ভাওয়ালের ‘মৃত’রাজা রমেন্দ্রনারায়নের সন্ন্যাসী হওয়ার কাহিনী রূপকথাকেও হার মানায়

মোঃ মাইন উদ্দিন ।।  রূপকথার অনেক কাহিনি শুনে আমরা বিমোহিত হই। সে সব রূপকথাকেও হার মানায় গাজীপুরের জয়দেপুরের ভাওয়ালের ‘মৃত’রাজার সন্ন্যাসী হিসাবে আর্বিভাব হওয়ার সেই জমজমাট কাহিনি। মৃত্যুর বার বছর পর হাজির হয়ে জমিদারির অংশ ও নিজের স্বীকৃতির দাবি তুললে পরিস্থিতি কী হতে পারে, তা ভাওয়ালের সন্ন্যাসী রাজার  কাহিনি না শুনলে অনুমান করাটাও একেবারে অসম্ভব।

মৃত রাজা দৃশ্যপটে হাজির হতেই শুরুহয় রাজত্ব দখল করে বসা সুবিধাভোগীদের চক্রান্ত। তারা রাজাকেই অস্বীকার করে বসে। অন্যদিকে রাজাও নিজের পরিচয়ের সত্যতা প্রমাণে প্রাণান্ত চেষ্টা চালান। এই জটিলপরিস্থিতিতে রাজার স্ত্রী বিভাবতীর
ভূমিকা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে।শুরুহয় প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। রাজপরিবার শুধুনয়, রাষ্ট্রযন্ত্র ও সাধারণ মানুষ (প্রজা) দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পডে়। ভাওয়াল পরগনার রাজা ভাওয়ালের মেজরাজকুমার রমেন্দ্রনারায়ন কে ঘিরে যে
চাঞ্চল্যকর মামলা দীর্ঘদিন ধরে চলছিল তা ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মামলা নামে পরিচিত।

যার শুরু হয়েছিল ১৯৩০ সালে এবং শেষ হয়েছিল ১৯৪৬ সালে। ১৬ বছর যাবত এ মামলার ফলাফল জানার জন্য সারা দেশের মানুষ শেষ দিন পর্যন্ত উদগ্রীব ছিল। এই মামলার নায়ক ছিলেন ভাওয়াল পরগনার জমিদার বংশের মেজকুমার রমেন্দ্রনারায়ন রায়। তিনি যখন ১৯০৯ সালে দার্জিলিং এ ছিলেন তখন তিনি মারা জান বলে গুজব ছরিয়ে ছিল তাকে ঘিরেই এই মামলা। দীর্ঘ ১২ বছর পর একজন সাধু পরিচয়ে তিনি যখন ঢাকা এলেন, পরে ১৯২১ সালের ৪ মে তিনি নিজেকে কুমার রমেন্দ্রনারায়ন বলে ঘোষণা করলেন, সেই থেকে শুরু হল চাঞ্চল্যকর কাহিনী।

ভাওয়াল রাজবংশের ইতিহাসঃ
প্রাচীন ঐতিহ্য সম্পন্ন পূর্ববঙ্গের ভাওয়াল পরগনার বিস্ত্রিতি ছিল ময়মনসিংহ ও ঢাকা জেলার দুটি অঞ্চল জুরে। ভাওয়ালে বহু প্রাচীন মন্দির, প্রাসাদ, গড়, সরোবর ও মূর্তির ভগ্নাবশেষ আছে। ভাওয়াল রাজবংশীয় ইতিহাস একটি সুদীর্ঘ ও অবছিন্ন ধারাবাহিক ঘটনা। সুদুর অতীতে এই ভাওয়াল অঞ্চল যে সেন বংশীয় রাজাদের অধিকারভুক্ত ছিল সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। সেন বংশ এদেশে পুরব্বং সহ ভারতীয় বেশ কিছু এলাকা নিয়ে রাজত্ব করত এবং এই রাজত্ব কাল প্রায় ১২০ বছর ছিল। খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতাব্দী তে পূর্ববঙ্গ মুসলমানদের অধিকারে আসে। তাদের কতৃত্ব ছিল পূর্বে ব্রহ্মপুত্র, উত্তরে আড়িয়াল খাঁ ও দক্ষিন-পশ্চিম এ শিতলক্ষ্যা নদী পর্যন্ত। ভাওয়াল পরগনাও তাদের অধিকারে চলে আসে। এই পূর্ব বঙ্গ পূর্বে সেন বংশীয় মধু সেন ও অনুজ মাধবের অধিকার ভুক্ত ছিল এবং সেন বংশের পতনের পরেও সেনবংশিয় সেনাপতি প্রতাপ রায় ও প্রসন্ন রায় কিছুদিনের জন্য রাজবাড়ীতে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এদের পতনের পর ভাওয়ালের বারভূঁইয়াদের অন্যতম ফজল গাজীর অধিনে আসে। তারা কালীগঞ্জ ও মাধবপুরে বাস করেন। তিনি মাধবপুর কে গাজীবাড়ি নামে পরিবর্তন করেন।
ফজল গাজীর পর দৌলত গাজী ভাওয়ালের অধিপতি হন ও তার সময়েই নানা কারনে সম্পত্তি নিলাম হয়ে যায়।
রাজ্যের সীমা নিয়ে ঢাকার নবাব্দের সঙ্গে বিরোধ হয় এবং মামলা চলে। ক্রমপুরের কেশব পন্দিতের রামচন্দ্র চক্রবর্তী
নামে এক পুত্র ছিল যিনি বিদ্যাশিক্ষার জন্য মুর্শিদাবাদের নিকটস্থ গোকর্ণ গ্রামের জনৈক অধ্যাপকের সঙ্গে ছিলেন।
পরবর্তীতে অই অধ্যাপকের কন্যার সাথে রামচন্দ্রের বিয়ে হয় এবং মুরশিদাবাদেই তারা অবস্থান করেন। কিছুদিন পরে রুদ্রচক্রবর্তী ও নারায়ন চক্রবর্তী নামে রামচন্দ্রের দুই ছেলের জন্ম হয়। তারাও বিদ্যা শিক্ষায় আগ্রহী ছিল। উকিল কুশদ্ধজ রায় নারায়ন চক্রবর্তীর ছেলে ছিলেন। তিনি বিদ্যাশিক্ষায় বেশি অগ্রসর না হয়ে মুর্শিদাবাদের উকিল পদে নিযুক্ত হন এবং
নবাব সরকার তাকে ‘রায়নারায়ন’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
রুদ্র চক্রবর্তীর মৃত্যুর পর তার ছেলেদের সাথে কুশদ্ধজ রায়ের বিবাদ হলে তিনি দৌলত গাজীর নিকট আবাসন প্রার্থনা করেন। দৌলত গাজী তার উপর পূর্ব সন্তুষ্টির কারনে জয়দেবপুরের নিকটস্থ ‘চান্দনা’ গ্রামে একটি বাড়ি ও কিছু জমি প্রদান করেন। কুশদ্ধজ রায়ের মারা জাবার পর তার ছেলে বলরাম রায় দেওয়ানী পদে নিযুক্ত হন।

অবিভক্ত ব্রিটিশ বাংলায় আলোড়ন তুলছিল ভাওয়ালের মেজোকুমারের মৃত্যু রহস্য। ১৯০৯ সালে নাকি দার্জিলিং ভ্রমন গিয়ে অসুস্থ হয়ে মৃত্যু হয় ঢাকার জয়দেবপুরের মেজোকুমার রমেন্দ্র নারায়ন রায়ের। অন্তত মেজো রানী বিভাবতীর বয়ান তাই বলে। এক যুগ পরে মেজোকুমারের মত দেখতে নাগা সাধুর দেখা মেলে সদর ঘাটের বাকল্যান্ড বাধে। তিনিই কি ভাওয়াল কুমার নরেন্দ্র নারায়ন রায়? প্রজা পরিবারের মধ্যে বিতর্ক বাড়ে। ঘটনা গড়ায় আদালতে। রাজকীয় মামলায় বিচারের রীতি ভেঙ্গে ব্রিটিশ আদালত ওঠে ভাওয়াল রাজ দরবারে। মেজোকুমারের মৃত্যু রহস্য উদঘাটনে।

ভাওয়াল রাজার রাজপ্রাসাদ, ভাওয়াল রাজা থেকে সন্ন্যাসীঃ
ইতিহাস কখনো কোন মিথ্যাকে লালন করেনা, আশ্রয় দেয়না, কিংবা কারোর মধ্যে মিথ্যাকে বাচিঁয়ে রাখার চেষ্টাও করে না। ইতিহাস সর্বদাই সামনে এগিয়ে চলার দুর্গম পথকে মসৃন করে। পিছনের মিথ্যা বানোয়াট কাহিনী থেকে সত্য শিক্ষা গ্রহনে সহায়তা করে। ইতিহাস সব সময় জাতিকে সত্য ও সুন্দর জীবন-যাপনে সহায়ক হয়ে থাকে। পৃথিবীর শুরু থেকে আজ অবদি কেউ রেহাই পায়নি ইতিহাসের নির্মমতা থেকে। যেমনটি পায়নি ভাওয়ালের বিখ্যাত সন্নাসী (মেজকুমার) রাজার নির্মম ঘটনার সাথে জড়িতরা। এ কাহিনী শতাব্দীকাল পরেও এখনো জীবন্ত। এ লেখা লিখতে গিয়ে গাজীপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য/ ফুলদী মিয়াবাড়ী এবং প্রবীণ ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও আরো কয়েকটি গ্রহনযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য গ্রহন করতে হয়েছে।
মৃত্যুর বার বছর পর হাজির হয়ে জমিদারির অংশ ও নিজের স্বীকৃতির দাবি তুললে পরিস্থিতি কী হতে পারে, ভাওয়ালের সন্ন্যাসী রাজার এই কাহিনি না শুনলে তা অনুমান করাও অসম্ভব ইতিহাস থেকে জানা যায় ভাওয়াল এলাকার জমিদারদের পূর্বপুরুষ বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলার বজ্রযোগিনী গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। এই গ্রামেরই বাসিন্দা বলরাম রায় ১৮ শতকের চল্লিশ দশকে গাজীপুরের ভাওয়াল পরগনার জমিদার দৌলত গাজীর দেওয়ান হিসেবে কাজ করতেন। দৌলত গাজীর অনুপস্থিতিতে দীর্ঘদিন খাজনা প্রদান বাকি পড়ে যাওয়ায় ভাওয়াল জমিদারি নিলামে ওঠে। মুর্শিদকুলী খানের সঙ্গে সখ্য থাকায় বলরাম রায় কৌশলে এই জমিদারি হস্তগত করে ফেলতে সক্ষম হন। রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে মুর্শিদকুলী খান মুসলমান জমিদারদের স্থলে পূর্ববঙ্গে হিন্দু জমিদারদের নিযুক্ত করতেন। বলরাম রায়ের মৃত্যুর (১৭৪৩) পর তার সুযোগ্য পুত্র কৃষ্ণরায় জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব পান। তিনি ভাওয়াল জমিদারিকে স্থায়ীরূপ দেন। কৃষ্ণ রায়ের মৃত্যুর (১৭৫০) পর তার পুত্র জয়দেব রায় ভাওয়াল জমিদারির উত্তরাধিকার নির্বাচিত হন এবং দক্ষতার সঙ্গে জমিদারি পরিচালনা করেন। এ সময় তার নামানুসারে ভাওয়াল এলাকার নামকরণ হয় জয়দেবপুর।

রূপকথার কাহিনিঃ
রূপকথার অনেক কাহিনি শুনে আমরা বিমোহিত হই। সে সব রূপকথাকেও হার মানায় গাজীপুরের জয়দেপুরের ভাওয়ালের ‘মৃত’ রাজার সন্ন্যাসী হিসাবে আবির্ভাবের জমজমাট কাহিনি। দমৃতদ রাজা দৃশ্যপটে হাজির হতেই শুরু হয়
রাজত্ব দখল করে বসা সুবিধাভোগীদের চক্রান্ত। তারা রাজাকেই অস্বীকার করে বসে। অন্যদিকে রাজাও নিজের পরিচয়ের সত্যতা প্রমাণে প্রাণান্ত চেষ্টা চালান।
এই জটিল পরিস্থিতিতে রাজার স্ত্রী বিভাবতীর ভূমিকা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে।শুরু হয় প্রাসাদ ষড়যন্ত্র।
রাজপরিবার শুধু নয়, রাষ্ট্রযন্ত্র ও সাধারণ মানুষ (প্রজা) দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। সত্য উদঘাটনের দায়িত্ব পড়ে আদালতের উপর। চূড়ান্ত ফয়সালায় পৌঁছতে লেগে যায় সিকি শতাব্দি।
ততদিনে ভাওয়ালের ক্ষয়িষ্ণু জমিদারিই শুধু নয়, পুরো জমিদারি প্রথাই বিলুপ্তির মুখে। গত শতাব্দীর গোঁড়ার দিকের এ কাহিনির ঢেউ তখন ভাওয়াল পরগণা ছাড়িয়ে ভারত এমনকি টেমস নদীর তীরে লন্ডন শহরে গিয়েও আছড়ে পড়ে।রূপকথার চেয়ে চমক লাগা নতুন গল্পগাঁথার জন্ম হয়। পত্র-পত্রিকা বিশেষ বুলেটিন বের করে। লেখা হয় গল্প-উপন্যাস-পুঁথিপত্র। নানা ভাষায় নির্মিত হয় নাটক- যাত্রাপালা-সিনেমা।
১৯০৯ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি।চিকিৎসার প্রয়োজন ও আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য ২৪ বছরের মেজকুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরি পারিবারিক সিদ্ধান্তে ভারতের দার্জিলিং যান। সঙ্গী হন ২০ বছরের স্ত্রী (মেজরাণী) বিভাবতী দেবী, বিভাবতীর ভাই সত্যেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় পারিবারিক চিকিৎসক আশুতোষ দাস গুপ্ত এবং ব্যক্তিগত কর্মচারি মিলে ২৭ জন। দলবল নিয়ে ২৫ এপ্রিল মেজকুমার দার্জিলিং পৌঁছেন। দার্জিলিং যাওয়ার মাত্র ১৫ দিন আগে মেজকুমার সালনা কাছারির কাছে জোলারপাড় জঙ্গলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার শিকার করে একটি ছবি তুলেছিলেন। এ ছবিটিই টাইগার ফটো নামে পরিচিত।
এ ছবিটি উনবিংশ শতাব্দীর একটি অন্যতম ছবি হিসেবে বাংলাদেশ আর্কাইভস প্রদর্শণীতে স্থান পায়।

মে মাসের শুরুতে মেজ কুমারের পেটে ব্যাথাসহ নানা শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়। প্রতিদিন দার্জিলিং থেকে জয়দেবপুরে তার বার্তার মাধ্যমে রাজার (মেজ কুমার) স্বাস্থ্যের খবর পাঠানো হতো। প্রথম টেলিগ্রামে রাজার ৯৯ ডিগ্রি জ্বর, পরের টেলিগ্রামে জ্বর বৃদ্ধি, পেটে যন্ত্রণা, দার্জিলিং সিভিল সার্জন দেখে গেছেন ইত্যাদি খবর আসতে থাকে। ৭ মে সন্ধ্যা থেকে কুমারের অবস্থার আরো অবনতি হতে থাকে। ওষুধ খাওয়া সত্ত্বেও বমি, রক্ত মিশ্রিত পায়খানা হতে থাকে। ৮ মে সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে কোনো এক সময় রাজার মৃত্যু হয়েছে, বলা হয়। দার্জিলিংয়ের শ্মশানে তড়িঘড়ি করে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয় বলে জানানো হয়।
১০মে মেজরাণী ও অন্যরা জয়দেবপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ১৮ মে মেজ কুমারের শ্রাদ্ধ করা হয়। গতানুগতিকভাবে এ কাহিনী এখানেই শেষ হবার কথা ছিল। কিন্তু ভাওয়ালের এ রাজার জীবন-মৃত্যুর কাহিনীর এখানেই পরিসমাপ্তি ঘটেনি।
শ্রাদ্ধর দিনই গুঞ্জন ওঠে মেজকুমারের দেহের নাকি সৎকার হয়নি। ওই দিন শ্মশান ঘাটে মেজকুমারের লাশ নেওয়ার পর শুরু হয় ঝড়-বৃষ্টি। এর মধ্যে লাশ ফেলে লোকজন শ্মশান ঘাট থেকে অন্যত্র আশ্রয় নেন।বৃষ্টির পর শ্মশানে গিয়ে তারা আর লাশটি দেখতে পাননি।
১২ বছর পর ১৯২১ সালের ৪ মে ঢাকার বাকল্যান্ড বাঁধে আত্মপ্রকাশ ঘটে গেরুয়া বসন পরা এক সন্ন্যাসীর। দেখতে অবিকল মেজ কুমারের মত। এক কান দুকান হয়ে খবরটি জয়দেবপুর ও কাশিমপুরে জমিদার বাড়িতে পৌঁছে। কাশিমপুরের জমিদার অতুল প্রসাদ রায় চৌধুরি সন্ন্যাসীকে তার জমিদারিতে নিয়ে আসেন। সেখানে ধনি-গরীব, ছোট-বড়, নারী-পুরুষ
নির্বিশেষে ভিড় লেগে যায়। যারা মেজকুমারকে কাছ থেকে চেনেন তারা তো অবাক।
মানুষে মানুষে এত মিল হয় নাকি!
আগন্তুকের গেরুয়া বেশ আর মুখভর্তি দাড়ি থাকলেও তারা নিশ্চিত এ-ই তাদের ‘মৃত’ মেজ কুমার। লোকজন আহ্লাদ ভরে সন্ন্যাসীর হাত- পা মুখ ছুঁয়ে দেখেন। সন্ন্যাসী কাশিমপুরে কয়েকদিন থেকে দলবল নিয়ে রাজবাড়ির অদূরে মাধব বাড়িতে ওঠেন। এখানে এসে দেখা করেন মেজকুমারের বোন জোতির্ময়ী দেবী। প্রথম দেখাতেই জ্যোতির্ময়ীর চোখ আটকে যায়।
এতো তার ভাইয়েরই প্রতিচ্ছবি। তিনি সন্ন্যাসীকে স্বামীর বাড়িতে নিয়ে যান। সেই হাত, পা, নাক, মুখ, গায়ের রঙ, গলার স্বর, পায়ের ক্ষত! জ্যোতির্ময়ী লক্ষ করেন তার ভাইয়ের মত সন্ন্যাসীরও খাওয়ার সময় ডান হাতের তর্জনি আলগা হয়ে যায়, জিহ্বা সামনে বেরিয়ে আসে। জ্যোতির্ময়ী ভাইয়ের আগের একটি ছবি সন্ন্যাসীর সামনে এনে ধরেন। দুজনের চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে থাকে। উপস্থিত আত্মীয়-স্বজন ও কৌতুহলি লোকজন সন্ন্যাসীর পরিচয় নিশ্চিত হতে রীতিমত পরীক্ষা নেওয়া শুরু করেন।
জমিদার পারিবারের খুঁটিনাটি বিষয়- তার বাবার নাম, মায়ের নাম, এমনকি যে ধাইমার কাছে মেজকুমার বড় হয়েছেন তার নাম পরিচয় কিছুই বাদ যায় না। সন্ন্যাসী পরীক্ষায় সহজেই উত্তীর্ণ হন। কারণ এই যে প্রকৃত মেজকুমার। দিন দিন সন্ন্যাসীকে ঘিরে লোকজনের কৌতুহল ও চাপ বাড়তে থাকে। ডালপালা মেলতে থাকে নানামুখি গুজবের। যাকে নিয়ে এত চাঞ্চল্য সেই সন্ন্যাসীর মুখ থেকে কথা বের হয় কমই। নিজ পরিচয় প্রশ্নে তিনি প্রচ- রকম নির্লিপ্ততা দেখান। লোকজনের কৌতুহল প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। অনেকটা পেরেশান হয়ে অন্য সন্ন্যাসীদের নিয়ে তিনি চট্টগ্রামের চন্দ্রনাথ তীর্থে চলে যান। কিছুদিন কাটিয়ে ফিরে আসেন ঢাকারবাকল্যান্ড বাঁধে। কিন্তু লোকজনের উৎসাহে ভাটা পড়ে না।
বরং বিস্ফোরন্মুখ অবস্থা হয়। কাশিমপুরের জমিদার অতুল প্রসাদ রায় চৌধুরি সন্ন্যাসীকে পুনরায় তার বাড়িতে নিয়ে আসেন। এখানে ভাওয়াল পরগনার অধিন সব জমিদার এবং মেজকুমারের অতি পরিচিতজনদের ডাকা হয়। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় পরবর্তী করনীয় নিয়ে। সন্নাসীকে ঘিরে এ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, পাঁচ জন হিন্দু জমিদার, একমাত্র মুসলিম জমিদার মৌলভী মুহাম্মদ মেজবাহউদ্দিন আহম্মেদ খাঁন আব্দু মিয়া, কালীগঞ্জের বেরুয়া গ্রামের তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদ প্রেসিডেন্ট ডা. সামসুদ্দিন আহম্মেদসহ আরো কয়েজন উচ্চমার্গীয় ব্যক্তিবর্গ। এ সভায় গ্রহন করা সিদ্ধান্তানুসারেই এগুতে থাকে পরবর্তী কর্মকান্ড। যদিও মেজকুমারের পক্ষ অবলম্বন করায় রুষানলের শিকার হতে হয়েছিল ভাওয়াল পরগনার একমাত্র মুসলিম জমিদার মেজবাহউদ্দিন আহম্মেদ খাঁন আব্দু মিয়াকে। কিন্তু ভিষণ সাহসী এ জমিদার রানীর কাছে কোন ভাইে মাথানত না করে বরং বিদ্রোহি হয়ে ওঠেন। সভার সিদ্ধান্তানুসারে হাতিযোগে সন্ন্যাসী মেজকুমারকে নিয়ে ছোটেন জয়দেবপুরের রাজবাড়ির দিকে। তাদের বহরের পিছু নেয় উৎসাহী জনতা। জয়দেবপুর পর্যন্ত আসতে আসতে কাফেলা রীতিমত জনস্রোতে রূপ নেয়।
রাজবাড়ির সামনে কামিনী গাছের নিচে বসেন সন্ন্যাসী। হাজারো লোকের কৌতুহল তাকে ঘিরে। সমবেত লোকজনের সামনে রাজবাড়ির চিকিৎসক আশুতোষ দাস গুপ্ত সন্ন্যাসীকে তাদের দার্জিলিং অবস্থানকালীন একটি ঘটনার বিষয়ে প্রশ্ন করেন। সঠিক জবাব দিয়ে সন্ন্যাসী তার দাবির পক্ষে জোরালো প্রমাণ দেন। প্রমাণ যত অকাট্যই থাক, মেজকুমারকে মেনে
নেওয়া গুটিকয়েক লোকের জন্য সম্ভব ছিল না। এদের মধ্যে অন্যতম কুমারের স্ত্রী বিভাবতীর (মেজরাণীর) ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি। কারণ, তিনি ইতোমধ্যে মেজকুমারের জীবন বীমার ৩০ হাজার টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন।
এ ছাড়া মেজকুমারের স্ত্রী হিসাবে বিভাবতী জমিদারির পক্ষ থেকে বাৎসরিক লক্ষাধিক টাকার যে ভাতা পেতেন তার পুরোটাই গ্রহণ করতেন সত্যেন্দ্রনাথ। তাই মেজকুমারের ফেরা সত্যেন্দ্রর জন্য হলো অশনি সংকেত। ভাইয়ের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়াটা বিভাবতীর জন্য অসম্ভব ছিল। এর কিছুটা আভাস পাওয়া যায় বিভাবতীর কথায়।
মেজকুমারের কথিত মৃত্যুর তিনদিন পর ১১ মে মেজরাণীকে নিয়ে সত্যবাবু জয়দেবপুর পৌঁছেন। এরপর সত্যবাবু একবার বোনের সঙ্গে দেখা করতে গেলে বিভাবতী মুখ ফিরিয়ে বলে ওঠেন, ‘দাদা তুমি আমারে রাণী করেছিলে, আবার তুমিই আমাকে ভিখারিণী করলে।

যৌবনে ভাওয়াল রাজাঃ
ভাওয়াল পরিবারের সদস্য শ্রীমতি রত্না চ্যাটার্জীর ভাষ্য মতে জানা যায় মেজোরানী বিভাবতী ছিলেন স্বৈরীনি। পারিবারিক ডাক্তার আশুতোষ দাশগুপ্তের সাথে ছিল মেজোরানীর অবৈধ সম্পর্ক। আশু ডাক্তারের অবৈধ সন্তান যখন বিভাবতীর গর্ভে তখন মেজোকুমার শারিরীকভাবে অক্ষম সন্তান দানে কারন অসংযম যৌনাচারে কিছু দিন আগেই তিনি সিফিলিসে আক্রান্ত ছিলেন।
মেজোকুমার যখন বড় রানী সরযুবালা ও ছোট রানী আনন্দকুমারীর প্ররোচনায় বিভাবতী কে শাস্তি দিতে উদ্যত তখনই মেজোরানী ও আশু ডাক্তারের ফাদে পড়ে দার্জিলিং যান চিকিৎসায়। কথিত যে দার্জিলিং চিকিৎসার জন্য মেজোরানী মেজোকুমারকে অসুস্থ্য করার জন্য স্বল্পমাত্রায় বিষ প্র্য়োগ করত।

মামলাঃ
১৯৩০ সালের এপ্রিল মাসের ২৪ তারিখে ভাওয়াল সন্ন্যাসীর আইনজীবীরা বিভাবতী দেবী ও অন্যান্য মালিকদের বিরুদ্ধে ভাওয়াল এস্টেটের সম্পত্তির অধিকার চেয়ে মামলা করেন।
জেলা জজ অ্যালান হেন্ডারসন বিচারপতি পান্নাবল বসুকে এই মামলার বিচারে নিয়োগ করেন। বিজয় চন্দ্র চক্রবর্তী ভাওয়াল সন্ন্যাসীর প্রধান উকিল হিসাবে কাজ করেন। বিবাদীপক্ষের উকিল ছিলেন অমিয় নাথ চৌধুরী। বিচার শুরু হয় ১৯৩৩ সালের নভেম্বর ৩০ তারিখে। উভয় পক্ষ থেকে কয়েকশ সাক্ষী হাজির করা হয়। তাদের অনেকের সাক্ষ্য ছিলো পরস্পরবিরোধী। বিবাদী পক্ষ কুমারের বোন জ্যোতির্ময়ী দেবীকে জেরা করে। তিনি সন্ন্যাসীর পক্ষে ছিলেন, এবং দাবী করেন, সন্ন্যাসীই কুমার।
তিনি আরো দাবী করেন, সন্ন্যাসীর চেহারায় তাঁদের বংশের ছাপ রয়েছে, এবং সন্ন্যাসী বাংলা বলতে পারেন। বাদীপক্ষ কুমারের স্ত্রী বিভাবতী দেবীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। বিভাবতী দেবী কুমারের চেহারার সাথে সন্ন্যাসীর চেহারার কোনো মিল নেই বলে দাবী করেন। কুমারের অন্য ভাইয়ের বিধবা স্ত্রী অন্নদা কুমারী দাবী করেন, কুমার রমেন্দ্রনারায়ন ইংরেজি বলতে পারতেন, এবং বাংলা বলতে ও লিখতে পারতেন। এর কোনোটাই সন্ন্যাসী পারতেন না। কিন্তু কুমারের ভাষাজ্ঞানের প্রমাণ হিসাবে পেশ করা চিঠি গুলো পরে জাল বলে প্রমাণিত হয়। বিচারক পান্নাবল বসু তিন মাস ধরে চুড়ান্ত রায়
নিয়ে কাজ করেন।
১৯৩৬ সালের আগস্ট ২৪ তারিখে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা সহ রায় প্রদান করেন, এবং সন্ন্যাসীর পক্ষে রায় দেন। এসময় মামলার রায় জানতে বিশাল জনসমাগম হয়। মামলার রায় দেয়ার পরেই পান্নাবল বসু বিচারকের পদ থেকে অবসর নেন।
ভাওয়াল এস্টেটে রমেন্দ্রনারায়ণের সম্পত্তির ভাগ থেকে দাবিদার সন্ন্যাসীকে টাকা নিতে অনুমতি দেয়া হয়। তিনি অন্যান্য বিষয়ের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অর্থ গ্রহণ স্থগিত রাখেন, এবং এই সম্পত্তির কর্তৃত্ব কোর্ট অফ ওয়ার্ডসের হাতেই রাখেন। একই সময়ে তিনি বিয়ে করেন। রাজস্ব বোর্ড মামলা নিয়ে কার্যক্রম বন্ধ রাখে তখনকার মতো।
এ এন চৌধুরী মামলা থেকে সরে দাঁড়ান। তবে বিভাবতী দেবী হাল ছাড়তে রাজি হননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে মামলার আপিল ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত বন্ধ থাকে। ঐ বছর বিভাবতী দেবীর আইনজীবীরা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লন্ডনের প্রিভি
কাউন্সিলে আপিল করে। জার্মান বিমান হামলায় কাউন্সিলের কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রিভি কাউন্সিলের অধিবেশন ঘটে হাউজ অফ লর্ডসে, ১৯৪৫ সালে সেখানেই শুনানি শুরু হয়।
ডি এন প্রিট দাবিদারের পক্ষে এবং ডব্লিউ ডব্লিউ কে পেইজ, কোর্ট অফ ওয়ার্ডসের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন।
প্রিভি কাউন্সিল আপিল শুনতে রাজি হয়। লর্ড থাঙ্কের্টন, লর্ড হার্বার্ট ডু পার্স্ক, এবং স্যার চেতুর মাধবন আপিলের বিচার করেন।
২৮ দিন ধরে শুনানি চলে। ১৯৪৬ সালের জুলাই ৩০ তারিখে বিচারকেরা দাবিদারের পক্ষে রায় দেন, এবং আপিল নাকচ করে দেন। পরের দিন কলকাতায় টেলিগ্রাফ মারফত মামলার রায় জানানো হয়। সন্যাসি রাজার সব মিলে গেলেও তার হাতের ছাপ মিলেনি. তিনি রায় ঘোষনার দুই দিন পর মারা যান।

তথ্য সূত্রঃ ইন্টারনেট।

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/২৮-০৯-২০১৭ইং/ অর্থ

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ