যে পাপের কারণে ধ্বংস হচ্ছে সমাজ

Muktijoddhar Kantho , Muktijoddhar Kantho
নভেম্বর ১০, ২০১৭ ১১:০২ পূর্বাহ্ণ

হাফেজ মাওলানা যুবায়ের আহমাদ।। ইদানীং ‘পরকীয়ার কারণে মৃত্যু’ বাক্যটি মিডিয়ায় বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। পরকীয়ার অদৃশ্য ফাঁদে আটকে আত্মহনন করছে অনেক নারী-পুরুষ। বাড়ছে আত্মহত্যা। নিষ্পাপ শিশুসন্তানকে হারাতে হচ্ছে মায়ের আদর। পরকীয়ার পথে সন্তান বাধা হওয়ায় সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করছে। কখনও নিজ সন্তানকে টুকরো টুকরো করে ফ্রিজে বস্তাবন্দি করে রাখছে। এর বলি হয়ে কখনও প্রেমিকাকে নিহত হতে হচ্ছে প্রেমিকের হাতে। ৯ অক্টোবর বনশ্রীতে জান্নাতুল বুশরাকে হত্যা করে তার স্বামী। ১২ অক্টোবর কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে রাকিব হোসনকে খুন করে তার স্ত্রী ও ছোট ভাই। ২১ অক্টোবর চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ফারুককে হত্যা করে তার স্ত্রী জেসমিন আক্তার। ২ নভেম্বর রাজধানীর বাড্ডায় পরকীয়ার কারণে নিজ স্বামী ও কন্যাকে হত্যা করে আরজিনা বেগম। কী নির্মম! পরকীয়াই স্নেহময়ী মা থেকে আরজিনাকে রাক্ষসীতে পরিণত করছে। পরকীয়ার কারণে বাড়ছে স্বামী-স্ত্রীতে অসন্তুষ্টি, পারিবারিক অশান্তি। ভেঙে যাচ্ছে সংসার।

কথিত অভিজাত পরিবারগুলোতে পরকীয়ার কারণে পুরুষের চেয়ে মহিলারাই তাদের স্বামীকে তালাক দিচ্ছেন, এমনটিই ঘটছে বেশি। ২০১৭ সালের ২৫ জুলাই দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায় মোট তালাকের ঘটনার ৬৮ দশমিক ১৯ শতাংশই হচ্ছে স্ত্রীদের পক্ষ থেকে। আর ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ হচ্ছে স্বামীদের পক্ষ থেকে। সে প্রতিবেদনেও পরকীয়াকে এর বড় একটি কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এখন আর নারী ‘স্বাধীনতা’র নামে মহাআনন্দে ‘পরকীয়াতে লজ্জার কিছু নেই’ এমন বক্তব্য প্রদানকারীদের সংযত হতেই হবে। কারণ এ পরকীয়াই আজ সমাজ ধ্বংসের কারণ।

সমাজের চালিকাশক্তি পরিবার ভাঙার বড় কারণ হলেও থেমে নেই পরকীয়া। ক্রমেই ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে। সহজলভ্য মুঠোফোন, অনলাইন চ্যাটিং, রাজধানীর পার্ক বা উদ্যানগুলোর নিরাপত্তা, ভারতীয় চ্যানেলের অবাধ অনুপ্রবেশ যেন পরকীয়াকে একধাপ এগিয়ে দিয়েছে।

এতকিছুর পরও কি আমরা এর লাগাম টেনে ধরতে উদাসীনতা প্রদর্শন করব? কী এর সমাধান? কীভারে বের হয়ে আসা যাবে পরকীয়া কিংবা অশ্লীলতার অভিষাপ থেকে? যেহেতু এহেন ভয়ংকর প্রবণতা মানুষকে স্বামী-স্ত্রী, সন্তান; এমনকি দেশ ত্যাগের মতো সীমালঙ্ঘনেও উৎসাহ দেয়, তাই ইসলাম একে কঠোর হস্তে দমন করতে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গোটা সমাজের অশান্তির কারণ হওয়ায় বিবাহিত পুরুষ কিংবা নারী যদি ব্যভিচার তথা পরকীয়ায় লিপ্ত হয়, তাহলে ইসলাম মৃত্যুদ- ঘোষণা করেছে। যেহেতু এর ক্ষতি ভয়ংকর, মারাত্মক ও তীব্র তাই ইসলাম এর জন্য কঠোর শাস্তি ঘোষণা করেছে।

বর্তমানে পরকীয়ার অধিকাংশ ঘটনার সূত্রপাত হচ্ছে ফোনালাপ কিংবা অনলাইন চ্যাটিং থেকে। অথচ ইসলামের নির্দেশনা মেনে মহিলাদের পুরুষের সঙ্গে, পুরুষের মহিলাদের সঙ্গে ফোনালাপের ক্ষেত্রে সংযত হলে এ সমস্যাটি মহামারী আকার ধারণ করত না। মহিলাদের কথার আওয়াজকেও সতরের অন্তর্ভুক্ত করে অপ্রয়োজনে পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করেছে। একান্ত প্রয়োজনে কথা বলতে হলেও সূরা আহজাবের ৩২নং আয়াতে পরপুরুষের সঙ্গে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলতেও নিষেধ করা হয়েছে। শুধু মহিলাদেরই নয়; বরং সূরা নূরের ৩০নং আয়াতে প্রথমে আল্লাহ তায়ালা পুরুষকে তাদের দৃষ্টি সংযত রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। আবার ৩১নং আয়াতে মহিলাকে তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখার পাশাপাশি তাদের গোপন শোভা অনাবৃত করতে নিষেধ করেছে। অপাত্রে সৌন্দর্য প্রদর্শনকে হারাম করে সবটুকু সৌন্দর্য স্বামীর জন্য নিবেদনে উৎসাহ প্রদান করেছে। কারণ স্বামী তার স্ত্রীর সৌন্দর্যে মোহিত হলে সংসারের শান্তিই বাড়বে। পক্ষান্তরে স্ত্রীর সৌন্দর্য দিয়ে অন্যকে মোহিত করার পথকে অবারিত করে দিলে তা শুধু বিপদই ডেকে আনবে। পুরুষ-মহিলা সবাইকে চরিত্র সংরক্ষণের নির্দেষ দিয়েছে ইসলাম।

সূরা বনি ইসলাইলের ৩২নং আয়াতে এরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যে-ও না।’ কাছেও যে-ও না মানে কী? যে জিনিস মানুষকে ব্যভিচারের নিকটবর্তী করে তার কাছে যেতেই নিষেধ করেছে। যেসব কাজ করলে মানুষ ব্যভিচারে ধাবিত হয়, সেসব কাজ করতেও নিষেধ করা হয়েছে। পরকীয়ার সূত্রপাত যদি ফোনালপে হয়, তাহলে সূরা বনি ইসরাইলে ৩২নং আয়াত এ ফোনালাপকেও হারাম করেছে। যে ব্যক্তি দুনিয়ার সামান্য অবৈধ ‘ভালোলাগা’কে নিয়ন্ত্রণ করে নিজের চরিত্রকে পরকীয়াসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজ থেকে হেফাজত করবে নবীজি (সা.) তার জন্য জান্নাতে জামিনদার হওয়ার ঘোষণা করেছেন। হজরত সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুখ ও লজ্জাস্থান হেফাজতের জামিনদার হবে আমি তার বেহেশতের জামিনদার হব।’ (বোখারি ও মুসলিম)।

কখনও দেখা যায় দেবরের সঙ্গে জমে ওঠে পরকীয়া। ইসলাম দেবরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করার লাগামকেও টেনে ধরেছে। হজরত উকবা ইবনে আমের (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সাবধান! তোমরা নির্জনে নারীদের কাছেও যে-ও না।’ এক আনসার সাহাবি বলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ দেবর সম্পর্কে আপনার নির্দেশ কী? নবীজি (সা.) বলেন ‘দেবর তো মৃত্যুর সমতুল্য।’ (বোখারি ও মুসলিম)।

হাদিসের ব্যাখ্যায় হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) ফাতহুল বারিতে লিখেছেন, এখানে মৃত্যুর সমতুল্য এর অর্থ হলো হারাম। পরকীয়ার মহামারী থেকে সমাজকে রক্ষা করতে ইসলামের দিকেই ফিরে যেতে হবে আমাদের। শান্তির জন্যই আল্লাহর ভয় অন্তরে এনে নিজের অনৈতিকতা থেকে নিজেকে হাজার মাইল দূরে রাখতে হবে। পার্ক, ফাইভস্টার হোটেল, নাইট ক্লাব কিংবা বিনোদন কেন্দ্রগুলোর লাগাম টেনে ধরতে হবে। সর্বত্র শালীন পোশাক পরিধানে বাধ্য করতে হবে। সামাজিক বিপর্যয় থেকে বাঁচতে হলে বিদেশি চ্যানেল ও বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এখনই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ‘আধুনিকতা’র নামে এখানের এ ব্যাপারে উদাসীনতা প্রদর্শন করলে হয়তো আরও কঠিন মূল্য দিতে হবে এ সমাজকে।

লেখক: জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ক্বারি; ডেইলি সান ও কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন ইংরেজি ও বাংলা জাতীয় দৈনিকের নিয়মিত কলামিস্ট।

 

 

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/১০-নভেম্বর২০১৭ইং/নোমান

Leave A Reply

Your email address will not be published.

সর্বশেষ পাওয়া