অস্ট্রেলিয়ার ঝাঁজ ঠিকই টের পেল টিম বাংলাদেশ

চট্টগ্রাম : নাসির হোসেনের হাওয়ায় ভাসানো বল মিড উইকেটের ওপর দিয়ে সীমানার বাইরে পাঠালেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। শরীরের পুরো জোর দিয়ে বলটি বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে যেন সব রাগ, জেদ ঝারলেন অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান!

ওই ছয়ে বাংলাদেশের দেওয়া ৮৬ রানের লক্ষ্যটা সহজেই ছুঁয়ে ফেলল অস্ট্রেলিয়া। সাগরিকার পড়ন্ত বিকেলের মিষ্টি রোদের সঙ্গে ম্যাক্সওয়েল ও হ্যান্ডসকম্বের মুখের সরল হাসিতে বোঝা গেল, এ টেস্ট জিততে কতটা তেঁতে ছিল অস্ট্রেলিয়া।

রাগ, জেদ কেন ঝারবেন না ম্যাক্সওয়েল? ঢাকা টেস্ট হারের পর কম কথা তো শোনেননি! ইয়ান চ্যাপেল থেকে শুরু করে অনেক কিংবদন্তি ওয়ার্নার-স্মিথদের ধুয়ে দিয়েছিলেন। পাত্তা দেয়নি বাংলাদেশও। চট্টগ্রাম টেস্ট শুরুর আগে হাসিমুখে মুশফিক তো সরাসরি বলে দিয়েছিলেন, ‘চাপে আছে অস্ট্রেলিয়া।’ মুখ বুঝে ‘অপমান’ ও সমালোচনা সহ্য করা ছাড়া কিছুই করার ছিল না স্টিভেন স্মিথের দলের। অবশেষে চট্টগ্রাম টেস্ট জয়ে সমালোচকদের মুখ বন্ধ করলেন ম্যাক্সওয়েল-লায়নরা। বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রতিশোধটা দারুণভাবে নিয়েছে অসিরা।

গত অক্টোবরে চট্টগ্রামের সাগরিকায় ইংল্যান্ডকে হারানোর খুব কাছে গিয়েও হতাশা নিয়ে ফিরেছিল বাংলাদেশ। হারের যন্ত্রণা বাংলাদেশ ভুলে যায় ঢাকা টেস্ট জয়ে। এবার পরিবেশ, পরিস্থিতি সব কিছুই ভিন্ন। সেবার চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা গিয়েছিল আক্ষেপ নিয়ে। এবার ঢাকা থেকে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে চট্টগ্রামে এসেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মমতা, এবারও জয় পায়নি বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঢাকা টেস্ট জয়ের আত্মবিশ্বাস কোনো কাজে আসেনি!

৭ উইকেটের জয়ে রকেট বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজে ১-১ সমতায় শেষ করল সফরকারীরা। এক দিন হাতে রেখেই অস্ট্রেলিয়ার জয়ে দুই দলের পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। চট্টগ্রামে আজ চতুর্থ দিনে যেকানো কিছুই হতে পারত। হতে পারত দিনটি বাংলাদেশের কিংবা আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী হতে পারত বৃষ্টিও। কিন্তু স্বাগতিকদের পক্ষে কিছুই আসল না।

নাথান লায়ন ও স্টিভ ও’কিফ ৭২ রানের লিড নিয়ে বৃহস্পতিবার দিনের খেলা শুরু করেছিলেন। ১১ বল খেললেও লিড বাড়াতে পারেনি সফরকারীরা। আট মিনিটে শেষ হয় তাদের ইনিংস। মুস্তাফিজুর রহমান নাথান লায়নকে আউট করে ৩৭৭ রানে অস্ট্রেলিয়াকে আটকে দেন।

পিছিয়ে থেকে ব্যাটিংয়ে নেমে নাথান লায়নের ঘূর্ণিতে লণ্ডভণ্ড বাংলাদেশ। তবে শুরুটা পেসার প্যাট কামিন্সকে দিয়ে। কামিন্সকে দারুণ এক কাভার ড্রাইভ করে সৌম্যর পথচলা শুরু। কিন্তু বরাবরের মতো মাঝপথে গিয়ে পথ হারান বাঁহাতি ওপেনার। কামিন্সের শরীরের ওপরের বল খোঁচা মেরে প্রথম স্লিপে রেনশর হাতে ক্যাচ দেন ৯ রান করা সৌম্য।

বিপদে পড়া বাংলাদেশকে টেনে তোলার দায়িত্ব ছিল তামিম ইকবালের ওপর। কিন্তু ঘরের মাঠে দেশসেরা ওপেনার ব্যর্থ! কামিন্সের বলে এগিয়ে এসে মারতে গিয়ে স্টাম্পড হন মাত্র ১২ রানে। আউট হওয়ার আগে লায়নকে একই শটে একটি বাউন্ডারি মেরেছিলেন, একটি ডট খেলেছিলেন। তামিমের আগ্রাসন বুঝতে পেরে লায়ন একই বল বারবার করতে থাকেন। তাতে সফলতা পেয়ে যান দ্রুত। শুধু তামিমকে না, ইমরুলকেও একই বলে সাজঘরে ফেরত পাঠান লায়ন। পার্থক্য তামিম এগিয়ে এসেছিলেন, ইমরুল ব্যাকফুটে গিয়ে বল পাঞ্চ করেন এক্সট্রা কাভারে। ম্যাক্সওয়েল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সহজ ক্যাচ ধরে অস্ট্রেলিয়ার উদযাপনকে দ্বিগুণ করেন।

ইমরুলের আউটে মাঠে উপস্থিত দর্শক খুব খুশি হয়েছিল। কারণ ইমরুলের আউটে মাঠে আসেন ‘বাংলার জান’ সাকিব আল হাসান। লায়ন ঢাকা টেস্টের ফর্ম নিয়ে চট্টগ্রামে এলেও সাকিব পারেননি। অফ স্টাম্পের বাইরের বলে সাকিব ‘কাঁচা’ তা জেনেই দুই স্লিপ, শর্ট লেগ নিয়ে বোলিংয়ে লায়ন। ঠিকই নিজের পরিকল্পনায় সফল এই অফ স্পিনার। একটু টেনে দেওয়া বলে ফরোয়ার্ড ডিফেন্স করতে গিয়ে দ্বিতীয় স্লিপে ওয়ার্নারের হাতে ক্যাচ দেন সাকিব। ২ রানেই শেষ সাকিবের ইনিংস। বিপদে পড়া বাংলাদেশকে চাপে ফেলেন স্টিভ ও’কিফ। চারে পাঠানো নাসির বরাবরের মতো নিজের দুর্বল বলেই আউট। বাঁহাতি স্পিনারের বল ব্যাকফুটে খেলতে গিয়ে স্লিপে ক্যাচ দেন নাসির। প্রথম ইনিংসে উইকেটশূন্য থাকা ও’কিফের দ্বিতীয় ইনিংসে প্রথম সাফল্য। নাসির আউট হওয়ার সময় বাংলাদেশের রান ৫ উইকেটে ৪৩। দ্বিতীয় ইনিংসে তখনো বাংলাদেশ ২৯ রানে পিছিয়ে।

মধ্যাহ্ন বিরতির আগে আর কোনো উইকেট হারায়নি বাংলাদেশ। সাব্বির রহমান ও মুশফিকের ব্যাটে রক্ষা বাংলাদেশের। তাদের ষষ্ঠ উইকেটের প্রতিরোধে অস্ট্রেলিয়ার লিড অতিক্রম করার পর টার্গেট বাড়াতে শুরু করে বাংলাদেশ। কিন্তু বেশিক্ষণ টেকেনি তাদের জুটি। ৫৯ বলে ২৪ রান করা সাব্বির ডাউন দ্য উইকেটে এসে খেলতে গিয়ে বল মিস করেন। ম্যাথু ওয়েড কঠিন স্টাম্পিংকে সহজ বানিয়ে সাব্বিরকে সাজঘরে ফেরত পাঠান।

সপ্তম উইকেট জুটিতে মুশফিক-মুমিনুল ৩৩ রান যোগ করেন। স্পিনারদের বেশ সাচ্ছন্দ্যে খেললেও একমাত্র পেসারকে খেলতে কষ্ট হচ্ছিল মুশফিকের। কামিন্সের অফ স্টাম্পের বাইরের বাউন্সারে খোঁচা মারতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন ৩১ রান করা মুশফিক। ২ রানের জন্য চট্টগ্রামের এ মাঠে হাজার রান পূর্ণ হয়নি টাইগার দলপতির। এরপর মুমিনুল হক এবং তাইজুলকে ফিরিয়ে সিরিজে ২২তম উইকেটের স্বাদ নেন লায়ন। বাংলাদেশ শিবিরে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন ও’কিফ। মুস্তাফিজকে বোল্ড করেন বাঁহাতি স্পিনার। ততক্ষণে বাংলাদেশের লিড মাত্র ৮৫ রান। প্রথম ইনিংসে ৭ উইকেটের পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ উইকেট নেন স্পিনার লায়ন।

চতুর্থ দিনে জয় পেতে ২১ ওভার ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেত অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু ১৫.৩ ওভারেই জয় নিশ্চিত করে তারা। এজন্য ৩ উইকেট হারাতে হয় অস্ট্রেলিয়াকে। প্রথম ইনিংসের পর দ্বিতীয় ইনিংসেও ওয়ার্নারের উইকেট নেন মুস্তাফিজ। বাঁহাতি পেসারের বাউন্সারে ৮ রানে সৌম্যর হাতে ক্যাচ দেন ওয়ার্নার। এরপর তাইজুল ইসলাম সাজঘরে ফেরত পাঠান স্মিথকে। প্রথম ইনিংসেও অসি অধিনায়কের উইকেট নিয়েছিলেন তাইজুল। সাকিব প্রথম ইনিংসে নিয়েছিলেন ১ উইকেট। দ্বিতীয় ইনিংসে ম্যাট রেনশর উইকেট নিয়ে সিরিজে ১২তম উইকেটের স্বাদ নেন সাকিব।  ম্যাক্সওয়েল ২৫ ও হ্যান্ডসকম্ব ১৬ রানে অপরাজিত থেকে জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়েন।

১৩ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা নির্বাচিত হন নাথান লায়ন। সিরিজসেরা ডেভিড ওয়ার্নার ও নাথান লায়ন। লায়ন উইকেট নিয়েছেন ২২টি, দুই সেঞ্চুরিতে ওয়ার্নারের রান ২৭১।

আত্মবিশ্বাস নিয়ে চট্টগ্রামে যাত্রা শুরু করলেও শেষটা হলো বিষাদময়। অস্ট্রেলিয়ার ঝাঁজ ঠিকই টের পেল টিম বাংলাদেশ।

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ