গর্ভবতীর ওপর কি সত্যি চন্দ্রগ্রহণের প্রভাব পড়ে?

যুবায়ের আহমাদ ।। আব্দুর রহমান। পেশায় নির্মাণ শ্রমিক। সদ্যবিবাহিত ২৫ বছর বয়সী যুবকটি কাজের ফাঁকে নাশতা করার জন্য একটি দোকানে এলেন। একট টুকরা কেক আর একটি কলা খাবেন। একটি জোড়া কলা নিতে গেলে পাশে বসা একজন বৃদ্ধ বলে উঠলেন, ‘না! জোড়া কলা খাবেন না। খেলে যমজ সন্তান হবে।’ ‘জোড়া কলা খেলে যমজ সন্তান হবে’ এমন অনেক বিশ্বাস সমাজে প্রচলিত। এগুলোর একটি হলো চন্দ্র বা সূর্য গ্রহাণের সময় গর্ববতী মা যদি কিছ কাটাকাটি করেন তাহলে গর্ভস্থ সন্তান কানকাটা বা ঠোঁটকাটা অবস্থায় জন্ম নেয়। আসলে কোরআন ও হাদিসে এ ধারণের বিশ্বাসের অস্তিত্ব কতটুকু?

প্রতিনিয়ত মহান আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্বের জানান দিতে থাকা সৃষ্টিগুলোর বড় দুটি হলো সূর্য ও চন্দ্র। চাঁদের আলোর উৎস হলো সূর্য। ১৩ লক্ষ ৯৪ হাজার কিলোমিটার ব্যাসের এ নক্ষত্রটির সঙ্গে পৃথিবী ও জীবজগতের সম্পর্ক সুনিবিড়। সূর্যের তাপে মহান আল্লাহ সতেজ আর সজীব রেখেছেন পৃথিবীর সবকিছু। উদ্ভিদ এই সূর্যালোক থেকে খাদ্য গ্রহণ করে। যদি পৃথিবীতে সূর্যের সূর্যের তাপ ও আলো না আসত তাহলে বিপন্ন হতো প্রাণীকূলের জীবন। পুরো পৃথিবী পরিণত হতো একখন্ড বরফে। অন্যদিকে সূর্য যদি তার ভেতরকার সব তাপ পৃথিবীর ওপর উগড়ে দিন তাহলেও পৃথিবী পরিণত হতো শ্মশানে। পবিত্র কোরআনে গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে সূর্য ও চন্দ্র প্রসঙ্গ। আমরা বাংলায় সূর্যালোক অথবা চন্দ্রালোক বলি। ইংরেজিতে বলি ঝঁহ খরমযঃ এবং গড়ড়হ খরমযঃ। কিন্তু পবিত্র কোরআনুল কারিমে এরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই সত্বা যিনি সূর্যকে কিরণোজ্জল এবং চাঁদকে স্নিগ্ধ আলোয় আলোকিত করেছেন’। (সুরা ইউনূস : ৫) অন্যত্র এরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি সৃষ্টি করেছি একটি প্রজ্বলিত বাতি’ (সুরা নাবা : ১৩)। সূর্যের আলোচনায় কোরআনুল কারিম সব জায়গাতেই ‘প্রজ্বলিত বাতি’, ‘তেজোদীপ্ত’, ‘উজ্জল জ্যোতি’, ‘চমক/ঝলক’, ‘শিখা’ বলেছে। যার অর্থ সূর্য নিজে দহনক্রিয়ার মাধ্যমে প্রচন্ড তাপ ও আলো উৎপন্ন করে; পক্ষান্তরে চাঁদের আলোচনায় বলেছে ‘স্নিগ্ধ আলো’। বিজ্ঞানও গবেষণা করে ঠিক তাই বলেছে।

বিজ্ঞান বলছে, সূর্য তার কেন্দ্রভাগে নিউক্লীয় সংযোজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডে ৬২ কোটি মেট্রিক টন হাইড্রোজেন পুড়িয়ে হিলিয়াম উৎপাদন করে। সূর্যপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৫৭৭৮ কেলভিন বা ৫৫০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ বিজ্ঞানের বক্তব্যেও সূর্যই তাপশক্তির ও আলোর প্রধান উৎস। পক্ষান্তরে চাঁদের ব্যাপারে বিজ্ঞানের বক্তব্য হলো, চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই। সূর্যের প্রতিফলিত আলোই তার সম্বল। পবিত্র কোরআনুল কারিম আরো স্পষ্ট করে বলছে, ‘আল্লাহ চাঁদকে স্থাপন করেছেন আলোরূপে আর সূর্যকে স্থাপন করেছেন প্রদীপরূপে’। (সুরা নূহ: ১৬)। চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণ হলো আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নির্ধারিত একটি প্রক্রিয়া। চাঁদ যখন পরিভ্রমণ অবস্থায় কিছুক্ষণের জন্য পৃথিবীর ও সূর্যের মাঝখানে এসে পড়ে তখন পৃথিবীর কোনো দর্শকের কাছে কিছু সময়েরে জন্য সূর্য আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যায়।

এটাই সূর্যগ্রহণ (ঝড়ষধৎ বপষরঢ়ংব) বা কুসুফ। আর পৃথিবী যখন তার পরিভ্রমণ অবস্থায় চাঁদ ও সূর্যের মাঝখানে এসে পড়ে তখনই পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে চাঁদ কিছুক্ষণের জন্য অদৃশ্য হয়ে যায়। এটাই চন্দ্রগ্রহণ (খঁহধৎ বপষরঢ়ংব) বা খুসুফ। সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক কুসংস্কার আছে। ওই সময় খেতে নেই, তৈরি করা খাবার ফেলে দিতে হবে, গর্ভবতী মায়েরা এ সময় যা করেন, তার প্রভাব সন্তানের ওপর পড়ে, চন্দ্র বা সূর্য গ্রহণের সময় যদি গর্ভবতী মহিলা কিছু কাটাকাটি করেন, তাহলে গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতি হয় এ-সবই মারাত্মক ভূল বিশ্বাস। ইসলামী শরিয়াহ ও বাস্তবতার সঙ্গে এগুলোর কোনো মিল নেই। জাহেলি যুগেও এ ধরণের কিছু ধারণা ছিল। সেকালে মানুষ ধারণা করত যে, চন্দ্রগ্রহণ কিংবা সূর্যগ্রহণ হলে অচিরেই দুর্যোগ বা দুর্ভিক্ষ হবে। চন্দ্র বা সূর্য গ্রহণ পৃথিবীতে কোনো মহাপুরুষের জন্ম বা মৃত্যুর বার্তাও বহন করে বলে তারা মনে করত। বিশ্ব মানবতার পরম বন্ধু, মহান সংস্কারক, প্রিয়নবী মুহাম্মাদ (সা.) সেগুলোকে ভ্রান্ত ধারণা হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করেছেন। মুগিরা ইবনু শুবা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এর পুত্র ইবরাহিমের ইন্তিকালের দিনটিতেই সূর্যগ্রহণ হলে আমরা বলাবলি করছিলাম যে, নবীপুত্রের মৃত্যুর কারণেই সূর্যগ্রহণ হয়েছে।

এসব কথা শুনে নবীজি (সা.) বললেন, ‘সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহ তাআলার অগণিত নিদর্শনসমূহের দুটি। কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণ হয় না।’ (সহিহ বুখারি : ১০৪৩) চন্দ্র/সূর্য গ্রহণকে আল্লাহ তাআলার কুদরত হিসেবে অভিহিত করে অন্য হদিসে নবীজি (সা.) সাহাবিদের চন্দ্র/সূর্য গ্রহণের নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো লোকের মৃত্যুর কারণে কখনো সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। তবে তা আল্লাহ তাআলার নিদর্শনসমূহের দুটি। তোমরা সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ হতে দেখলে নামাজে দাঁড়িয়ে যাবে। (সহিহ বুখারি : ৯৮৪) নবীজি (সা.) এর হাদিসগুলো থেকে এটিই প্রতিয়মান হয় যে চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণের কোনো প্রভাব সৃষ্টির ওপর পড়ে না। সমাজে প্রচলিত বিশ্বাসগুলো নিছকই কুসংস্কার।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি এর নেতিবাচক কোনো প্রভাব সৃষ্টির ওপর না-ই পড়বে তাহলে কেন নবীজি (সা.) এ সময়ে নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহ তাআলার সাহায্য চাইতে বলেছেন? শুধু নামাজে দাঁড়াতেই বলেননি বরং চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণে তিনি কিয়ামতের মহাপ্রলয়ের আশংকাও করেছেন। হজরত আবু মুসা (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) এর সময়ে সূর্যগ্রহণ হলে তিনি এ আশংকায় দাঁড়ালেন যে কিয়ামতের মহাপ্রলয় বুঝি সয়ঘটি হবে। তিনি (তাড়াতাড়ি) মসজিদে এলেন। অত্যন্ত দীর্ঘ কিয়াম, দীর্ঘ রুকু ও সিজদাসহ নামাজ আদায় করলেন। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি নবীজিকে (সা.) এমন করতে আগে আর দেখিনি। অতপর তিনি বললেন, ‘আল্লাহর প্রেরিত এসব নিদর্শন কারো মুত্যু বা জন্মের (ক্ষতি করার) জন্য হয় না। যখন তোমরা তা দেখবে তখনই আতংকিত হৃদয়ে আল্লাহ তাআলার জিকির ও ইসতিগফারে মশগুল হও।’ (সহিহ মুসলিম : ১৯৮৯) অন্য হাদিসে চন্দ্র/সূর্য গ্রহণকে আল্লাহর পক্ষ থেকে ভীতি প্রদর্শন হিসেবে উল্লেখ করে তা থেকে দ্রুত উদ্ধারে সদকা করার কথা বলেছেন। নবীজির (সা.) তার উম্মতকে চন্দ্র/সূর্য গ্রহণে আতংকিত হয়ে তা থেকে উদ্ধারে নামাজের নির্দেশ দিয়েছেন।

আধুনিক বিজ্ঞানও বলছে যে সত্যি চন্দ্র বা সুর্যগ্রহণ পৃথিবীর জন্য আতংকের বিষয়। সৌরজগতে মঙ্গল ও বৃহস্পতির কক্ষপথের মধ্যবলয়ে এস্টিরয়েড (অংঃবৎড়রফ), মিটিওরাইট (গবঃবড়ৎরঃব) ও উল্কাপি- প্রভৃতি পাথরের এক সুবিশাল বেল্ট আছে বলে বিজ্ঞানীরা ১৮০১ সালে আবিষ্কার করেন। এ বেল্টে ঝুলন্ত এক একটা পাথরের ব্যাস ১২০ মাইল থেকে ৪৫০ মাইল। গ্রহানুপুঞ্জের এ পাথর খ-গুলো পরস্পর সংঘর্ষের ফলে অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথরখ- প্রতিনিয়ত পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে। কিন্তু সেগুলো বায়ুম-লে এসে জ্বলে ভস্ম হয়ে যায়। কিন্তু গ্রহানুপুঞ্জের বৃহদাকারের পাথরগুলো যদি পৃথিবীতে আঘাত করে তাহলে ভয়াবহ হুমকির সম্মখীন হবে পৃথিবী।

বিজ্ঞানীরা বলেন, সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণের সময় সূর্য, চন্দ্র ও পৃথিবী একই সমান্তরালে, একই অক্ষ বরাবর থাকে বলে এ সময়ই গ্রহানুপুঞ্জের ঝুলন্ত বড় পাথরগুলো পৃথিবীতে আঘাত হানার আশংকা বেশি। বৃহদাকারের পাথর পৃথিবীর দিকে ছুটে আসলে পৃথিবীর বায়ুম-লের পক্ষে তা প্রতিহত করা অসম্ভব। ধ্বংসই হবে পৃথিবীর পরিণতি। তাই তো মহাবিজ্ঞানী আল্লাহ তাআলা তার প্রিয়তম হাবিব (সা.) এ সময় আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়েছেন। আমাদের উচিত কুসংস্কারগুলো পরিহার করে সুন্নত অনুযায়ী চন্দ্র বা সুর্যগ্রহণের সময় নামাজের মাধ্যমে আল্লাহ কাছে এর থেকে নিরাপত্তা চাওয়া।

লেখক : জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ক্বারী, ডেইলি সান ও কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন বাংলা ও ইংরেজি দৈনিকের নিয়মিত কলামিস্ট।

 

 

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/সেপ্টেম্বর২০১৭ইং/নোমান

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ