চলে গেলেন বরেন্য কণ্ঠশিল্পী বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার

আকিব হৃদয়, স্টাফ রিপোর্টার ।। দীর্ঘদিন ধরে কিডনি, হৃৎপিন্ড, প্রস্টেটসহ বিভিন্ন জটিলতায় ভুগেছেন আবদুল জব্বার। এ কারণে গত ৩১ মে থেকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। গঠন করা হয়েছিল চিকিৎসা সহায়তা কমিটি।
গত শনিবার রাতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার রাত থেকেই লাইফ সাপোর্টে ছিলেন আবদুল জব্বার। তাঁর খাওয়া-দাওয়া বন্ধ ছিল।
হাসপাতালের কিডনি রোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘তাঁর কোনো কিডনিই কাজ করছিল না। কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। পরিবার সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করায় শিল্পীর অবস্থার অবনতি হয়। এ পরিস্থিতিতে আমরা বোর্ড গঠন করে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিই।
অবশেষে আজ চিরবিদায় নিলেন।’ ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘ওরে নীল দরিয়া’, ‘তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়’ এমন অসংখ্য কালজয়ি গান গেয়েছেন তিনি। আব্দুল জব্বার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হারমোনিয়াম নিয়ে কলকাতার বিভিন্ন ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের গান গেয়ে উদ্বুদ্ধ করেন। সেই দুঃসময়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গেয়েছেন অসংখ্য গান। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে শিল্পীর গাওয়া গান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা ও মনোবল বাড়িয়েছে। একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া শিল্পী আবদুল জব্বার মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে কলকাতার পথে-প্রান্তরে সংগীত পরিবেশন করে যুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন। ওই সময়ে তিনি প্রায় ১২ লাখ টাকা সংগ্রহ করে মুজিবনগর সরকারের ত্রাণ তহবিলে দান করেন।
শিল্পী আবদুল জব্বারের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গভীর শোক প্রকাশ করে শোক-সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
আব্দুল জব্বার ১৯৩৮ সালের ৭ নভেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমান বাংলাদেশ) কুষ্টিয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫৮ সাল থেকে তৎকালীন পাকিস্তান বেতারে গান গাওয়া শুরু করেন। তিনি ১৯৬২ সালে প্রথম চলচ্চিত্রের জন্য গান করেন। ১৯৬৪ সাল থেকে তিনি বিটিভির নিয়মিত গায়ক হিসেবে পরিচিতি পান। ১৯৬৪ সালে জহির রায়হান পরিচালিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম রঙ্গিন চলচ্চিত্র ‘সংগম’র গানে কণ্ঠ দেন। ১৯৬৮ সালে ‘এতটুকু আশা’ ছবিতে সত্য সাহার সুরে তার গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছ কভু’ গানটি জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৬৮ সালে ‘পীচ ঢালা পথ’ ছবিতে রবীন ঘোষের সুরে ‘পীচ ঢালা এই পথটারে ভালবেসেছি’ এবং ‘ঢেউয়ের পর ঢেউ’ ছবিতে রাজা হোসেন খানের সুরে ‘সুচরিতা যেওনাকো আর কিছুক্ষণ থাকো’ গানে কণ্ঠ দেন। ১৯৭৮ সালে ‘সারেং বৌ’ চলচ্চিত্রে আলম খানের সুরে ‘ও..রে নীল দরিয়া’ গানটি দর্শকপ্রিয়তা পায়। তার প্রথম মৌলিক গানের অ্যালবাম ‘কোথায় আমার নীল দরিয়া’ ২০১৭ সালে মুক্তি পায়। তার গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ ও ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ – গান তিনটি ২০০৬ সালের মার্চ মাস জুড়ে অনুষ্ঠিত বিবিসি বাংলার শ্রোতাদের বিচারে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।
এছাড়া তিনি বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত দুটি সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক (১৯৮০) ও স্বাধীনতা পুরস্কারে (১৯৯৬) ভূষিত হন।

 

 

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/৩০-০৮-২০১৭ইং/ অর্থ

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ