সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ধর্ম প্রচারের’ নামে প্রতারণা

হাফেজ মাওলানা যুবায়ের আহমাদ।। আমাদের পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক বিপ্লবেরই নাম ইন্টারনেট। প্রথমে কম্পিউটার ভিত্তিক থাকলেও এর বিবর্তন ঘটেছে দ্রুত। মোবাইল ফোনে ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ছে ক্রমেই। পৃথিবীতে বর্তমানে ৩৪২ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। গেটা ইন্টারনেটজগতে বড় একটা অংশ দখল করে আছে ফেসবুক। মাসিক সক্রিয়তার হিসেবে পৃথিবীতে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৮ কোটিরও বেশি। (প্রথম আলো : ০৩-০২- ২০১৭)। আর বংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২ কোটি ১৪ লাখ। (প্রথম আলো : ১২-০৬- ২০১৭)। ফেসবুকের উন্মুক্ত এই বিশাল মাধ্যমকে বেছে নিয়েছে সুযোগসন্ধানী মহল। অশ্লীলতার বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ফেসবুক। আবার অপরাধকারীরা যেমন অপরাধ বাস্তাবায়নে জাল বিস্তার করছে তেমনি বিভিন্ন ভ্রান্ত মতাবলম্বীরাও তাদের ভ্রান্ত মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে ব্যবহার করছে একে।

কখনো দেখা যায়, সরলপ্রাণ মানুষকে বোকা বানিয়ে ‘ইসলাম প্রচারের’ দোহাই দিয়ে করা হচ্ছে এসব কাজ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুয়া আইডি কিংবা পেজ ব্যবহার করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ফেসবুক উন্মাদনা এখন চরমে। ‘আমিন না লিখে যাবেন না’; ‘মুসলামান হলে আমিন না লিখে যাবেন না’ ‘ছুবহানাল্লাহ, আল্লাহর কী কুদরত!’ ‘এটা নবীজির পাত্র, আমিন না লিখে যাবেন না’ -এমন লেখার সঙ্গে আল্লাহ কিংবা রাসুল (সা.) এর নাম অথবা কালিমা খচিত ছবি হয়তো ফেসবুক ইউজারমাত্রই দেখেছেন। এসব ভুয়া পোস্ট দিয়েই অনেকে ফেসবুকে ‘ইসলাম প্রচার’ করছেন। অনেকেই সরলমনে লাইক/কামেন্টও করেছেন। অসুস্থ বা রুগ্ন শিশুর ছবি দিয়ে লিখে দেয়, ‘আমিন না লিখে যাবেন না।’ ভাবখানা এমন যে এখানে লাইক দিলেই জান্নাত।

প্রশ্ন হলো, এখানে রুগ্ন ব্যক্তির সঙ্গে আমিন বলার কী সম্পর্ক? নবীজির (সা.) পাত্রের সঙ্গে আমিন বলার কী সম্পর্ক? পাশাপাশি কয়েকটি ধর্মীয় গ্রন্থের ছবি দিয়ে বলা হয়, আপনি কোনটির সাপোর্টার?’

কখনো দেয়া যায়এমসিকিউয়ের মতো প্রশ্ন। আপনার রব কে? ১. আল্লাহ। ২. ভগবান। মাঝেমধ্যে দেখা যায় হৃদয়ে ঝাঁকুনি দেয়ার মতো প্রশ্ন, ‘আপনি কি মুসলমান?’ মুসলমান হলে লাইক না দিয়ে যাবেন না। আবেগী ফেসবুকাররা এখানে ধুমছে লাইক দিচ্ছেন। এগুলো ইসলামকে নিয়ে ইসলামের পরিভাষা ‘আমিনকে’ নিয় উপহাস করা ছাড়া কিছুই নয়। কখনো দেখা যায় অশুদ্ধ বা জাল হাদিস তুলে ধরে বলা হয় ‘লাইক দিন, যদি জান্নাতে যেতে চান।’ অথচ মিথ্যা হাদিস বর্ণনা করা যেন জাহান্নামে নিজের ঠিকানা বানিয়ে নেয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার উপর মিথ্যা আরোপ করে সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে।” (সহিহ বুখারি)। ইমান আকিদা বিধ্বংসী বিষয়। পেস্টটি শেয়ার করলে, ‘আমিন লিখলে অমঙ্গল থেকে বাঁচা যাবে; মনোবাসনা পূর্ণ হবে, শেয়ার না করলে, আমিন না লিখলে ব্যবসায় লোকসান হবে, সন্তান মারা যাবে’ এমন শিরকপূর্ন কথাবার্তা। এটা কোরআন সুন্নাহ সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘আর যদি আল্লাহ তোমাকে কোনো কষ্ট দেন তবে তিনি ব্যতীত তা অপসারণকারীকেউ নেই পক্ষান্তরে যদি তোমার মঙ্গল কনে তবও তিনি সব কিছু রওপর ক্ষমতাবান।’ (সুরা আনআম: ১৭)। মূলত এসব পোস্টের মাধ্যমে মানুষকে শিরকে লিপ্ত করা হচ্ছে। একটি আমিন বলা, বা শেয়ারই মানুষকে অমঙ্গল থেকে বাঁচাতে পারে এমন ধারণা তো সম্পূর্ণ শিরক। প্রতারকদের ফাঁদে পা দিয়ে অনেকেই সরলমনে লিপ্ত হচ্ছে শিরকের মতো ক্ষমার অযোগ্য মারাত্মক অন্যায়ে। প্রায়ই দেখা যায় ‘মক্কা শরিফের খাদেম স্বপ্নে দেখেছেন.. .. শেয়ার করলে এই পুরস্কার।’ একবার দেখা গেল অং সাং সু চির হিজাব পরা ছবি। নিচে লেখা ‘ইসলামগ্রহন করেছেন অং সাং সু চি।’ সারা পৃথিবীর কেউ জানে না। কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম পেল না সেই খবর কিন্তু অসহায় বাঙ্গালীর ফেসবুক দখল করে নিল সু চির হিজাবী ছবি। একজন কামেন্টে প্রশ্ন করলেন,

‘এই খবর পৃথিবীর কোনো মিডিয়া পেল না আপনি কোত্থেকে পেলেন?’ ইহুদি নাসারারা কি ইসলামগ্রহণের খবর প্রচার করবে? আরেকবার দেখা গেল ‘এবার সনাতন ধর্ম গ্রহণ করলেন নওয়াজ শরিফের ভাতিজি। সবাই আশির্বাদ করুন।’; ‘যজ্ঞ করে ইসলাম ছেড়ে রফিক এখন হিন্দু রাজু। দেখা মাত্রই পোস্টটি শেয়ার ও দাদাকে আশির্বাদ করুন।’ এমন হাজারো ভুয়া খবরের বড় উৎস ফেসবুকের উন্মুক্ত মাধ্যম। এসবই ছবি নিছক ফটোশপের কারসাজি। ছবিটি ভালোভাবে দেখলে বোঝা যাবে যে কাজটা এত নিপুনভাবে করা যে তা কোনো আনাড়ি ধর্মপ্রিয় ফেসবুকবারের কাজ নয়। বরং খুব ঝানু কেউ মুসলমানদেরকে হাসির পাত্র বানাবার জন্য পরিকল্পিতভাবে কাজটা করেছে। প্রথমত যারা এ ধরণের পোস্ট দিয়ে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে নিয়ে খেলা করছেন, তারা মারাত্মক অন্যায় করছেন। মিথ্যা বলা, লেখা, প্রচার করা ইসলামের দৃষ্টিতে ভয়াবহ কবিরা গুনাহ। একটি কবিরা গুনাহই একজন মানুষকে জাহান্নামে নেয়ার জন্য যথেষ্ট। নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহের কথা বলব না?

সাহাবায়ে কেরাম বললেন, ‘আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে কাউকে শরিক করা, মাতাপিতার অবাধ্যতা, এরপর তিনি ঠেস দিয়ে বসে বললেন, ও শোন! মিথ্যা কথা। তিনি (মিথ্যার কথা) বারবার বলতে লাগলেন। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। অনেক সময় লাইক বা কামেন্ট পাওয়ার জন্য এ ধরণের মিথ্যা বা গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয়। লাইক/কামেন্ট পাওয়ার লোভ এক ধরণের মানসিক অসুস্থতার পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রশ্ন হলো লাইক/কামেন্ট কী মহামূল্যবান জিনিস যে মিথ্যাচার প্রচার করে লাইক কামেন্ট পেতেই হবে! কী উপকার হবে এতে? মিথ্যা কথা বলা বা মিথ্যাচার প্রচারের মধ্য দীর্ঘকালীন ক্ষতির মূখোমুখি হচ্ছেন। পবিত্র কোরআনুল কারিমে এরশাদ হয়েছে, ‘দুর্ভোগ প্রত্যেক মিথ্যাবাদী পাপীর জন্য।’ (সুরা জাসিয়া: ৭)। কখনো দেখা য়ায় মিথ্যা দিয়ে কাউকে হাসাতে চায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কঠিন দুর্ভোগ তার জন্য যে মিথ্যা ও অলীক কথা বলে লোককে সাহাতে চায়। তার জন্য কঠিন দুর্ভোগ, তার জন্য কঠিন দুর্ভোগ।’ (তিরমিজি, আবু দাউদ)। এ ধরণের মিথ্যাচার মানাফেকির আলামত। যুগে যুগে মিথ্যা বলে, মিথ্যা প্রচার করে মুনাফিকরাই ইসলামের বেশি ক্ষতি করেছে। ইসলামকে হাসির পাত্র বানিয়েছে। মহানবী (সা.)কেও তারাই বেশি কষ্ট দিয়েছে। তাই মুনাফিকদের জায়গা হবে জাহান্নামের সর্বনিন্ম স্তরে। এরশাদ হয়েছে, নিঃসন্দেহে মুনাফিকরা দোজকের সর্বনিন্ম স্তরে আর তোমরা তাদের জন্য কোনো সাহায্যকারী পাবে না।’ (সুরা নিসা: ১৪৫)।

কোনো সংবাদভিত্তিক পোস্টে লাইক/কামেন্ট করার আগে সংবাদটির উৎস জানতে হবে। কোনো সঠিক উৎস থেকে এসেছে কিনা। একটা মেয়ের ছবিতে লিখে দেয়া হলো ‘এই হিজাবী বোনটির জন্য কত লাইক? সবাই লিখুন মাশাআল্লাহ’। সেই ছবিতে ‘মাশাআল্লাহ’ লেখা কামেন্টের ধুম পড়ে গেল। শেয়ারের ঝড়ে ছবিটি ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুক কম্যুনিটিজুড়ে। এ নিয়ে ধর্মবিরাগী অনলাইন এক্টিভিস্টরা হাসাহাসি করে মজাও নিচ্ছেন বেশ। উপহাসের পাত্র বানিয়ে দেয়া হলো হিজাবকে। এ জন্য যারা এসব কথার সত্যতা না জেনেই প্রচার করবেন তারাও নবীজি (সা.) এর ভাষায় মিথ্যাবাদী বলে প্রতীয়মান হবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কারো কোনো কথা শুনেই তা প্রচার করাই কোনো ব্যক্তির জন্য মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট। নবীজি (সা.) বলেন, কোনো ব্যক্তি মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যাই শুনবে (সত্যতা যাচাই না করে) তাই বর্ণনা করবে।’ (সহিহ মুসলিম)। সত্যতা যাচাই না করেই ‘ইসলাম প্রচার’ করতে গিয়ে কতবড় গোনাহের ভাগী হয়ে যাচ্ছেন। ফেসবুক ব্যবহারে সবারই সতর্কতা কাম্য।

লেখক: জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ক্বারি; ডেইলি সান ও কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন ইংরেজি ও বাংলা জাতীয় দৈনিকের নিয়মিত কলামিস্ট।

 

 

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/২৭-অক্টোবর২০১৭ইং/নোমান

Comments are closed.