বাড়ীর পাশের চন্দ্রাবতী (ভ্রমণ কাহিনী) : প্রথম পর্ব

তানজীমুল তারিফ ।। কিশোরেগঞ্জ শহরের আশেপাশের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে মহিলা কবি চন্দ্রাবতী মন্দির কিংবা বাড়ী অন্যতম এক স্থান। চন্দ্রাবতীর বাড়ী অনেক আগেই, অনেক বার দেখা হয়েছে আমার। …..তবুও ভ্রমন কাহীনি শুরু করার আগে চন্দ্রাবতী’র সর্ম্পকে কিছু জেনে নেওয়া ভাল,,


.আমার জন্ম-স্থান “কিশোরগঞ্জ” হওয়াতে; আমি ছোট বেলা থেকেই চন্দ্রাবতীর নাম শুনে আসছিলাম। তিনি একজন স্বীকৃত বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি, তবে কিছু সংখ্যক মানুষ এখনও এই নিয়ে বিরুদ্ধমত প্রদর্শন করে। তারা মনে করে, প্রথম মহিলা কবি খনা, দ্বিতীয় কবি রামী বা রজকিনী, তৃতীয় মাধবী এবং চতুর্থ কবি চন্দ্রাবতী। তার মানে,পুরো বাংলা সাহিত্যে মহিলা কবিদের ভিতর চন্দ্রাবতী চতুর্থ। কিন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতী।।


চন্দ্রাবতী পিতা “দ্বিজ বংশীদাস” একজন কবি ছিলেন। তার ছত্রছায়ার কারনেই বোধ হয় চন্দ্রাবতী কবি হওয়ার হাতে খরি শুরু করেন।


ধরেন, চন্দ্রাবতী কোন কবি না, শুধু সাধারণ একজন সুন্দরী রমণী!! জানেন, কবি না হয়েও তিনি বিখ্যাত হতেন!! কিভাবে?? যেমন-রোমিও /জুলিয়াট;,সিরিন/ফরহাদ কিংবা লাইলী/মজনু ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। ঠিক তেমনি, চন্দ্রাবতীর পাশে “জয়ানন্দ” এক কিশোরের নাম বসতো!!
এই প্রেমময়ী রমনীর বাস্তব জীবনের অথবা প্রেমের বিয়োগান্তক ঘটনা যে কোন অবাস্তব প্রেমের কাহীনি কে হার মানাতে পারে।।


মৈমনসিংহ গীতিকার’ শ্রী নয়ানচাঁদ ঘোষ রচিত ‘চন্দ্রাবতী পালা’। হচ্ছে একমাত্র চন্দ্রাবতী’র বাস্তব জীবনের করুণ ইতিহাসের দলিল। নয়ানচাঁদ ঘোষের বর্ণনা এমন ছিল,
ফুলেশ্বর নদীর তীর ঘেষা ছোট্ট পাতোয়াইর গ্রাম, সেই গ্রামে ছিল চন্দ্রাবতী নামের অপরূপ রূপসী এক বালিকা। বালিকা প্রতিদিন পুকুরের পাড়ে যেতো ফুল তুলতে, সেখানে একদিন তার সাথে দেখা হয়ে যায় জয়ানন্দ নামের এক কিশোরের। চন্দ্রাবতীর সঙ্গে বাল্যসখা জয়ানন্দের বন্ধুত্ব গভীর প্রেমে পরিণত হয়।
জয়ানন্দ নিজেও কবি ছিলেন। দ্বিজবংশী দাসের পদ্মপুরাণে চন্দ্রাবতী ও জয়ানন্দ দুইজনের কবিতাই রয়েছে। দুই পরিবারের সম্মতিতে জয়ানন্দ ও চন্দ্রাবতীর বিয়ে ঠিক হয়। কিন্তু এরই মাঝে ঘটে যায় এক নাটকীয় ঘটনা। জয়ানন্দ প্রেমে পড়ে আসমানি (মতান্তরে কমলা) নামের এক মুসলমান মেয়ের। যে রাতে চন্দ্রাবতীকে জয়ানন্দের বিয়ে করবার কথা, সেই দিনই জয়ানন্দ ধর্মত্যাগ করে আসমানিকে বিয়ে করে।
জয়ানন্দের এই হঠকারী আচরণ বিশাল এক আঘাত হয়ে আসে চন্দ্রাবতীর জন্য। অল্প বয়সের কোমল হৃদয় ভেঙে খান খান হয়ে যায় তাঁর। এই আঘাত সামলাতে শিবপূজায় নিজেকে উজাড় করে দেন তিনি। বাবার কাছে দুটো প্রার্থনা জানান। ফুলেশ্বরী নদীর তীরে একটি শিবমন্দির গড়ে দেওয়া এবং আজীবন কুমারী থাকার বাসনা। কন্যাবৎসল পিতা আদরের কন্যার দুটো আবদারই মেনে নেন।

অনুমতি দিয়া পিতা কয় কন্যার স্থানে
শিব পূজা কর আর লেখ রামায়ণে।

কিছুকাল পরে মোহ কেটে গেলে অনুতপ্ত জয়ানন্দ পুনরায় ফিরে আসে চন্দ্রাবতীর কাছে। তখন চরাচরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। মন্দিরের দ্বার রুদ্ধ করে চন্দ্রাবতী সন্ধ্যা আরতি এবং শিবের পূজায় মগ্ন। রুদ্ধদ্বারের বাইরে দাঁড়িয়ে জয়ানন্দ বারবার চন্দ্রাবতীকে নাম ধরে ডেকেও সাড়া পায় না। এই নীরবতাকে চন্দ্রাবতীর প্রত্যাখ্যানের ভাষা মনে করে ব্যর্থমনোরথ জয়ানন্দ লাল রঙের সন্ধ্যামালতি ফুল দিয়ে মন্দিরের দরোজায় ৪ ছত্রের একটি পদ লিখে সে স্থান ত্যাগ করে –

শৈশবকালের সঙ্গী তুমি যৌবনকালের সাথী
অপরাধ ক্ষমা কর তুমি চন্দ্রাবতী
পাপিষ্ঠ জানিয়ো মোরে না হইল সম্মত।
বিদায় মাগি চন্দ্রাবতী জনমের মতো।

পূজা শেষে মন্দিরের দরোজা খুলে চন্দ্রাবতী লেখাটি দেখতে পান। মন্দির অপবিত্র হয়েছে ভেবে মন্দির গাত্রে উৎকীর্ণ সে লেখা মুছে ফেলার জন্য তিনি নদীর ঘাটে জল আনতে গিয়ে দেখেন নদীর জলে ভাসছে জয়ানন্দের মৃতদেহ। এই ভয়াবহ শোকে পাথর হয়ে যান চন্দ্রাবতী।

আঁখিতে পলক নাহি মুখে নাই সে বাণী।
পাড়েতে খাড়াইয়া দেখে উমেদা কামিনী।।

চন্দ্রাবতীর কাহিনী এখানেই শেষ। জনশ্রুতি আছে ওই সময় তিনি রামায়ন লিখছিলেন। এই কষ্টের কারণে চন্দ্রাবতী আর কিছুই লিখতে পারেন নি। যে কারণে রামায়ন অসমাপ্ত থেকে যায়। নদীর ঘাটে মৃত অবস্থায় জলে জয়ানন্দের লাশ ভাসতে দেখে তীব্র অনুশোচনায় চন্দ্রাবতীও পরবর্তীতে ফুলেশ্বরী নদীর জলে ঝাঁপিয়ে জয়ানন্দের অনুগামী হন। উইকিপিডিয়াতেও এই বিষয়টিই লেখা আছে!!


ইতিহাস-কে এখানে সমাপ্ত দিয়ে, পাঠক আসেন ভ্রমন কাহীনিতে–আমি মোট ছয়-সাতবার চন্দ্রাবতী বাড়ীতে ঘুরতে গেয়েছি। বেশীর ভাগই মোটর- বাইক চেপে গিয়েছি।। আপনারা চাইলে ইজি-বাইকেও যেতে পারবেন! কিভাবে খুব সহজ  কিশোরগঞ্জ শহরের শহীদি মসজিদের সামনে থেকে নীলগঞ্জ ইউনিয়ন এবং তাড়াইল থানার উদ্দেশ্যে কিছুক্ষণ পরপরই ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ছুটে যায়। দরদাম করে উঠে পড়ুন। জালালপুর বাজারে আটো-বাইক থেকে নেমে, চা-বিস্কুট খেয়ে হাঁটা ধরবেন। সুজা যেতে যেতে দেখবেন একটা সাইন্ বোর্ড….. (চলবে)

 

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/ ২৭-০৮-২০১৭ইং/ অর্থ

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ