আমিই রোহিঙ্গা

নূরুল জান্নাত মান্না ।। আমার ছয় ছেলের মধ্যে তিন জনকে একসঙ্গে ধরে নিয়ে গেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। আবুইয়া নামের এক নাতিকে চোখের সামনে গলাকেটে হত্যা করেছে তারা। এতে আমি দিশেহারা হয়ে পড়ি। কোনও উপায় না দেখে এক নাতির সহায়তায় এইখানে (নো-ম্যানস ল্যান্ডে) আসি। আশির দশকে মিয়ানমার জান্তা সরকারের অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন দেখেছি। নব্বই দশকের বর্বরতাও দেখেছি। কিন্তু এবারের মতো এত ভয়াবহ বর্বরতা আগে কখনও দেখিনি। গত বেশ কয়েকদিন ধরে রাখাইন রাজ্যে যেভাবে সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে, এতে মনে হয় রাখাইন রাজ্য মরুভূমিতে পরিণত হবে।’ হাউমাউ করে কান্না জড়িত কণ্ঠে একথাগুলো বলেছেন মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে জলপাইতলীর নো-ম্যানস ল্যান্ডে থাকা ৭০ বছর বয়সী রশিদ আহমদ।

আরেকদিকে ঢেঁকিবনিয়ার মিয়ারপাড়া গ্রামের একটি ফোরকানিয়া মাদরাসায় শিক্ষক জুনায়েদ আহমদকে আটক করে গত সোমবার তার সামনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় মাদরাসাটি । অসহায় রোহিঙ্গা নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে জীবন নিয়ে কৌশলে পালিয়ে ধামনখালী সীমান্ত দিয়ে আসেন বাংলাদেশে । এটি বাংলাদেশের সীমান্তে আশ্রয় নেয়া হাজার হাজার রোহিঙ্গার জীবনের করুণ গল্প। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, এখনো চলছে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে সেনাবাহিনীর তান্ডব। প্রতিদিন জ্বলছে আগুন, ফাটছে বোমা, ঝরছে রক্ত, পোকামাকড়ের মতো মরছে মানুষ। যাকে যেভাবে পাচ্ছে হত্যা করা হচ্ছে নির্মমভাবে। চলছে গণধর্ষণ। হেলিকপ্টার থেকে শত শত রাউন্ড মর্টার ও গুলি বর্ষণও করা হচ্ছে। নিহতদের শোকে বাকরুদ্ধ আত্মীয়স্বজন। চারদিকে কান্নার শব্দ। স্বজনের লাশ পেছনে ফেলে রুদ্ধশ্বাসে পালাচ্ছে মানুষ। আবার পালাতে চেষ্টা করা হলে পিছন থেকে করা হচ্ছে গুলি। যারা গোলাগুলির শিকার হচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগই নারী ও মায়ের কোলের শিশু। মায়ের কোল থেকে শিশু ছুড়ে ফেলা হচ্ছে জ্বলন্ত আগুনে। পদদলিত করে দুই দিনের শিশু খুন করতে কুণ্ঠাবোধ করছে না তারা। এইসব রোহিঙ্গার বেঁচে থাকার স্বপ্ন দিন দিন ফুরিয়ে আসছে। নির্বিচারে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, নারীধর্ষণ, লুন্ঠনের শিকার হয়ে জীবন বাঁচাতে সহায় সম্পত্তি ফেলে মাথা গোজার ঠাঁই খুঁজছে সহায়হীন অসহায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী।

মজলুম রোহিঙ্গাদের বীভৎস চেহারাগুলো দেখে কার চোখ না অশ্রুসিক্ত হবে? আপনার সামনে আপনার ভাই-বোন, মা-বাপ, ছেলেমেয়েদের যদি আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে, শরীরের ওপর কামান তুলে মাথার মগজ বের করে ফেলে, চোখের সামনে তাজাদেহ দ্বিখন্ডিত করে ফেলে তখন আপনার কেমন লাগবে? আহ! বার্মার মুসলমানদের সাথে তাই করা হচ্ছে! জাতিসংঘ রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে বিশ্বের সবচেয়ে বর্বর নির্যাতনের শিকার জনগোষ্ঠী হিসেবে অভিহিত করেছে।

তপ্ত খুনে রঞ্জিত বিশ্ব মানচিত্রে এক ভূখণ্ডের নাম মিয়ানমার। যার বুকে বইছে মজলুম মুসলমানদের রক্ত স্রোত, অসভ্য ও বর্বর বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা রোহিঙ্গা মুসলমানদের গর্দান থেকে শিরশ্চেদ করে উল্লাস করেছে। অবাক পৃথিবী তাকিয়ে রয়, আজ আমরা লজ্জিত, আমরা নির্বাক, কিছুই করতে পারলাম না তোমাদের জন্য। ক্ষমা কর আমাদের মিয়ানমারের মুসলমান। আমি বাকরুদ্ধ এক মুসলিম আমার ভাইয়ের পোড়া লাশ, আমার বোনের ইজ্জত, ছোট শিশুর আর্তনাত দেখে মনে হয় বিশ্বে প্রায় ‘দু’শ কোটি মুসলমানদের দরকার নেই। প্রয়োজন শুধু একজন বীর সেনাপতির। যে মরক্কোর মরুভূমি থেকে ছুটে আসবে ইউসুফ বিন তাসকীনের মতো, বড় প্রয়োজন তারিক বিন যিয়াদের, খালিদ বিন ওয়ালিদের মতো একজন লড়াকু সৈনিকের।
হে পরওয়ার দেগার! রক্তাক্ত আফগান, ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, আরাকান, মিয়ানমারের মুসলমানদের জন্য তুমি পাঠিয়ে দাও সুলতান সালাহ উদ্দিন আইউবীর মতো একজন মরণজয়ী মুজাহিদ।

তথ্যসূত্র : ইন্টারনেট

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ