ইভটিজিং প্রতিরোধে আমাদের করণীয়

মাওলানা আরিফুল কাদের।। আমাদের সমাজে যে কত গুলো সমস্যা রয়েছে, এর মধ্যে অন্যতম (গধলড়ৎ ঢ়ৎড়নষবস) হচ্ছে ইভটেজিং। যে সমস্যায় জর্জরিত হয়ে অসংখ্য নারী নিজের জীবন নিজে বিলিয়ে দিতে অর্থাৎ আত্মহত্যা নামক কঠিন গোনাহে লিপ্ত হয়ে প্রাণ বিসর্জন দিতে শুরু করছে। সমাজে দূর্বল শ্রেণির মানুষ এই দাবানলে পুড়ে চারখার হচ্ছে। কি করবে? কোথায় যাবে তারা? কারণ, সমাজের উঁচু শ্রেণির (শক্তিশালী মানুষ) হুমকির মুখে পড়ে না পারে কাউকে বলতে! না পাড়ে আইনের আশ্রয় নিতে। ২০১০ সনের এক জরীপে জানা গেছে যে, জানুয়ারী থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৩,০০০ (তের হাজার) নারী ইভটেজিংয়ের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। বাস্তবিকই সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ এবং এর প্রতিবেশী দেশসমূহ এই উৎপাতের কারণে বিব্রত। এটা ঐ সকল মানুষের এক ভুল মানসিকতা নির্দেশ করে যারা মহিলাদের মর্যাদার প্রতি সম্মানজনক ধারণা পোষণ করে না। ইভটেজিং মহিলাদের জন্য এক মর্মবিদারক অভিজ্ঞতা। এটা একটা গভীর মনস্তাত্তিক ক্ষত রেখে যায়, যা প্রশমিত করা কঠিন। ইভটেজিং মহিলাদের জীবনে অনেক দুঃখজনক ঘঠনা ঘঠিয়েছে। বিভ্রান্ত মাতা পিতা তাদের মেয়েদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিয়ে উদ্ধিগ্ন হয় যা তাদের জীবনকে প্রকৃত অর্থে ধ্বংস করে দিতে পারে। ইভটেজিংয়ে ভুক্ত ভোগীরাই বুঝে ইভটেজিংয়ে কি জ্বালা। নিজে কিছু করতে না পেরে অসহায়ত্ব, রাগ ও মানসিক হতাশা অনুভব করে। এই ইভটেজিংয়ের কারণে নারী সমাজকে শিক্ষা-দিক্ষা, চলা-ফেরা, উঠা-বসা সব ক্ষেত্রেই বাধাগ্রস্থ করে। এই মহা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে শুধু সরকারকে নয় বরং সাধারণ জনগণও সচেতন থেকে সমাধান করতে হবে। নতুবা, নারী জাতির এই অসহায়ত্ব, দূর্বল আত্মা আমাদের সমাজের মানুষের জন্য এক অভিশাপ হয়ে দাড়াবে। নারী জাতি এবং তার সতিত্ব আমাদের নিকট এক মহা আমানত স্বরুপ। এই আমানতের খেয়ানত করলে দুনিয়াসহ পরকালের শাস্তি অনিবার্য। নারী জাতি যেই রকম আমাদের কাছে এক মহা আমনত তেমনিভাবে নারী জাতিও এই আমনত রক্ষা করা কর্তব্য হয়ে পড়ে। ইভটেজিং বন্ধে সরকার মহল সহ সাধারণ জনগণের কিছু ভুমিকা পালন আবশ্যক। যাহা নি¤েœ উল্লেখ করা হলোÑ

১. ইসলামী নিয়ম-কানুন মেনে চলা। অর্থাৎ সমাজে যে কারণে ইভটেজিং হয় তার মধ্যে অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে ইসলামী নিয়ম-কানুন মেনে না চলা বা বেপর্দায় ঘুড়ে বেড়ানো। এই পর্দা শুধু মাত্র বাহিরে বাহির হওয়ার সময় নয় বরং নিজ বাড়িতেও মুহাররাম (যাদের সাথে বিবাহ হারাম) ব্যতীত অন্য কারো সামনে বেপর্দায় চলা ফেরা, হাসি ঠাট্টা, খেয়াল তামাশা করা থেকে বিরত থাকা। কারণ, নারী পুরুষ উভয় জাতির মধ্যে আল্লাহ পাক এমন হরমোন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যার কারণে বিপরীত লিঙ্গকে আকৃষ্ট করে বসে। তাই নারীদের যেমনভাবে পর্দা করা আবশ্যক ঠিক তেমনিভাবে পুরুষও নারীদের প্রতি কু-দৃষ্টি থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। সুতরাং পরিবারের কর্তার উচিত মেয়ে বালিগা (মিন্সষ্ট্রুয়েশান হলে) হলে তাহাকে পর্দার ব্যবস্থা করা। নতুবা, দুনিয়াতে হবে বাবা মার জন্য তার মেয়ে এক ধরণের কলংকের বুঝা এবং পরকালেও দিতে হবে আল্লাহর সামনে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে জবাব। দুনিয়াতেও হবে লাঞ্চিত অপদস্ত এবং পরকালেও হবে কোটি কোটি জনতার সামনে লাঞ্চিত অপদস্ত। কেননা, কোরআনে পাকে এসেছে, হে ঈমানদারগণ তোমরা নিজে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচ এবং তোমার পরিবার পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও।

২. ইসলামী পোষাক-আষাক পরিধান করা। আমাদের সমাজে দেখা যায় মহিলারা এমন সব পোষাক পরিধান করে যাতে তাহাদের শরীরের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ উন্মুক্ত হয়ে যায়। যার কারণে যুবক ছেলেরা হরমোনের কারণে, শয়তানের তারণায় তাদের (মেয়েদের) দিকে কু-দৃষ্টি পড়ায় যুবকরা মুখে শিশ দেয়, আপত্তিকর কথা বলে, প্রেম প্রস্তাব দেয় এবং নানা ভাবে নারী সমাজকে উত্যক্ত করে বসে। তাই মহিলাগণ এমন সব পোষাক পরিধান করবেন যাতে তাদের আপত্তিকর অঙ্গ উন্মুক্ত না হয়। অর্থাৎ ঢিলে-ঢালা পোষাক পরিধান করা। নতুবা, যত শাস্তি দেয়া হোক না কেন কিয়ামত পর্যন্ত এই ইভটেজিং বন্ধ করা সম্ভব হবে না। আমাদের সমাজে এমন সব বোরকা বাহির হয়েছে যার কারণে মহিলাদের শরীর অবয়ব দেখা যায় বা ফ্যাশণ বলা যেতে পারে। তাতেতো সওয়াব হবেইনা বরং যিনার গুনাহ তার (নারীর/পুরুষের) আমলনামায় উঠবে। বোরকা পরিধান করার বিধান হলো এক কালার ঢিলে ঢালা এবং যেন আকর্ষনীয় না হয়। এটা বাবা মা/স¦ামীর অবশ্য কর্তব্য।

৩. গায়রে মুহাররামগণের (যাদের সাথে বিবাহ জায়েজ) সাথে কর্কশ কণ্ঠে কথা বলা। মহিলাদের কণ্ঠেও এক প্রকার আকর্ষণ রয়েছে। যা কোরআন, হাদীস এবং মুজতাহিদগণ বর্ণনা দিয়েছেন। মেডিক্যাল সাইন্সের মতে, একটা মেয়ের বয়স যখন ৯ থেকে ১৩ বৎসর হয়। তখন তার মাসিক ঋতু¯্রাব শুরু হয় এবং তার কণ্ঠ চিকন ও আকর্ষনীয় হতে থাকে। আর একটা ছেলের কণ্ঠ যখন মোটা হয় তখন বুঝতে হবে এই ছেলেটা বালেগ হয়েছে। তাই এই সময় মহিলা পুরুষ থেকে এবং পুরুষ মহিলা থেকে সতর্ক থাকতে হবে। কথা-বার্তা বলতে হলে সু-কণ্ঠে নয় বরং স্বাভাবিক কণ্ঠ হতে একটু অস্বাভাবিকভাবে কথা বলা উচিত। নতুবা এই কণ্ঠস্বরেও বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষিত করে তুলে। যার কারণে এই মেয়ের সুমিষ্ট কথা শুনতে যুবক ও বখাটে ছেলেরা এমনকি একটি ভাল ছেলেও উৎপেতে বসে থাকে। যা ইভটেজিংয়ের অন্যতম কারণ বলতে পারি।

৪. ছায়াছবি, নাটক, গান (যে গানে মহিলাদের শরীরের বর্ণনা উল্লেখ করা হয় বা অবৈধ ভালবাসা সৃষ্টি করার সম্ভাবনা রয়েছে), নৃত্য ও পর্নো ছবি দেখা এবং দেখানো হতে বিরত রাখা। কারণ, ছায়াছবি, নাটক, গানে এমন কিছু অশ্লীল দৃশ্য সৃষ্টি করে যা দেখে যুবক যুবতিরা কোন ক্রমেই শান্ত থাকতে না পেরে অবৈধ কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য হয় এবং যুবক যুবতিকে প্রেমের প্রস্তাব দিলে মেয়েটি তা প্রত্যাখ্যান করায় যুবক ছেলেরা তাদের বন্ধু-বান্ধকে নিয়ে রাস্তায় বসে থেকে ঐ মেয়েকে উত্যক্ত করার পাশাপাশি লাঞ্চিত করার খবরও পাওয়া যায়। শুধুকি মেয়েদেরকে ছেলেরা উত্যক্ত করে? না, মেয়েরাও অনেক ক্ষেত্রে ছেলেদেরকে উত্যক্ত করে যার কারণে ছেলেরা মোবাইলের সীম পাল্টানোর খবর ও পাওয়া যায়। এবার পর্নো ছবির প্রসঙ্গে আসলে বলতে হয় যে, এ ছবি দেখে যুবক কেন; একজন ৫০ বৎসর বয়সি লোকও শান্ত থাকাটা কঠিন হয়ে পরে। ইমাম গাজ্জালী (রহ) তাঁর ইয়াহইয়ায়ে উলুমুদ্দিনে বর্ণনা করেছেন যে, দুইটি কারণে মানুষের চক্ষুর জ্যাতি নষ্ট হওয়ার আশংকা রয়েছে। (১) মহিলাদের লজ্জাস্থানের দিকে থাকিয়ে থাকলে এবং (২) কা’বা শরীফকে পিছনে রেখে বসলে। তাহলে বুঝা গেল যে, পর্নো ছবিতে মহিলাদের দৈহিক অঙ্গ সহ লজ্জাস্থান দেখার ফলে দৃষ্টি খর্ব হওয়ার পাশাপাশি মারাত্মক ধরণের অসুস্থতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই অবিভাবকগণের উচিৎ তাদের সন্তানেরা যেন এই রকম অশ্লীল ভিডিও দেখা বা দেখানো থেকে বিরত থাকে। আর আমরা সাধারণ জনগণের পাশাপাশি সরকারও এ সাইট গুলি বন্ধের উদ্যেগ নেওয়ার জন্য আলেম সমাজের তথা বাংলাদেশের মুসলমানদের পক্ষ থেকে আকুল আবেদন জানাচ্ছি।

৫. বেকারত্বও আমাদের সমাজকে কুলষিত করছে। ছেলেরা বেকার বসে থেকে কোন কাজ না পাওয়াতে এ রকমভাবে মেয়েদেরকে উত্যক্ত ছাড়া তারা আর কি করতে পারে? বেকারত্ব দূর করতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি আমাদেরকেও উৎসাহী হওয়া উচিৎ। সব বুঝা শুধু সরকারের ঘাড়ে চাপালে বোকামি ছাড়া আর কি হতে পারে? সরকারতো চান তাঁর রাষ্ট্রের চাহিদা পুরণ করতে। এই সীমিত আসনে সকল জনগণের চাকুরীর ব্যবস্থা করা অনেক কঠিন হয়। তাই অবিভাবকগণ তাদের ছেলেদের জন্য সরকারী, বেসরকারী, এনজিও চাকুরী বা নিজস্ব ব্যবসার ব্যবস্থা করলে আশা করতে পারি এই সোনার মানিক ছেলেগুলো আর এই রকম কাজে যোগ দেওয়ার সময় পাবে না।

৬. শাস্তি ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা। আমাদের বাংলাদেশে ইভটেজিংয়ের সহজ ও সাধারণ শাস্তি হলো এক থেকে ছয় মাস কারাদন্ড। গ্রামের মানুষে কথায় বলে থাকে যে, “জেলে ঢুকে ছোর হয়ে, আর বাহির হয় ডাকাত হয়ে”। কথাটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পাঠক বিবেকের নিকট ছেড়ে দিলাম। ইভটেজিংয়ের শাস্তি ছয় মাসের কারাদন্ড না দিয়ে কোরআন ও হাদীস মোতাবেক শাস্তির ব্যবস্থা যদি আমাদের বাংলাদেশ সরকার বাস্তবায়ন করেন এবং প্রতিটি জেলায় বাস্তবায়ন করার অনুমতি দেন। তাহলে আমার ১০০% বিশ্বাস এই ইভটেজিং বন্ধ হবেই। এই বিচার ব্যবস্থার নিয়ম হলো বিশাল জনসম্মুখে বিচার কাজ সম্পন্ন করা; সে যেই হোক না কেন? যেমন বলা যায়, ঢাকার ইভটেজার হলে গুলিস্তান শাস্তি দেবে, ময়মনসিংহের ইভটেজার হলে ব্রিজের পশ্চিম পার্শে পাট গুদাম মসজিদের সামনে, কিশোরগঞ্জের ইভটেজার হলে পুরানথানা শহিদী মসজিদের সামনে বিচার কাজ সম্পন্ন করা উচিত। যেন সকলেই দেখে বলে হায়! ইভটেজিং করলে এমন শাস্তি হয়! তবে শর্ত হলো ১ম, ২য়, ৩য় এবং ৪র্থ কলামটি। আর বিচার কাজ সম্পন্ন করবেন প্রত্যেক জেলার জেলা প্রশাসক বা সেন্টার মসজিদের খতিব মহোদয় সরকারের দেওয়া বিধান অনুযায়ী।

সর্বশেষ বলতে পারি যে, ইভটেজিং আমাদের সমাজে মারাত্মক ব্যাধি হওয়ায় আশা করি সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিবেন এবং জনসাধারণ ও এ সকল কাজ যেন সমাজে না হতে পারে অর্থাৎ আপনার ছেলে, নাতি, ভাই, ভাইস্তা, ভাগ্নে এবং কোন আত্মীয়সজন যেন এ কাজ করতে না পারে সে বিষয়ে অবশ্যই পদক্ষেপ নিবেন। কারণ, নারী জাতি হলো আমাদের মা-বোন স্বরুপ। তারা যদি অপমানিত হয় গোটা জাতিরই কলংক বয়ে আনবে। আপনার সামনে যদি আপনার মেয়ে, নাতনী, ভাগ্নী, ভাস্তীকে কোন ছেলে উত্যক্ত করে আপনার কাছে যে রকম কষ্ট মনে হবে। ঠিক তদ্রুপ অন্য মা বোনদের প্রতিও লক্ষ্য রাখা আমাদের অবশ্য কর্তব্য। তাই আমি ঐ সকল দূর্বল অবিভাবকদের পক্ষ হতে আকুল আবেদন জানাচ্ছি যে, মেয়েদের সম্মানের প্রতি লক্ষ্য রেখে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিবেন বলে আমার আত্মবিশ্বাস। আল্লাহ আমাদের বুঝার তাওফিক দান করুন!

 

 

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/১৭-নভেম্বর২০১৭ইং/নোমান

Comments are closed.