হাত পাতা ঘৃণ্য কাজ

যুবায়ের আহমাদ।। টঙ্গী থেকে বাসে উঠলাম। উঠলেন আরেকজন পাঞ্জাবি টুপি পরা লোকও। তার হাতে একটি রশিদ বই। একটি মাদরাসার জন্য দান কালেকশন করছেন। লোকটি বলছেন, ‘সম্মানিত যাত্রী ভাই ও বোনেরা, কত টাকা কত পয়সা কতভাবে খরচ হয়ে যায়……।’ একজন দশ টাকা দান কলেন। দানকারীর পিতা-মাতার জন্য দুআ করতে করতে লোকটি সামনে এগিয়ে এলে এক যাত্রী তাকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি মাদরাসার শিক্ষক কিনা। উত্তরে লোকটি বললেন তিনি মাদরাসার শিক্ষক নন, এমনকি তিনি কোনোদিন মাদরাসায় পড়ালেখাও করেননি। তিনি নাকি মাদরাসার ‘কালেক্টর’ (দান সংগ্রহকারী)। মাদরাসাটি কোথায় তা জানতে চাইলে বলেন ‘২৭’। যাত্রী বললেন সাতাইশে তো এ নামে কোনো মাদরাসা নেই। আপনি কিসের কালেকশন করছেন? জবাব দিতে না পেরে বাসের পেছনের দরজা দিয়ে নেমে পড়লেন।

চলার পথে প্রায়ই এমন দান সংগ্রহকারীর মুখোমুখি হতে হয় আমাদেরকে। সরলপ্রাণ অনেকে বিশ্বাস করে এদেরকে দানও করেন। আর এদেরকে দান করার কারণেই বেড়ে চলেছে এসব প্রাতরকের সংখ্যা। এর বাইরে রয়েছে একটি ব্যবসায়ী ভিক্ষুক শ্রেণি। যারা ভিক্ষাবণিজ্য চালান নির্লজ্জভাবে। চরম অলসতা ও কর্মবিমুখতার কারণে অভাবী এসব হতভাগ্য বিনা পুঁজির মাধ্যম হিসেবে নির্লজ্জভাবে বেছে নেয় ভিক্ষার পেশা। কৃত্রিমভাবে ভিক্ষুক সৃষ্টির বিষয়টিও প্রায়ই আসে মিডিয়ায়। বিকলাঙ্গ শিশু, প্রতিবন্ধী বা অসুস্থ কোনো ব্যক্তিকে মাধ্যম বানিয়ে চালিয়ে যান ভিক্ষা বণিজ্য। ধোকাবাজির মাধ্যমে আবার সিন্ডিকেট করে এক শ্রেণির লোক একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। যেখানে ভিক্ষা করাটাও একটা চাকরি। একজন ভিক্ষুক সারাদিন ভিক্ষা করে যা উপার্জন করে সেটা দিয়ে দিতে হয় মালিককে।

ইসলামের লেবাস কিংবা অনুভূতিকে পূঁজি করে বিচিত্র কৌশলে নানা কৌশলে সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত এরা। অথচ ইসলামে ভিক্ষা কিংবা কারো কাছে হাত পাতা একটি ঘুন্য কাজ। পৃথিবীর ধর্মগুলোর মধ্যে ইসলামই ভিক্ষা কিংবা কারো কাছে হাত পাতার বিষয়ে সবচেয়ে কঠোর
অবস্থানে। হজরত সামুরা ইবনে জানদুব (রা.) থেকে বর্ণিত মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ভিক্ষাবৃত্তি হলো ক্ষত স্বরূপ; এর দ্বারা মানুষ মুখমন্ডলকে ক্ষতবিক্ষত করে’। (নাসায়ী: ৫/৯৭)। তাই তো রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদেরকে কারো কাছে হাত না পাতার ব্যাপারে শপথ করিয়েছেন।

হজরত আউফ ইবনে মালিক (রা.) বলেন, ‘আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.) দরবারে নয়জন, আটজন কিংবা সাতজন ছিলাম। তিনি আমাদের বললেন: তোমরা কি আল্লাহর রাসুলের হাতে বায়াত গ্রহণ করবে না? অথচ আমরা মাত্রই আকাবায় বাইয়াত গ্রহণ করেছি। আমরা বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা তো আপনার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছি। তিনি আবার বললেন: তোমরা কি আল্লাহর রাসুলের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করবে না? আমরা তখন হাত বড়িয়ে দিয়ে বললাম- হে রাসুল! আমরা তো বায়াত গ্রহণ করেছি। এখন আবার কিসের বায়াত? তিনি বললেন, ‘এই মর্মে শপথ নাও, কেবল আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে, আমিরের কথা মেনে চলবে। তারপর তিনি নিচু স্বরে একটি গোপন কথা বললেন- আর মানুষের কাছে কোনো কিছু চাইবে না।’ (মুসলিম: ২/৭২১)।

অন্যদিকে অভাব ছাড়া যদি কেউ কারো কাছে হাত পাতে তাহলে ইসলাম একে নিষিদ্ধ করে এর জন্য কঠিন শাস্তির ঘোষণা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অভাব ব্যতিত ভিক্ষা করল সে যেন জাহান্নামের আগুন ভক্ষণ করলো। (মুসনাদে আহমাদ: ২৯/৫১)। কিছু লোক আছে যাদের সম্পদ থাকা সত্বেও তারা তাদের সম্পদ বাড়ানোর জন্য অন্যের কাছে হাত পাতে। রাসুলে কারিম (সা.) তাদেরকে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ বৃদ্ধির জন্য কারো কাছে ভিক্ষা চায় সে তো জাহান্নামের আগুন ভিক্ষা চায়। তার ইচ্ছা, সে চাইলে জাহান্নামের আগুন কম ভিক্ষা করতে পারে বেশিও ভিক্ষা করতে পারে। (ইবনে মাজা: ১/৫৮৯)। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কারো কাছে কিছুই না চাওয়ার দৃঢ় ইচ্ছা করবে ইসলামে তার জন্য শুভ সংবাদ।

হজরত সাউবান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি এই মর্মে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবে যে সে অন্যের কাছে হাত পাতবে না আমি তার জান্নাতের জিম্মাদারী গ্রহণ করবো। (ইবনে মাজা: ১/৫৮৮ )। একান্ত অভাবে পড়েও কারো কাছে হাত না পেতে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজ হাতে উপার্জন করা ইসলামের শিক্ষা। ইসলামই বিশ্ববাসীকে শুনিয়েছে এই শ্লোগান, ‘নবীর শিক্ষা করো না ভিক্ষা’। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কারোর নিজ পিঠে কাঠের বোঝা বয়ে এনে বিক্রি করা কারো কাছে হাত পাতার চেয়ে উত্তম। তাকে (প্রার্থীকে) সে কিছু দিক বা না দিক।’ (বুখারি: ২/৫৩৫)

হজরত আলী (রা.) হিজরতের পর হজরত আলী (রা.) মদিনায় তীব্র অভাবে পড়েন। ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে পারছিলেন না। তবু তিনি কারো কাছে হাত পাতলেন না। বরং হাত পাতা ত্যাগ করে শহরতলির দিকে কাজের সন্ধানে বের হয়ে পড়েন। এক জায়গায় একটি মেয়েকে মাটি জমা করতে দেখে তিনি ভাবলেন হয়তো মেয়েটি মাটি ভিজাবে। ওই মেয়েটির কাছে গিয়ে তিনি একেকটি খেজুরের বিনিময়ে একক বালতি পানি ক’প থেকে তুলে দিলেন। পর্যায়ক্রমে ১৬ বালতি পানি ১৬টি খেজুরের বিনিময়ে উঠিয়ে দিলেন। এমনকি তার হাতে ফোসকা পড়ে গেল। মেয়েটির কাছ থেকে ১৬টি খোরমা পারিশ্রমিক নিয়ে তিনি চলে এলেন রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছে। নবীজির কাছে সবিস্তার ঘটনাটি বললেন। কারো কাছে হাত না পেতে কর্মের পথ অবলম্বন করায় নবীজি (সা.) এতটাই খুশি হলেন যে হজরত আলী (রা.) এর সঙ্গে খেজুর খেয়ে এ কাজটিকে স্বাগত জানালেন।

কারো কাছে হাত না পেতে উপার্জনের জন্য শ্রমে লিপ্ত থাকাকে তিনি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ বলে উল্লেখ করেছেন। হজরত কা‘ব ইবনু উজরা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এক লোক রাসুলুল্লাহ (সা.) এর নিকট দিয়ে গমন করলে সাহাবায়ে কেরাম লোকটির শক্তি, স্বাস্থ্য ও উদ্দীপনা দেখে বলতে লাগলেন, এই লোকটি যদি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে থাকত! রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন যদি লোকটি তার ছোট ছোট সন্তান অথবা তার বৃদ্ধ পিতামাতার জন্য উপার্জন কিংবা নিজেকে পরনির্ভরতা থেকে মুক্ত রাখতে উপার্জনের চেষ্টায় বেরিয়ে থাকে তাহলে সে আল্লাহর পথেই রয়েছে। (হাইসামি ৪/৩২৫)। কেউ যদি অভাবের কারণেও সাহায্য চায় তবু ইসলাম তা অপছন্দ করেছে। কারো ধারস্থ না হয়ে কর্মের প্রতি তাকে উৎসাহিত করেছে। মানুষের কাছে হাত না পেতে আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে হালাল উপার্জনের চেষ্টায় ব্রতী হলে আল্লাহ তাকে অভাবমুক্ত করে দেবেন আল্লাহর করুণার প্রাচুর্য দান করবেন। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলে কারিম (সা.) এর কাছে কিছু আনসার লোক সাহায্য চাইল, তিনি তাদেরকে কিছু দান করলেন। তারা পূণরায় প্রার্থনা করলে নবীজি (সা.) তাদেরকে দান করেন এবং তার সঞ্চয় শেষ হয়ে যায় অতপর তিনি বলেন আমার নিকট গচ্ছিত আর কোনো সম্পদ নাই। যে ব্যক্তি অন্যের কাছে হাত পাতা থেকে বিরত থাকবে আল্লাহ তাকে পবিত্র এবং অমুখাপেক্ষী করবেন। যে ব্যক্তি অভাবের কথা মানুষের কাছে প্রকাশ করবে তার অভাব দূর হবে না এবং যে ব্যক্তি তা আল্লাহর করছে নিবেদন করবে আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট। (মুসলিম: ২/৭২৯ )

লেখক: জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ক্বারি; ডেইলি সান ও কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন ইংরেজি ও বাংলা জাতীয় দৈনিকের নিয়মিত কলামিস্ট।

 

 

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/০৬অক্টোবর২০১৭ইং/নোমান

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ