ঘনিয়ে আসছে ঈদ : অস্থিরতা বাড়ছে চামড়া ব্যবসায়ীদের

অর্থনৈতিক রিপোর্ট :

কোরবানির ঈদ যতোই ঘনিয়ে আসছে, চামড়া ব্যাবসায়ীদের মধ্যে অস্থিরতা ততোই বাড়ছে। আগে এক জায়গায় বসে ব্যবসা হলেও এবারের চিত্র ভিন্ন। এ বছর কাঁচা চামড়া রাজধানীর পুরান ঢাকার পোস্তায় সংরক্ষণ করা হলেও মূল চামড়া ক্রেতারা থাকবেন সাভারের ট্যানারি পল্লীতে। কাজেই কাঁচা চামড়া বিক্রির জন্য ট্যানারি পল্লীতে যেতে হবে। আবার একইভাবে কাঁচা চামড়া কেনার জন্য সাভার থেকে ট্যানারি মালিকদেরও আসতে হবে পোস্তায়। এটিই অস্থিরতার মূল কারণ।

বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত অনেকেই। চামড়া শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত শ্রমিকদের মধ্যেও রয়েছে অস্থিরতা। কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে সাভারের ট্যনারি পল্লীর কাছাকাছি আলাদা জমি চাইলেও তাদের তা দেওয়া হয়নি। তাই শ্রমিকরা এখনও কেউ আছেন হাজারীবাগ এলাকায়, আবার কেউ সাভারে। তবে সাভারে যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা খুবই কম। কারণ হিসেবে জানা গেছে, এখনও সাভারের ট্যানারি পল্লীর কাছাকাছি শ্রমিকদের উপযোগী করে ঘরবাড়ি তৈরি হয়নি। অন্যদিকে যে ঘরবাড়ি আছে তার ভাড়া বেশি। এছাড়া সাভারের ট্যানারি পল্লীতে এখনও শতভাগ কারখানা উৎপাদনে যায়নি। আবার যে কারখানাগুলো উৎপাদনে গেছে, তারাও তাদের কারখানা পুরোপুরি চালু করেনি। এসব কারণে সমস্যার মধ্যে রয়েছে চামড়া শিল্পের শ্রমিকরা।

এর প্রেক্ষিতে কেউ কেউ মনে করছেন, হাজারীবাগ ও সাভারের মধ্যে চামড়া পরিবহনে ব্যয় বাড়বে। এতে চামড়ার তৈরি পণ্যের দামও বাড়বে। আবার এই চামড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়ার জন্য যে সময় অপচয় হবে, তাতে চামড়া নষ্টও হতে পারে। এর ফলে এ চামড়াজাত পণ্যের গুণগত মান খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব কারণেই পোস্তায় কাচাঁ চামড়া ব্যবসায়ী ও সাভারের ট্যানারি মালিক উভয়ের মধ্যেই এই অস্থিরতা বাড়ছে। উভয় স্থানের একাধিক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কুরবানির আগেই পোস্তার কাঁচা চাড়ার ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সাজাচ্ছেন তাদের ব্যবসার সবকিছু। কোরবানির সময় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা চামড়া কোথায় কিভাবে সংরক্ষণ করবে তার জন্য স্থান নির্ধারণ করছেন। হাজারীবাগে কোনও চামড়ার কারখানা না থাকলেও আছে অস্থিরতা। আছে কানাঘুসা।

অন্যদিকে সাভারের পাশে ১০ একর জমি চেয়ে না পাওয়ায় অসন্তোষ বিরাজ করছে কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে।

ব্যবসায়ীরা জানান, পোস্তায় চামড়া মজুদ করার পর সেগুলো তিন থেকে চার দিন পর ট্যানারিতে যাওয়া শুরু করবে। সরকারের আদেশ অনুযায়ী এবার সব চামড়া সাভারের ট্যানারিতে যাবে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিন জানান, এ ব্যবসায় মন্দার মধ্যেও দেশের রফতানি আয় বাড়ছে। এর প্রধান কারণ বিশ্বব্যাপী চামড়াজাত পণ্যের বাজার বেড়ে গেছে। ক্রেতারাও এখন নতুন নতুন পণ্যের অর্ডার দিচ্ছেন। সেগুলো তৈরি করতে এখন কারখানাগুলো ব্যস্ত। বিশ্বব্যাপী ফ্যাশন ধারায় এখন পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে শীতপ্রধান দেশগুলোয় কাপড়ের পরিবর্তে চামড়ার পোশাক ব্যবহার হচ্ছে। এখন মেয়েদের ফ্যাশনের জন্য নানা পোশাকেও চামড়া ব্যবহার হচ্ছে। এ কারণে চামড়ার চাহিদা বেড়ে গেছে। আগে শুধু জুতা, ব্যাগ, জ্যাকেট তৈরিতে চামড়া ব্যবহার হতো। এসব মিলে চামড়ার ভবিষ্যৎ খুবই ভালো।

পোস্তায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোরবানির পশুর লবণযুক্ত চামড়া সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত লালবাগের পোস্তার চামড়ার আড়তগুলো। আড়ত ফাঁকা করে ধোয়ামোছার কাজ শেষে দূর করা হয়েছে স্যাঁতসেঁতে ভাবও। এ ছাড়া কাঁচা চামড়ায় লবণ মেশানোর জন্য বাড়তি লবণও কিনে রাখা হয়েছে।

পোস্তায় কাঁচা চামড়ার আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানিয়েছে, আসন্ন কোরবানির ঈদে প্রায় এক কোটি পিস পশুর চামড়া সংগ্রহ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ৬০ লাখ পিস গরুর চামড়া। বাকিগুলো ছাগল, মহিষ ও ভেড়ার। এরমধ্যে কোরবানির সাত দিনের মধ্যে তারা প্রায় ৪০ লাখ চামড়া পেয়ে যান। বাকিগুলো পরে আসে। এ কারণে ঈদের দিন বিকাল থেকেই পোস্তায় চামড়ার বাজার জমজমাট হয়ে ওঠে। এছাড়া রাজধানীর সিটি কলেজের সামনে, আমিনবাজার বাসস্ট্যান্ড ও হাজারীবাগে কাঁচা চামড়ার বড় বাজার বসে। আগে চামড়া পরিশোধন করে তা হাজারীবাগের ট্যানারিতে বিক্রি করা হতো। কিন্তু এখন সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর হওয়ায় ট্যানারিতে চামড়া পৌঁছানো কষ্টসাধ্য হবে বলে মনে করছেন কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা।

মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিন বলেন, ‘সাভারে যারা কারখানা স্থানান্তর করবেন, শুধু তা­­দের জন্য নগদ সহায়তা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে ১৫ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। সাভারে যারা যাবেন, তারা আরও ৫ শতাংশ বেশি পাবেন। এই প্রণোদনার কারণে অনেকেই হয়তো দ্রুত সাভারে কারখানা স্থানান্তর করবেন। কিন্তু ওখানে গিয়ে তো উৎপাদন চালু করা যাচ্ছে না। ফলে প্রণোদনাও পাওয়া যাবে না। সরকারকে আগে সাভারের পরিবেশ ঠিক করতে হবে।’

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে মাহিন বলেন, ‘সাভারে বর্জ্য নিষ্কাশনব্যবস্থা আধুনিক করা হয়েছে। এগুলো পুরোপুরি চালু হলে দূষণের বিষয়টি থাকবে না। এছাড়া আরও একটি চামড়ানগরী স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সেটি স্থাপিত হলে সব কারখানা একই স্থানে চলে আসবে।’

এদিকে শিল্প সচিব মোহম্মদ আব্দুল্লাহ জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত সাভারের চামড়া নগরীতে ২০৫টি প্লট রেকি করা আছে। এরমধ্যে হাজারীবাগে ছিলো এমন ১৫৫টি কারখানার নামে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে ৬৯টি কারখানা পুরোপুরি চালু হয়েছে। একটি কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার গত ১৭ আগস্ট থেকে ২৪ ঘণ্টা চালু রয়েছে। কোরবানির ঈদের আগেই আরও একটিসহ মোট দু’টি বর্জ্য শোধনাগার ২৪ ঘণ্টা চালু হবে। সাভার চামড়া নগরীতে বিদ্যুতের কোনও সমস্যা নেই।’

জ্বালানী সচিবের বরাত দিয়ে তিনি জানান, সাভারের চামড়া নগরীতে স্থাপিত যেসব কারখানার মালিকরা সংযোগের জন্য আবেদন করেছেন তাদের সবাই গ্যাসের সংযোগ পেয়েছেন। সেখানে কোনও লোডশেডিং নেই বলেও জানিয়েছেন শিল্প সচিব।

মোহম্মদ আব্দুল্লাহ জানান, এটি একটি আধুনিক ট্যানারি পল্লী হবে। কিন্তু তা পুরোপুরি ঠিক হতে সমস্ত ব্যয় ঠিক রেখে ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বাড়বে।

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/২৬-আগস্ট২০১৭ইং/নোমান

Comments are closed.