জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ জরুরি

আন্তর্জাতিক রিপোর্ট : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অপরাধ ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সম্ভাব্য সকল হস্তক্ষেপ জরুরি। যাতে করে নিরীহ বেসামরিক মানুষের ওপর নির্বিচারে সামরিক হামলা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়। একইসঙ্গে অসহায় রোহিঙ্গাদের যেন নিজ দেশ ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যেতে এবং রাষ্ট্রহীন মানুষে পরিণত হতে না হয়। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১২ জন নোবেল বিজয়ী ও বিশ্বের ১৮ জন খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি এ আহ্বান জানিয়েছেন। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নিউইয়র্ক সময় গতকাল বুধবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকের আগে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এক খোলা চিঠিতে এ আহ্বান জানান। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানকে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন জাতিগত নির্মূল অভিযান বলে বর্ণনা করেছে। এরপরই জাতিসংঘের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই পরিষদের বৈঠক হয়েছে।
নিরাপত্তা পরিষদের উদ্দেশে লেখা চিঠিতে স্বাক্ষরকারী ১২ নোবেল জয়ী হলেন : প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস, মেইরিড মাগুইর, বেটি উইলিয়াম্স, আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু, অসকার আরিয়াস সানচেজ, জোডি উইলিয়াম্স, শিরিন এবাদি, লেইমাহ বোয়ি, তাওয়াক্কল কারমান, মালালা ইউসুফজাই, চিকিত্সা শাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার জয়ী স্যার রিচার্ড জে. রবার্টস ও এলিজাবেথ ব্ল্যাকবার্ন। এছাড়া সই করা ১৮ বিশিষ্ট ব্যক্তি হলেন : মালয়েশিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ হামিদ আলবার, ইতালির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমা বোনিনো, ব্যবসায়ী নেতা ও সমাজসেবী স্যার রিচার্ড ব্র্যানসন, নরওয়ের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গ্রো হারলেম ব্রান্ডটল্যান্ড, উদ্যোক্তা ও সমাজসেবী মো. ইব্রাহীম, মানবাধিকার কর্মী কেরি কেনেডি, লিবীয় নারী অধিকার প্রবক্তা ও এসডিজি সমর্থক আলা মুরাবিত, ব্যবসায়ী নেতা নারায়ণ মূর্তি, থাইল্যান্ডের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাসিত পিরোমিয়া, আসিয়ানের সাবেক মহাসচিব সুরিন পিটসুয়ান, ব্যবসায়ী নেতা ও এসডিজি সমর্থক পল পোলম্যান, আয়ারল্যান্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যারি রবিনসন, জাতিসংঘ সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশান্স নেটওয়ার্কের পরিচালক জেফরে ডি. সাচ, অভিনেতা ও এসডিজি সমর্থক ফরেস্ট হুইটেকার, অভিনেত্রী ও মানবাধিকার কর্মী শাবানা আজমি, কবি ও সংগীত রচয়িতা জাভেদ আখতার, মানবাধিকার কর্মী আসমা জাহাঙ্গীর এবং ব্যবসায়ী নেতা ও সমাজসেবী জোকেন জাইট্জ।
চিঠিতে নিরাপত্তা পরিষদের উদ্দেশ্যে তারা বলেন, রোহিঙ্গা সংকট পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক আহ্বান করার জন্য প্রথমে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনাদের এই মুহূর্তের দৃঢ়সংকল্প ও সাহসী সিদ্ধান্তের ওপর মানব ইতিহাসের ভবিষ্যত্ গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এই ক্রমাগত সহিংসতা বন্ধ করতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কর্মপন্থায় সাহসী পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি। মিয়ানমার সরকারকে জানিয়ে দেওয়া দরকার যে, সে দেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও অর্থায়ন রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমার সরকারের নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক পরিবর্তনের উপর নির্ভরশীল। অপপ্রচার, ঘৃণা ও সহিংসতার উস্কানি বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র পরিচালিত সহিংসতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে, বৈষম্যমূলক বিভিন্ন নীতি ও আইন বাতিল করতে হবে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবিক সমস্যা সমাধানে তার ভূমিকা পালন করেছে- বিশ্ববাসী এটা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে শত শত রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। বহু গ্রাম সম্পূর্ণ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, বেসামরিক মানুষকে নির্বিচারে আটক করা হচ্ছে এবং শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে। সহিংসতার মাত্রা বৃদ্ধি পেলে গত বছরের শেষদিকে আমরা কয়েকজন নোবেল লরিয়েট ও বিশ্বের বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ এ বিষয়ে জরুরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে আপনাদের নিকট অনুরোধ জানিয়েছিলাম। আপনাদের হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। নিরীহ নাগরিকদের উপর অত্যাচার বন্ধ এবং রাখাইন এলাকায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবার জন্য আমরা  আপনাদের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে মিয়ানমার সরকার ২০১৬ সালে যে ‘রাখাইন অ্যাডভাইজরি কমিশন’ গঠন করেছিল তার সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে মিয়ানমার সরকারকে উদ্বুদ্ধ করতে আপনারা যেন জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন- সেজন্য আমরা আবারো আপনাদের অনুরোধ জানাচ্ছি। কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করছি। এগুলো হলো: আনান কমিশনের সদস্যদের নিয়ে অবিলম্বে একটি ‘বাস্তবায়ন কমিটি’ গঠন করা যার কাজ হবে কমিশনের সুপারিশগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন তত্ত্বাবধান করা। দেশটি থেকে শরণার্থীর প্রবাহ বন্ধে অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদেরকে নিয়মিতভাবে পীড়িত এলাকাগুলো পরিদর্শন করতে আমন্ত্রণ জানানো। যেসব শরণার্থী ইতোমধ্যে দেশ ত্যাগ করেছে তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করা। ফিরে যাওয়া শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য জাতিসংঘের অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে মিয়ানমারে ট্রানজিট ক্যাম্প স্থাপন। বাস্তবায়ন কমিটির কর্তৃত্বে আনান কমিশনের প্রতিবেদনের সুপারিশ মোতাবেক রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান এবং তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অবাধে চলাফেরার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/সেপ্টেম্বর২০১৭ইং/নোমান

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ