৫০০ বছরের ইতিহাসের স্মারক কটিয়াদীর ঢাকঢোল ও বাঁশির হাট

মোঃ ছিদ্দিক মিয়া, কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি।। ২৬শে সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসব।আর এ পূজাকে ঘিরে সারা দেশের মধ্যে ব্যতিক্রম একটি আয়োজন হল কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদীর ঢাকঢোলের হাট।ঐতিহ্যবাহী এ হাটের বয়স ৫০০ বছর।

দুর্গাপূজা উপলক্ষে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলা সদরের পুরাতন বাজার প্রেসক্লাব ও মুক্তিযোদ্ধা অফিসের সামনে প্রতি বছরের মতো এবারও বসেছে দেশের সর্ব বৃহৎ ঢাক ঢোলের হাট।ঐতিহ্যবাহী এই হাটটি এবার পুজার পূর্বে রবিবার ও সোমবার এ দু’দিনের জন্য বসেছে। চলবে পূজা শুরু হওয়ার দিন পযর্ন্ত এ হাট।এখান থেকে পূজামণ্ডপে জন্য ঢাকঢোল, বাঁশিসহ বাদ্যযন্ত্রীদের ভাড়া করা হয়।জনশ্রুতি রয়েছে, ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে স্থানীয় সামস্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ইসর্বপ্রথম তাঁর রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন।কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলা সদরথেকে দুই কিলোমিটার উত্তরে চারিপাড়া গ্রামে ছিল রাজার প্রাসাদ।

আজও রাজার আমলেখন করা কোটামন দিঘিটির মনোরম দৃশ্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। পূজা উপলে রাজপ্রাসাদ থেকে সুদূর বিক্রমপুর (মুন্সিগঞ্জ) পরগনার বিভিন্ন স্থানে বার্তা পাঠানো হয়। ঢাকঢোল-বাঁশিসহ বাদ্যযন্ত্রীদের আগমনের জন্য সে সময় নৌপথ ব্যবহার করা হতো। বাদ্যযন্ত্রীরা কটিয়াদী-মঠখোলা সড়কের পাশে পুরোনো ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে যাত্রাঘাট নামের স্থানে পূজার দুই দিন আগে এসে পৌঁছাতেন। পরবর্তী সময়ে পার্শ্ববর্তী মসুয়া গ্রামে বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষহরিকিশোর রায় চৌধুরীর বাড়িতে মহা ধূমধামে পূজা শুরু হয়। সেই সঙ্গে চলে বিভিন্নপূজায় বাদ্যযন্ত্রের প্রতিযোগিতা। দিন দিন পূজার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন জমিদারের মধ্যে ঢাকের হাটের স্থান নির্ধারণ নিয়ে দ্বন্ধ শুরু হয়। অবশেষে যাত্রাঘাট থেকে স্থান পরিবর্তিত হয়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরবর্তী আড়িয়াল খাঁ নদের তীরবর্তী কটিয়াদী পুরোনো বাজারে উপজেলা প্রেসকাবের কাছে বিরাট ঢাকের হাট গড়ে ওঠে।বৃহত্তর ময়মনসিংহ টাঙ্গাইল, সিলেট, ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ,হবিগঞ্জ সহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক দুর্গাপূজার আয়োজক এই হাট থেকে পূজার দু-এক দিন আগে ভাড়ায় বায়না দিয়ে বাদ্যযন্ত্রীদের নিয়ে যায়।

আজও বিক্রমপুর ভাটি অঞ্চল, সুনামগঞ্জ, কুমিল্লা হাওর অঞ্চল থেকে শত শত বাদ্যযন্ত্রী এ হাটে আসেন। ঢাকঢোল, সানাই, বিভিন্ন ধরনের বাঁশি, কাঁসিসহ হাজারহাজার বাদ্যযন্ত্রের পসরা বসে। নাচসহ বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে বাদ্যযন্ত্রীরা গ্রাহকদের আকৃষ্ট করে থাকে। সাধারণত একটি ঢাক ১০ হাজার, ঢোল পাঁচ হাজার, বাঁশিপ্রকারভেদে চার হাজার থেকে ছয় হাজার, ব্যান্ডপার্টি ছোট ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার এবং বড় ৬০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত এখানে ভাড়া হয়। বাদ্যযন্ত্রীরা পূজামন্ডপে বাজনা বাজিয়ে দর্শক ও ভক্তদের আকৃষ্ট করে থাকেন।বাংলাদেশের আর কোথাও এ ধরনের বাদ্যযন্ত্রের হাট নেই।

উল্লেখ্য, ঢাকিদের সুবিধার্থে গত ১১ই সেপ্টেম্বর কটিয়াদী পুরাতন বাজারে ঐতিহ্যবাহী ঢাক-ঢোলের হাটের শেড নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।রবিবার সকালে কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. সোহরাব উদ্দিন এমপি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।শেড নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে ঐতিহ্যবাহী এই হাটটি একটি স্থায়ী ঠিকানা পাবে এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা ঢাকীদের দুর্ভোগ লাঘব হবে। কটিয়াদী পৌর মেয়র শওকত উসমান (শুক্কুর আলী) জানান, ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট ও কটিয়াদী দশমী ঘাট কয়েক শতাব্দীর ঐতিহ্য। প্রতিবছরই কটিয়াদী পৌরসভা এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকে।

উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহাব আইন উদ্দিন বলেন, ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকেরহাট কটিয়াদী উপজেলার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।উপজেলা প্রশাসন আগত বাদ্যযন্ত্রীদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের জাতীয় সাংসদ এ্যাডভোকেট সোহরাব উদ্দিন বলেন, এ ঐতিহ্য আমাদের গর্ব। তিনি কটিয়াদীতে দুর্গাপূজার বিসর্জনের জন্য একটি স্থায়ী দশমীঘাট নির্মাণে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

এ ব্যাপারে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানান। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রতিবছর পূজার আগে আগত বাদ্যযন্ত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নেই। ফলে নানা সমস্যায় ভোগতে হয়। এ ছাড়া কটিয়াদীতে সব দুর্গাপ্রতিমা একত্রে একটি নির্দিষ্ট স্থানে আরতি দিয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়। কিন্তু এর জন্য কোনো নিজস্ব ভূমি নেই। কটিয়াদী ডিগ্রি কলেজ মাঠে বিসর্জন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/২৪সেপ্টেম্বর২০১৭ইং/নোমান

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ