কুলিয়ারচর প্রেসক্লাবের সহ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ সহ দুর্নীতির অভিযোগ

মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি ।। কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ সহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

জানা যায়, ১৯৭৮ সালের দিকে এলাকার গন্যমান্য ব্যাক্তিদের সহযোগীতায় স্থানীয় সাংবাদিকদের নিয়ে কুলিয়ারচর প্রেসক্লাব ঘঠিত হয়। প্রেসক্লাব গঠিত হওয়ার পর প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মোঃ জিল্লুর রহমান,সাধারন সম্পাদক বাবু সন্তোস চন্দ্র দাস ও সাংবাদিক মরহুম মোঃ সাহাব উদ্দিনের নেতৃত্বে স্থানীয় সংবাদিকদের নিয়ে অত্যান্ত দক্ষতা ও সুনামের সহিত ক্লাবটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

স্থানীয় সাংবাদিকগন সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে বসে স্থানীয় সংবাদ পরিবেশনের জন্য ১৯৮৩ সালে দি ময়মনসিং মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি লিঃ এর পক্ষ থেকে বাবু যোগেন্দ্র চন্দ্র বর্মণ ও বাবু মনমোহন চৌধুরী যৌথ ভাবে প্রেস ক্লাবের নামে কুলিয়ারচর বাজারস্থ কিছু সম্পত্তি দান করে দেন। প্রেসক্লাবের কর্মতৎপরতা দেখে স্থানীয় সাংবাদিকদের সুযোগ সুবিধার কথা বিবেচনা করে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর কুলিয়ারচর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র ইমতিয়াজ বিন মুছা জিসানের পিতা কুলিয়ারচর গ্রুপের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মোঃ মুছা মিয়া সিআইপি প্রথমে তাঁর নিজ উদ্যোগে ২ শতাংশ ভূমির উপর সরকারি ভাবে ৭ কক্ষ বিশিষ্ট একটি পাকা ভবন নির্মান করে দেন। এর দু’বছর পর তিনি নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৩ লক্ষ টাকা ব্যায়ে ওই ভবনের উপর আরো একটি দ্বিতল ভবন নির্মান করে দেন যাতে সাংবাদিকগন সুন্দর পরিবেশে এলাকার সমস্যা, সম্ভাবনা, উন্নয়ন, অপরাধ ও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে কাজ করতে পারে এবং প্রেসক্লাব ভবনের নিচ তলার দোকান ঘরগুলো ভাড়া দিয়ে সংগঠনের প্রয়োজনীয় নুন্ন্যতম খরচ মেটাতে পারে। এছাড়া ক্লাবের কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মোঃ ছিদ্দিক মিয়া প্রেসক্লাবে প্রায় ১ লক্ষ টাকার ফার্নিসার দিয়ে সহযোগীতা করেন, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল মিল্লাত পরিষদের নিজস্ব তহবিল থেকে একটি ষ্ট্যান্ড ফ্যান ও ক্লাবঘর সংস্কারের জন্য এডিপি বরাদ্ধ থেকে ১ লক্ষ টাকা প্রদান করেন, বিশিষ্ট শিল্পপতি মোঃ রফিকুল ইসলম ও এম এ তুহিন নগদ ২০ হাজার টাকা সহ একটি কম্পিউটার প্রদান করেন। প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠাকালীন সময় কমিটি গঠনের মাধ্যমে কার্যনির্বাহী কমিটি দীর্ঘদিন সুনামেনর সহিত ক্লাবটি পরিচালনা করেন। এর পর বিগত প্রায় ২০ বছর ধরে প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি মোঃ রফিক উদ্দিন প্রথমে মরহুম মোঃ সাহাব উদ্দিন ও পরে মোঃ জাহিদুল ইসলাম সোহাগকে নিয়ে অনুনোমোদিত অবৈধ গঠনতন্ত্রের দোহায় দিয়ে পদাধিকার বলে ৩ বছর অন্তর অন্তর প্রতিবার নির্বাচন ব্যতীত কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসককে সভাপতি করে প্রথমে মোঃ সাহাব উদ্দিনকে সাধারণ সম্পাদক, সাহাব উদ্দিন মৃত্যুর পর মোঃ জাহিদুল ইসলাম সোহাগকে সাধারণ সম্পাদক করে নাম মাত্র ৪-৫ জন সাংবাদিকে নিয়ে অবৈধ ভাবে পকেট কমিটি গঠন করে প্রেসক্লাব পরিচালনা করেন। তারা ৪-৫ জন ছাড়া বিগত দিনে স্থানীয় কোন সাংবাদিককে প্রেসক্লাবের সদস্য করেননি। কোন সাংবাদিক যদি সদস্য হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে তাহলে সহ-সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে আর কাউকে সদস্য না করে কাল ক্ষ্যেপন করে যান তারা । এরই সুযোগে তারা প্রেসক্লাবের সম্পদ প্রেসক্লাব ভবনের নিচ তলার দোকান ঘর গুলো নিজেদের নামে ভাগা ভাগি করে নামমাত্র মূল্যে লিজ নেন তারা । দোকান ঘরের দাতাও তারা গ্রহীতাও তারা নিজেরাই। এভাবেই সু-কৌশলে সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মিলে প্রেসক্লাবের লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ কয়েক বছর এভাবে অতিবাহিত হওয়ার পর সম্প্রতি চাপের মুখে তারা স্থানীয় কয়েকজন জাতীয় দৈনিক পত্রিকার ও টিভি চ্যানেলের সাংবাদিককে অত্র প্রেসক্লাবের সদস্য হিসেবে নিতে বাধ্যহন। এর পরই আগষ্ট মাসের প্রথম দিকে প্রেসক্লাবে রহস্য জনক চুরির ঘটনা ঘটে। চুরির ঘটনার পর থেকে প্রেসক্লাবের বিভিন্ন অনিয়মের নানান তথ্য বের হয়ে আসে।

প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মোঃ জিল্লুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, প্রেসক্লাবের সহ সভাপতি ও সাধারন স¤পাদকের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির কারনে প্রেসক্লাব থেকে তিনি পদত্যাগ করেন । তিনি আরোও বলেন, প্রেসক্লাব থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর ওই প্রেসক্লাবে জাতীয় ও সাংস্কৃতিক কোন অনুষ্টান হয়নি। এমনকি প্রেসক্লাবের ভিতর এলাকার গন্যমান্য ব্যাক্তিদের পদচারনও দেখা যায়নি। পদাধিকার বলে প্রেসক্লাবে কোন আইনে জেলা প্রসাশককে সভাপতি নির্বাচিত করে আসছে তা আমার বোধগাম্য নয়।

মানবাধিকার কমিশন কুলিয়ারচর শাখার সভাপতি সৈয়দ আবুল কালাম বলেন, প্রেসক্লবের সহ সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক প্রেসক্লাবের লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাত সহ বিভিন্ন দুর্নীতির ফলে প্রেসক্লাব ধ্বংসের দিকে পতিত হচ্ছে।

প্রেসক্লাবের দপ্তর সম্পাদক মোঃ নাঈমুজ্জামান নাঈম অভিযোগ করে বলেন, প্রেসক্লাবের নীচতলার দোকান ঘর ভাড়াটিয়া হাসি ইলেক্ট্রনিক্স এর সত্ত্বাধিকারী বিনয় রঞ্জন দাস (পিন্টু)র নিকট থেকে ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা জামানত নিয়ে ৪ হাজার টাকা মাসিক ভাড়া নির্ধারন করে প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ২ টি দোকান ঘর ভাড়া দেন। অপর দিকে কণিকা মটরস এর সত্ত্বাধিকারী নূর হোসেন ছোটনের নিকট থেকে ১ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা জামানত নিয়ে ৩ হাজার টাকা মাসিক ভাড়া নির্ধারণ করে একই ভাবে প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ১টি দোকান ঘর ভাড়া দেন। কিন্তু প্রেসক্লাবের অন্যান্য সদস্যদের নিকট এসব তথ্য গোপন রেখে তারা প্রেসক্লাবের আয়ের খাতায় শুধু ১ লক্ষ টাকা জামানত উল্লেখ সহ প্রতিমাসে ৩ দোকান থেকে মাসিক ৪ হাজার ২৫০টাকা উত্তোলন দেখিয়ে খাতায় জমা দেখান । বাকি ১ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা ও প্রতি মাসে ২ হাজার ৭৫০ টাকা করে প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যৌথ ভাবে মিলে অবৈধ কাগজপত্র করে আত্মসাত করে আসছে এবং ভাড়ার বাকি টাকা সহ জামানতের টাকা কমিটির রেজুলেশন ছাড়া খরচ দেখিয়েছেন তারা। এছাড়াও তারা সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন অনুদানের টাকা সঠিক ভাবে কাজ না করে খরচ করেছে। তিনি আরো বলেন, প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক আমার শিক্ষক হওয়ায় এত দিন যাবৎ তাদের এসব দুর্নীতি নিরবে সহ্য করে এসেছি। দপ্তর সম্পাদক হওয়ার পর আজ পর্যন্ত আমাকে প্রেসক্লাবের ফাইল ও খাতাপত্র দেখতে দেননি তাঁরা।

অপর দিকে প্রেসক্লাবের কোষাধক্ষ্য মোহাম্মদ হারুন চৌধুরী বলেন, আমি কোষাধক্ষ্য হওয়ার পর এপর্যন্ত আমাকে কোন হিসাব নিকাশ বুঝিয়ে দেননি তারা।

সাংস্কৃতিক সম্পাদক আহম্মেদ ফারুক বলেন, প্রেসক্লাবের টাকা পয়সার হিসাব নিকাশ জানতে চাইলে সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে তালবাহানা করে আজ নয় কাল করতে করতে মাসের পর মাস পার করে দিচ্ছে এবং প্রেসক্লাবের চাবি তাঁদের হাতে থাকায় আমারা আমাদের প্রয়োজনে প্রেসক্লাবে প্রবেশ করতে পারছিনা।

দোকানঘর ভাড়ার ব্যপারে প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি মোঃ রফিক উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কণিকা মটরস এর সত্ত্বাধিকারী নূর হোসেন ছোটনের নিকট থেকে ১ লক্ষ টাকা জামানত নেওয়া হয়েছে এবং ৩ দোকান ঘর থেকে মাসে ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা মাসিক ভাড়া উত্তোলনকরা হয়।

প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাাদক মোঃ জাহিদুল ইসলাম সোহাগের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কণিকা মটরস এর সত্ত্বাধিকারী নূর হোসেন ছোটনের নিকট থেকে ১ লক্ষ টাকা জামানত নেওয়া হয়েছে এবং প্রতি মাসে ছোটনের নিকট থেকে তিনি ২ হাজার ২৫০ টাকা ভাড়া উত্তোলন করেন। এছাড়া তিনি আরও বলেন, জামানতের ১ লক্ষ টাকা তারা প্রেসক্লাবের উন্নয়ন কাজে খরচ করেছেন।

ভাড়াটিয়া বিনয় রঞ্জন দাস পিন্টু দপ্তর সম্পাদক নাঈমুজ্জামান নাঈমের অভিযোগের সাথে তাল মিলিয়ে বলেন, তিনি প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি ও সধারন সম্পদকের নিকট ১লক্ষ ১০ হাজার টাকা জামানত দিয়ে ৪ হাজার টাকা মাসিক ভাড়া চুক্তিতে ২টি দোকান ঘর ভাড়া নেন।

ভাড়াটিয়া নূর হোসেন ছোটন বলেন, প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি ও সধারন সম্পদকের নিকট ১লক্ষ ১৫ হাজার টাকা জামানত দিয়ে ৩ হাজার টাকা মাসিক ভাড়া চুক্তিতে ১টি দোকান ঘর ভাড়া নিয়েছেন তিনি।

দৈনিক বর্তমান পত্রিকার কুলিয়ারচর প্রতিনিধি আ.ম. আরীফুল হক, দৈনিক প্রজন্ম ডটকম অনলাইন পত্রিকার ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি মোঃ মাইন উদ্দিন ও সাপ্তাহিক সময়ের অপরাধ চক্র পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার জামিল খান সহ একাধিক সাংবাদিক অভিযোগ করে বলেন, তারা প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়ার জন্য একাধিক বার আবেদন করেও সদস্য হতে পারছেন না। তারা আরও বলেন, প্রেসক্লাবে সংখ্যাগড়িষ্টতা নিয়ে অন্য কেউ সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়ে সহ-সভাপতি রফিক উদ্দিন ও সাধারন সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম সোহাগের পদ ছিনিয়ে নিতে পারে এমন ভয়ে আমাদের সহ অন্যান্যদের সদস্য করছেন না তারা। সুশীল সমাজ ও স্থানীয় সাংবাদিকগন অভিযুক্তদের পদত্যাগ সহ বৈধ্য গঠনতন্ত্র করে প্রেসক্লাবে আরো নতুন সদস্য ও সহযোগী সদস্য অর্ন্তভূক্তি করে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন কমিটি গঠনের দাবী জানন।

প্রেসক্লাব বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ড.উর্মি বিনতে সালামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

 

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/০৯-০৯-২০১৭ইং/ অর্থ

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ