ইসলাম যেভাবে নারী স্বাধীনতা দিয়েছে

মাওলানা আরিফুল কাদের।। পৃথিবীতে সব প্রাণীই চায় স্বাধীনতা। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ থেকে কোন কাজ সহজে করা কঠিন হয়ে পরে। স্বাধীনতা ছাড়া কোন প্রাণীই মুক্ত মনে ঘুড়ে বেড়াতে পারে না। তেমনি তার মাঝে সৃষ্টি হতে থাকে এক ধরনের শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া। এই প্রতিক্রিয়া ধীরে ধীরে স্ব-জাতিকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যেতে পারে। আর এই স্বাধীনতা মানব কুলের একান্ত প্রয়োজন। মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে সে একা একা জীবন চালাতে পারে না। প্রয়োজন তার একজন সহযোগী। কিন্তু সেই সহযোগী যদি তার স্বাধীন অনুযায়ী কাজ করতে না পারে; তাহলে নেমে আসে উভয়ের মাঝে এক প্রকার কলহ। এই কলহ থেকে মুক্তি পেতে হলে মহাগ্রন্থ আল কোরআন এবং রাসুল (সা) এর মুখ নিঃসৃত বানী আল হাদীসের কোন বিকল্প নেই। কোরআন-হাদীসের পাশাপাশি তথ্য ভিত্তিক বানীও আমাদের জন্য শিক্ষনীয় বিষয় হিসেবে গ্রহন করতে পারি। মূলকথা হলো-স্বাধীনতার পক্ষ্যে বিষয় ভিত্তিক সব ক্ষেত্রেই আলোচনার মূখ্য ভুমিকা পালন করে। তাইতো আজ আমার লিখা “নারী স্বাধীনতা” ইসলাম যেভাবে দিয়েছে।

ইসলাম পুরুষকে যেভাবে সব ক্ষেত্রেই স্বাধীনতা দিয়েছে, তেমনি নারী জাতিকেও সমান সমান অধিকার প্রদান করা হয়েছে। তবে এই সমান অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারী জাতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। অনুরুপভাবে, পুরুষ জাতিকেও কোন কোন ক্ষেত্রে নারী জাতির উপর প্রাধান্য দিয়েছে। এক কথায় বলা যেতে পারে যে, সব ক্ষেত্রেই গড়ে নারী ও পুরুষকে সমান অধিকারে ভুষিত করা হয়েছে। উদাহরণ স্বরুপ বলা যেতে পারে যে, একটি ছাত্র ইংরেজিতে পেল ৭০ নম্বর, গণিতে পেল ৯০ নম্বর, বাংলায় পেল ৮৫ নম্বর, ধর্মে পেল ৭৫ নম্বর, বিজ্ঞানে পেল ৮০ নম্বর। অর্থাৎ সে সর্বমোট পেল ৪০০ নম্বর। আর গড়ে পেল ৮০ নম্বর বা যা আমরা বলে থাকি এচঅ. ৫.০০ অনুরুপভাবে, আরেকটি ছাত্র ইংরেজিতে পেল ৭৫ নম্বর, গণিতে পেল ৮৫ নম্বর, বাংলায় পেল ৯০ নম্বর, ধর্মে পেল ৬৫ নম্বর, বিজ্ঞানে পেল ৮৫ নম্বর। অর্থাৎ সেও সর্বমোট পেল ৪০০ নম্বর। আর গড়ে পেল ৮০ নম্বর বা যা আমরা বলে থাকি এচঅ. ৫.০০। এই পরিমানে ১ম ছাত্র গড়ে ৮০ নম্বর এবং ২য় ছাত্রও গড়ে ৮০ নম্বর পায় ও উভয়েই এচঅ. ৫.০০ পায়। এই হিসেবটা যেরকম পাঠক সমাজে খুব সোজা মনে হচ্ছে, ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনও মানব জাতিকে (নারী ও পুরুষকে) গড়ে সমান অধিকার দিয়েছেন। কিন্তু এই বিষয়টা কেহই লক্ষ্য না করে ইসলামকে অবমাননা করে পুরুষ যাহা করিবে, ঠিক তেমনিভাবে নারীরাও তাহা করিবে বলে প্রচার প্রসার করে থাকেন। কিন্তু একবার ভেবে দেখুন! আল্লাহ পাক কখনোই মানব জাতিকে (নারী ও পুরুষকে) কোন অধিকার থেকে বঞ্চিত করেন নাই। স্বাভাবিক ক্ষেত্রে দেখা যায় পুরুষগণ নারীদের চেয়ে অগ্রাধিকার পেয়েছে। না, তা নয়! বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় কোন ক্ষেত্রে পুরুষকে দিয়েছেন অগ্রাধিকার, আবার কোন ক্ষেত্রে নারীকে দিয়েছেন অগ্রাধিকার। অর্থাৎ উপরের হিসেব অনুযায়ী কখনো পুরুষকে বেশি অধিকার দিয়েছেন, আবার কখনো নারীকে বেশি অধিকার দিয়েছেন। তাই বলে কি নারী জাতিকে পুরুষ জাতি থেকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে? না, এটাতে ইসলামী বুদ্ধিহীন বুদ্ধি জীবিগণ সঠিক ভাষা ও সঠিক কথা সমাজে বুঝাতে কষ্ট পাচ্ছেন। সঠিক কথাটি হলো-নারী ও পুরুষকে আল্লাহ্ পাক গড়ে সমান অধিকার দিয়েছেন। যেমন পবিত্র কোরআনে সম্পত্তি বণ্ঠনের ক্ষেত্রে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-“দুই মেয়ের সমান এক ছেলে”। অর্থাৎ দুই মেয়ে পাবে অর্ধেক এবং এক ছেলে পাবে অর্ধেক। এখানে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখা যায় মেয়েরা পুরুষের সমান অধিকার পেল না। বরং পাওয়ার কথা ছিল এক মেয়ে অর্ধেক ও এক ছেলে অর্ধেক তা নয় কি? বিবেচনা করে দেখুন! নারী সমাজ বাবার সম্পত্তি থেকে কম পেলেও তারা তার স্বামীর সম্পত্তি থেকেও অংশ পেয়ে থাকে। যা পুরুষ পেয়েছে বাবার সম্পত্তি থেকে অর্ধেক এবং নারীরা বাবার সম্পত্তির পাশাপাশি স্বামীর সম্পত্তির অংশীদার হওয়াই তারাও পুরুষের মতো সম্পত্তির অর্ধেক অংশীদার হয় নাই কি? শিক্ষার ক্ষেত্রে বলা হয়- নারীদের অধিকারের কথা। এই শিক্ষা পুরুষ যেভাবে অধিকার পেয়েছে ঠিক সেই ভাবে নারীরও অধিকার রাসুল (স) দিয়ে গেছেন। যেমন হাদীস শরীফে এসেছে-“ইলমে দ্বীন শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ”। এখানেও তো শিক্ষার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমান অধিকার পেয়েছে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে, নারী জাতি শিক্ষা লাভ করে কি করবে? ঘরে বসে তালা-বাসন মাজা, ঘর পরিষ্কার করা ইত্যাদি করবে? পুরুষগণ যেভাবে চাকুরী করবে ঠিক সেইভাবে নারীরাও চাকুরী করবে। হ্যাঁ ঠিক! পুরুষগণ শিক্ষকতা করবে, নারীরাও পুরষের পাশাপাশি শিক্ষকতা করবে। তাই বলে কি পুরুষের পাশে নারীরও চেয়ারে বসে অধিকার পূর্ণ করবেন? না ঠিক তা নয়! শিক্ষামন্ত্রনালয় যদি ইসলামের প্রতি ভালবাসা থাকে তাহলে পুরুষ মহিলা একসাথে না করে উভয়ের জন্য আলাদা আলাদা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত করে পুরুষগন পুরুষ জাতিকে যেইভাবে শিক্ষা প্রদান করবে ঠিক সেইভাবে নারী জাতিকেও নারী শিক্ষিকাগণ শিক্ষা প্রদান করবেন। এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে, আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা (রা) রাসুলে আকরাম (স) ইন্তিকালের পর মহিলা সাহাবীর পাশাপাশি জলীলুল ক্বদর পুরুষ সাহাবীগণকে (রা) ও হাদীস শিক্ষা দিয়ে গেছেন।

বুখারী শরীফে একটি হাদীস আছে যে, হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলেন, এক ব্যক্তি রাসুল (স) এর দরবারে হাযির হয়ে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল (স)! আমার কাছে সর্বাপেক্ষা উত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিকারী কে? রাসুল (স) বললেন, তোমার মা। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, তারপর কে? রাসুল (স) বললেন, তোমার মা। লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে? রাসুল (স) বললেন, তোমার মা। লোকটি আবারও জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে? রাসুল (স) বললেন, তোমার বাবা। এখানে মাতা তথা নারীকে তিনগুণ অধিকার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখানেতো পুরুষকে একগুণ অধিকার দেওয়া হয়েছে। এখন নারী জাতি তাদের সমান অধিকার সম্পর্কে কি বলবেন? তবে এখানে পুরুষ জাতি মন খারাপ করার কিছুই নাই। কারণ, এই হাদীসে তিনগুণ অধিকার মহিলাদের দেওয়া হয়েছে বটে পুরুষকেও এই ক্ষেত্রে সমান অধিকার কোরআনে দেওয়া হয়েছে। যেমন- কোরআনে পাকের সূরা নিসায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, পুরুষগণ মহিলাদের উপর নেতৃত্ব দেবে। সূরা বাকারায় এসেছে, তারা (মহিলারা) তোমাদের পোষাক বা লেবাস স্বরুপ এবং তোমরাও (পুরুষগণ) তাদের (মহিলাদের) পোষাক বা লেবাস স্বরুপ। আল্লাহ পাক যদি নারী-পুরুষকে গড়ে সমান অধিকার না দিতেন তাহলে কেন এরুপ বলেছেন? এ আয়াতের সুযোগে অনেকে বলতে পারেন, তাহলে তো নারী-পুরুষকে সমান অধিকার দেওয়া হয়েছে বিধায় নারীগণ পুরুষের সঙ্গে মিলে মিশে ঘরে বাইরে কাজ করবে। না, এখানে এর অর্থ অন্যরুপ। জাহিলিয়াত যুগে নারীদেরকে ভোগ্য সামগ্রী হিসেবে মনে করতো তখনকার পুরুষরা। যে কোন সময় পুরুষরা নারীকে বাজার থেকে ক্রয় করে এনে ব্যবহার সহ নানান ধরনের নির্যাতন নিপীড়ন করায় আল্লাহ পাক নারী জাতিকে পুরুষের সমান অধিকার অর্থাৎ পুরুষগণ যেভাবে নারীকে ব্যবহার করছে তা জুলুমে পরিণত হওয়ায় পরুষগণকে বিবাহের বন্ধনের মাধ্যমে পুরুষ নারীকে আবার নারী পুরুষকে সমান চোখে দেখার বিধান করেছেন। এভাবে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স) নারী জাতিকে সম্মানের চুড়ায় দাঁড় করিয়ে গেছেন।

আরো বলতে পারেন যে, পুরুষরা সেজে গুজে স্বাধীনভাবে চলতে পারে। আমরা (নারী জাতি) কেন চলতে পারবো না? পুরুষগণতো পুরুষের সামনে সেজে গুজে যাওয়ার বিধান রয়েছে। ঠিক তেমনিভাবে নারীগণও সেজে গুজে অন্য নারীর সামনেও যাওয়ার বিধান রয়েছে। নারীগণ যেমন পর্দা করে রাস্তা ঘাঠে চলতে হয়, ঠিক তেমনিভাবে পুরুষগণও পর্দা করে চলতে হয়। প্রশ্ন আসতে পারে পুরুষগণ আবার পর্দা করবে কিভাবে? উত্তর হলো- যাদেরকে বিবাহ করা হারাম তাদের ব্যতিত অন্য কোন মহিলার সামনে যাওয়া (মিলে মিশে কাজ করা) সম্পূর্ণ হারাম। তারপরও যদি মহিলাগণ পুরুষের সামনে আসে তাহলে পুরুষও পর্দা করা তথা চক্ষু নি¤œগামী (সংযত) করা আবশ্যক এবং মহিলার সাথে পুরুষ কথা বলতে হলে উভয়েই পর্দার অন্তরালে থেকে কর্কশ কণ্ঠে কথা বলতে হবে। এটাই আল্লাহর দেয়া হুকুম। এই হুকুম বর্তমান সমাজে সক্রিয় না থাকায় নারী ধর্ষণ, নির্যাতন, ইভটেজিং সহ নানান ধরনের বিপদের সম্মুখীন হচ্ছে নারী সমাজ।

সর্বশেষ বলা যেতে পারে যে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই আল্লাহ পাক নারী-পুরুষকে গড়ে সমান অধিকার দিয়েছেন। উপরে কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করা হলেও আমাদের নিজেদের বিবেক কাটিয়ে দেখতে পারি আল্লাহ পাক আমাদেরকে কোনভাবে লোকসান করান নাই। বরং আমাদের মঙ্গলের কথাই আল্লাহ পাক চিন্তা করে ১৪০০ বৎসর পূর্বে কোরআন মাজীদ নাযিলের মাধ্যমে শান্তি প্রিয় সমাজ গঠনের মুখ্যম ভুমিকা পালন করেছেন। যদি প্রত্যেক জাতি, দেশ, সমাজ এই নীতিমালা অনুসরণ করে তাহলে আশা করা যায় নারী জাতি পুরুষের মাধ্যমে এবং পুরুষ জাতি নারী জাতির মাধ্যমে কোনো প্রকার ক্ষতির সম্মুখীন হবে না। আর আমরাও (পুরুষরাও) নারী জাতিকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত না করে কোরআন হাদীস মোতাবেক জীবন চলার সুযোগ দিলে নারীরাও কখনোই বিবাদে লিপ্ত হবে না বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্রে একটিই ক্ষুধা, আর তা হলো শান্তি। এই শান্তির জন্য ইসলামী জীবনের কোন বিকল্প হতে পারে না। তাই আসুন আমরা নারীদেরকে নারীর অধিকার ও পুরুষদেরকে পুরুষের অধিকার বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি! আল্লাহ পাক আমাদেরকে সঠিকভাবে সঠিক অধিকার আদায় করার তাওফিক দান করুন!

 

 

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/০৭-নভেম্বর২০১৭ইং/নোমান

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ