আশুরার আমল

হাফেজ মাওলানা যুবায়ের আহমাদ।। হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মুহাররম। মুহাররম অর্থ ‘অলঙ্ঘনীয় পবিত্র’। ইসলামের দৃষ্টিতে চারটি সম্মানিত মাসের একটি হলো মুহাররম। মুহাররম মাসেরই একটি দিন আশুরা। আরবি আশারা শব্দ থেকে উৎপত্তি হয়েছে ‘আশুরা’র। আশারা অর্থ দশ। পবিত্র মাস মুহাররমের দশম দিনটিই ইসলামের পরিভাষায় আশুরা বলে পরিচিত। আশুরার দিনটি বিভিন্ন কারণেই পৃথিবীর সূচনা থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। এর অন্যতম হলো এ দিনে হজরত মুসা (আ.) ফিরআউনের ওপর বিজয়ী হয়েছিলনে। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মাদিনায় এসে দেখখেন যে ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা পালন করছে। তিনি তাদের বললেন, এ দিনটির বিষয় কী যে তোমরা তাতে রোজা পালন কর? তারা বলল, এটি একটি মহান দিন। এ দিনে আল্লাহ তাআলা হজরত
মুসা (আ.) এবং তার জাতিকে পরিত্রাণ দান করেন এবং ফিরআউন ও তার জাতিকে নিমজ্জিত করেন। এজন্য মুসা (আ.) কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এ দিনে রোজা পালন করেছিলেন তাই আমরাও এ দিনে রোজা পালন করি। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, মুসার (আ.) বিষয়ে আমাদের অধিকার বেশি। এরপর তিনি এ দিবসে সিয়াম পালন করেন এবং (সাহাবিদের) রোজা পালনের নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি : ২/৮৬১)। অন্য হাদিসে এসেছে, (মহাপ্লাবন শেষে) আশুরার দিনে হজরত নূহ (আ.) এর নৌকা জুদি পর্বতে স্থির হয়েছিল। তাই হজরত নূহ (রা.) এর শুকরিয়া জানাতে আশুরার দিনে রোজা রাখতেন। (মুসনাদে আহমাদ : ৮৭১৭)।

আশুরার দিনের আমল নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক বাড়াবাড়ি আছে। এর অধিকাংশই ভিত্তিহীন। কোরআন ও হাদিসের শুদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী আশুরার একমাত্র আমল হলো রোজা। নবীজি (সা.) রমজানের রোজার পরই আশুরার রোজার গুরুত্ব দিয়েছেন। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আমি নবীজি (সা.)কে রোজা রাখার ব্যাপারে এত অধিক আগ্রহী হতে দেখিনি যেমনটি আশুরার রোজা ও রমজান মাসের রোজার ব্যাপারে দেখেছি।’ (সহিহ বুখারি : ১৮৬৭)। নবীজি (সা.) আশুরার রোজার প্রতি এত গুরুত্ব প্রদানের কারণ হলো আশুরার রোজা এক বছরের গুনাহ ক্ষমার কারণ হয়ে যায়। (সহিহ মুসলিম : ১৯৭৬)। তবে যেহেতু ইহুদিরা শুধু মুহাররমের দশম (আশুরা) দিনে রোজা রাখে তাই এর ব্যতিক্রম করার জন্য নবীজি (সা.) এর সঙ্গে তাসু’আর (নবম) দিনে রোজা রাখার ইচ্ছে করেন। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, যখন নবীজি (সা.) আশুরার রোজা রাখলেন এবং অন্যদেরকে তা পালনের নির্দেশ দিলেন তখন লোকেরা বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ, এটি তো এমন দিন যাকে ইহুদি খ্রিস্টানরা সম্মান জানায়। তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘আগামী বছর এ দিন আসলে আমরা নবম দিনেও রোজা রাখব।’ (সহিহ মুসলিম : ১৯৪৬)।

তিনি সাহাবিদেরকে (রা.) ইহুদিদের রোজার মতো শুধু দশম তারিখে রোজা না রেখে এর সঙ্গে একদিন বাড়াতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ তোমরা আশুরার রোজা রাখ এবং এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের রোজার ব্যতিক্রম করো। তোমরা আশুরার সঙ্গে এর আগে এক দিন অথবা দিন পরে এক দিন রোজা রাখো।’ (মুসনাদে আহমাদ : ২১৫৫)। আশুরার দিনে ভালো খাবারের আয়োজন করতে হবে, মুরগি জবাই করতে হবে এ ধারণা নিছকই কুসংস্কার। ‘এ দিনে ভালো খেলে সারা বছর ভালো খাওয়া যাবে’ -এ কথারও কোনো ভিত্তি নেই কোরআন হাদিসে। আশুরার দিনটি একদিকে যেমন ফিরআউনের বিপক্ষে মুসা (আ.) এর বিজয়ের দিন হিসেবে শুকরিয়া আদায়ের দিন অন্যদিকে ইসলামে শোক পালন জায়েজ হলে কারবালার ঘটনার ফলে দিনটি হতো শোকের দিন। কিন্তু ইসলামে তো কারও মৃত্যুতে তিন দিনের বেশি শোক পালনের বৈধতা নেই। এমনকি মহানবী (সা.) এর মৃত্যুতেও শোক পালনেও বৈধতা দেয়নি ইসলাম। শরিয়তের বিধান প্রণেতা হজরত মুহাম্মাদ (সা.) এ ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে বলে গেছেন। হজরত হাফসা বিনতে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে মহিলা আল্লাহ ও পরকালের ওপর ঈমান রাখে, তার জন্য কারো মৃত্যুতে তিন দিনের বেশি শোক পালনের অনুমোদন নেই। তবে স্বামীর মৃত্যুতে চার মাস দশদিন শোক পালন করতে পারবে। (নাসায়ী : ৩৫০৩)। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সুন্দর বলেছেন, “ফিরে এলো আজ সেই মহরম মাহিনা, ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না।” সত্যি আমাদের উচিত হজরত হুসাইন (রা.) এর শাহাদাত থেকে সত্য ও ন্যায়ের জন্য ত্যাগের শিক্ষা নেওয়া।

আশুরা বা অন্য কোনো দিনে যে কারো মৃত্যুতেই বিলাপ বা মাতম করে শোক পালন সম্পূর্ণ হারাম। যে ব্যক্তি এমন করে তাকে নবীজির (সা.) উম্মতের বাইরের লোক হিসেবে অভিহিত করেছেন। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি গালে থাপ্পড় মারে, পকেট ছিড়ে ফেলে ও জাহিলিয়াতের রীতি-নীতির প্রতি আহবান করে সে আমাদের দলভূক্ত নয়।’ (সহিহ বুখারি : ১২৯৪)। এমন ব্যক্তি যে কি-না কারও মৃত্যুতে মাতম করেছে সে যদি তার এ কাজের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে তাওবা না করে মারা যায় তাহলে পরকালে তাকে ভয়াবহ শাস্তি ভোগ করতে হবে। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মাতমকারিণী মৃত্যুর পূর্বে তওবা না করলে কিয়ামতের দিন তাকে আলকাতরার পাজামা ও খোস-পাঁচড়ার ঢাল পরিহিতা অবস্থায় দাঁড় করানো হবে।’ (সহিহ মুসলিম : ৯৩৪)। যে ব্যক্তির মৃত্যুতে বিলাপ বা মাতম করা হয় তার জন্যও বিষয়টি কোনো উপকার বয়ে আনে না। বরং তার জন্যও ব্যাপারটি কষ্টের কারণ হয়। হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মৃত ব্যক্তি তার কবরের মধ্যে তার জন্য মাতম করে কান্না করার দরুন শাস্তি পায়।’ (সহিহ বুখারি : ১২৮৮)।

লেখক : জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত ক্বারি; ডেইলি সান, কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন ইংরেজি ও বাংলা জাতীয় দৈনিকের নিয়মিত কলামিস্ট।

 

 

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/২৯সেপ্টেম্বর২০১৭ইং/নোমান

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ