ঐতিহ্যের কোরবাণী : আমিনুল হক সাদী

প্রতি বছরের ন্যায় এবারও পবিত্র ঈদ উল আযহা এসেছে শ্রাবণদের ঘরে। কিন্ত এবারে বণ্যা কবলিত হওয়ায় বিস্তীর্ণ হাওরের ফসল তলিয়ে গেছে আগে ভাগেই তাদের। খেয়ে না খেয়ে কোন মতে চলছে শ্রাবনদের জীবন সংসার। বর্ষাকাল মানেইতো চোখের পানিতে ভেজানো চোখ। সারা বছরেই যাদের জীবনে বেয়ে চলে শ্রাবণের বারিধারা। তাদের কাছে বর্ষা যেন খেলনার বস্তুর মতো। তাই তো পানিতে দুরন্ত কিশোর শ্রাবণ ছুটে বেড়ায়। এ মাঠ ও মাঠ চষে বেড়ায়। পানিই জীবন, পানিই যেন মরণ তাদের। তবুও নশ্বর দুনিয়ায় বেঁচে থাকার সংগ্রামে নিরন্তর পথ চলে। ঈদ আসলেও তার কাছে ঈদানন্দ মনে হয় না। যদি কোরবাণী দেওয়া যায় নিজেকে ত্যাগ করা যায় অন্যদের মুখে একটু হাসি ফুটানো যায় তাই নিয়ে সে থাকে বিভোর। এ বিভোরের সময়ে তার বাবা নুর মিয়া ছেলেকে কাছে ডেকে নিয়ে বলল, বাবা ইদানিং তোকে এত চিন্তিত লাগছে কেন? না বাবা কিছু না। বাহিরে বৃষ্টি পড়ছে। দুয়েক ফোটা তার গায়েও এসে আছড়ে পড়ল। নড়েচড়ে ওঠে নুর মিয়া বলল,বাবা আমাদের জীবন পানির মতো কেন? কেন আমরা ভেসে বেড়াই পানিতে? ঝুঁকি নিয়ে চলি অথৈই থৈ থৈ জলরাশিতে। নিজের ভেতরে যে পানি আছে তা কেউ দেখে না, দেখে শুধু আমাদের চোখের সামনে বহমান সমুদ্র, নদী, খাল, বিল, ঝিল আর হাওর বাওড়কেই। হ বাবা কি আর কইয়াম। দু:খে যাদের জীবন গড়া দু:খ তাদের কিসে। তোর মনে কিসের এত কষ্ট। বাবা আমার কোন কষ্ট নেই। কষ্ট একটাই আমাদের জীবন আকাশে কেন চাঁদ দেখা যায়নি। চাঁদের নিজস্ব কোন আলো নেই বলে কি আমাদের এই অবস্থা। হ বাবা ক্ষনস্থায়ী দুনিয়ায় ক্ষনিকের পুর্ণিমার চাঁদ দেখে কি লাভ। তারচে মানুষের মুখে হাসি ফোটাও, দেখবে গ্রাম দেশ জাতি আলোকিত হবে তুমার কর্মের আলোর স্বর্শে। আচ্ছা বাবা আমার বন্ধু শাওনের বাবাকে দেখেছি কোরবানীর জন্য বিশাল বড় গরু কিনেছে। আমাদের গরু কবে কিনবা? ছোট্্রবেলায় তো দেখতাম আমাদের বাড়ির ওঠোনে বড় বড় গরু বাঁধা থাকতো। এখন কি সেই গরু নেই বাবা। নুর মিয়ার বুকে যেন একটি তীর বিদ্দ হল।

ছেলের প্রশ্নে নিজেরে কাছে আজ বড় অসহায় ও বেসামাল লাগছে। কোরবানীর ঈদ আসলেই নুর মিয়ার বাবা চাচারা সবার আগে গরু কিনে নিয়ে আসতো। বাড়ির সামনের পুকুর ঘাটে বাঁধা থাকতো সেই গরুগুলো । দলবেধে মানুষেরা দেখতে যেত ওই গরুগুলোকে। নুর মিয়ার শশুড় নায়েব আলীও তাই করতো। তার প্রিয় নাতী শ্রাবনের মুখে হাসি দেখতে বাজারের সবচে বড় গরুগুলো কিনে নিয়ে আসতো প্রতিযোগিতা করে। একটি মাত্র নাতীর জন্য নানার কত ভালবাসা ছিল। বড় হয়ে সে যেন মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখে তাই স্বশিক্ষা দিতো। বলতো আজকের শিশুরা একদিন বড় হবে। তারা মুরব্বীদের কাছ থেকে দেখে দেখে শিখবে কিভাবে দু:খীদের মুখে হাসি ফুটাতে হয়। নায়েব আলী নিজের পরিবারের জন্য কোরবানী দিলেও অতিরিক্ত আরও বেশ কিছু গরু কিনে হতদরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিত। কোরবাণীর গোস্ত তৈরীর সময়ে সেই আদরের নাতী বাড়ির সামনের পুকুর ঘাটে থাকা আসনটিতে গিয়ে বসতো। নানার কোলে গিয়ে বসে থাকতো সেই ছেলেটিও। কিন্ত গেল কত বছর হয়ে গেল শশুড় ভাই চাচা ও বাবাকে হারিয়েছে নুর মিয়া। তাই আগের মতো করে এ টানাপোড়নের সংসারে কোরবানী দিতে সাহস পায় না। যে করেই হোক কোরবাণী ঈদে সে চেষ্টা করে অন্তত হত দরিদ্রদের জন্য হলেও কোরবানী দিতে। তাই অভাব অনটনের সময়েও সে সংসারের হাল ছাড়েনি। বাপ দাদার ও শশুড়ের সুনামকে আগলে রাখতে দূঢ় মনোবল আটে, সাহস বেড়ে যায় কোরবানী দিবেই,দিতেই হবে তাকে।
চিন্তামগ্ন নুর মিয়াকে দেখে ছেলে শ্রাবন বলল, বাবা তুমি কি চিন্তা করছো? না বাবা তেমন কিছু না। তোর নানার কথা স্মরণে আসছিল তো।
বাবা নানাকে তুমি খুব ভালবাসতে, তাই না। তাই তুমি এতক্ষণ চিন্তিত ছিলে? না বাবা না, তোর নানাকে কত অযতা কষ্ট দিয়েছি মনের অজান্তেই। সে গুলো স্মরণে আসছে তো তাই..।
আচ্ছা বাবা নানার নামে হলেও কোরবাবানীটা দেও। নুর মিয়া ছেলের কথা শুনে চোখে পানি এসে গেল। হ বাবা আমি আজকেই বাজারে যাবো। যেভাবেই হোক কোরবাণীর জন্য গরু কিনে আনবোই। নুর মিয়া শত কষ্টে থেকে হলেও অবশেষে কোরবাণীর গরুটা কিনে নিয়ে আসল বাড়িতে। যদিও অন্য বছর একা কোরবানী দিত সে। এটাই নুর মিয়ার প্রথম শরীক কোরবানী।
নুর মিয়া পবিত্র ঈদ উল আযহার দিনে নামাজে যাওয়ার যাওয়ার প্রস্ততি নেয়। আজ তার মনের অজান্তেই ভিড় ভিড় করে বলে ওঠে অন্তত তাঁর পুর্ব পুরুষের রেখে যাওয়া রেওয়াজ ও পরিবারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারছে বলে সে আজ খুব খুশি। সম্পদের দরকার নাই ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছি সেটাই বড় বাবা। নুর মিয়ার সাথে সাথে শ্রাবণও খুশি হয়ে চোখের পানি মুছে ফেলে। আনন্দ্রঅশ্রু নিয়ে বাড়ির পাশেই পুর্ব পুরুষদের দেওয়া জমিতে ঈদগাহ মাঠের দিকে এগিয়ে যায় পরিবারের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার বোরবাণীটা মহান আল্লাহকে উৎস্বর্গ করতে….।

 

আমিনুল হক সাদী : গল্পকার,লেখক ও সাংবাদিক

 

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম/০১-০৮-২০১৭ইং/ অর্থ

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ