা। তুফান কারাগারে থাকলেও তুফানের করে দেয়া স্থানীয় অটোভ্যান সমিতির নামে এখনো চাঁদা দিতে হয়।

এসব কথা শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে রেজাউল করিম তানসেন এমপি বলেন, অবৈধ এই চাঁদাবাজ চক্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। কাউকে কোনো টাকা দিবেন না। সন্ত্রাস-চাঁদাবাজ কোনো দলের নয়, এরা দেশের শত্রু। এদেরকে প্রতিহত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমি বিষয়টি প্রশাসনের উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবো।

উল্লেখ্য, বগুড়ায় ছাত্রীকে ধর্ষণ ও তার মাকে নির্যাতনের ঘটনায় আলোচনায় আসে তুফান-রুমকি পরিবার। মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে ওই ছাত্রীর সঙ্গে শ্রমিকলীগ নেতা তুফানের পরিচয় হয়। এসএসসিতে পাশ করলেও জিপিএ-৫ না পাওয়ায় ভালো কলেজে ভর্তি হতে পারছিলেন না ওই ছাত্রী। বিষয়টি জানার পর তুফান তাকে ভালো কলেজে ভর্তি করে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে বলে জানায়। এরপর গত ১৭ জুলাই সকালে তুফান তাকে ফোন করে। কলেজে ভর্তি সংক্রান্ত কাগজপত্রে স্বাক্ষরের জন্য শহরের চকসুত্রাপুরে তার বাড়িতে ডেকে তুফান ওই ছাত্রীকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে ধর্ষিতা ও তার মাকে ২৮ জুলাই ডেকে এনে মাথা ন্যাড়া করে দেয় তুফান সরকারের স্ত্রী, স্ত্রীর বড় বোন কাউন্সিলর রুমকিসহ অন্য সহযোগীরা। এ ঘটনা প্রকাশের পর মূলহোতা শ্রমিকলীগ নেতা তুফান সরকারসহ চার সহযোগীকে প্রথম দিনে গ্রেফতার করে তিনজনকে তিন দিনের রিমান্ডে দেন আদালত। এর পরদিন কাউন্সিলর মারজিয়া হাসান রুমকিকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়। এছাড়াও তুফানের স্ত্রী আশা, তুফানের শাশুড়ি রুমি ও শ্বশুর জামিলুর রহমান, সহযোগী জিতু, মুন্না ও নরসুন্দর জীবন রবিদাসকে দুদিনের রিমান্ড নেওয়া হয়। তুফান সরকারকে এরইমধ্যে শহর শ্রমিক লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এঘটনায় তুফানের বড় ভাই আবদুল মতিন সরকারকে শহর যুবলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক থেকে বহিষ্কার করা হয়। দ্বিতীয় দফায় তুফান ও তার সহযোগী মুন্নাকে দুদিনের এবং তুফানের স্ত্রী আশা বেগম, শাশুড়ী রুমা বেগমকে একদিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। তুফান সরকারকে তৃতীয় দফায় এবং কাউন্সিলর রুমকিকে দ্বিতীয় দফায় দুদিনের রিমান্ডে দেন আদালত। তুফানের সহযোগী মুন্না আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। এরপর ধর্ষক তুফান এবং রুমকিকে আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক শ্যাম সুন্দর রায় না মঞ্জুর করেন। সাত কার্যদিবসের মধ্যে কারাগার ফটকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন। গত ১৯ আগস্ট কারাগারে মাদক সেবনের অভিযোগে বগুড়া কারাগার থেকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

 

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/২৫-০৮-২০১৭ইং/ অর্থ

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ