যেভাবে ইসলাম নারীর অধিকার নিশ্চিত করেছে

Muktijoddhar Kantho , Muktijoddhar Kantho
নভেম্বর ১৭, ২০১৭ ১২:০১ অপরাহ্ণ

হাফেজ মাওলানা যুবায়ের আহমাদ।। সমাজ গঠনে নারী-পুরুষ একে অন্যের অনিবার্য পরিপুরক। পুরুষ রাত-দিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে জীবিকার তাগিদে ছুটে বেড়ায় দিক-দিগন্তে। স্ত্রী মনের মাধুরী দিয়ে ঘর সাজায়, রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়। সন্তানকে মামতায় গড়ে তোলে আদর্শ আগামী প্রজন্ম উপহার দেয়ার মহান দায়িত্ব পালন করে স্ত্রী। কিন্তু নারীর এ অবদানের স্বীকৃতি ছিল না ইসলামপূর্ব সময়ে। পরিবার, সমাজ এমনকি ইসলামপূর্ব ধর্মও যখন নারীকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতিটুকুও দেয়নি; দেখেছে কেবলই ভোগের বস্তু হিসেবে সে চরম সংকটকালেই নারীমুক্তির বারতা নিয়ে হাজির হলেন হজরত মুহাম্মাদ (সা.)। সৃষ্টিগত দূর্বলতাকে পুঁজি করে নারীর ওপর বয়ে যাওয়া নির্যাতনের অপ্রতিরোধ্য সাইক্লোন থামিয়ে দিলেন কঠোর হস্তে। নির্যাতনের উত্তাল সাগরের ঢেউ থামিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন শাস্বত নারী অধিকার। আলোর মশালে আলোকিত করলেন গোটা নারীজগত। দিলেন ন্যায় ও ইনসাফের অধিকার। ক্ষেত্রবিশেষে দিলেন পুরুষের চেয়ে বেশি অধিকার।

ইসলামের আগে নারীকে বিবেচনা করা হতো অভিশাপ হিসেবে। ইংল্যান্ডে ডাইনি বলে নারীকে পুড়িয়ে মারার আইন রদ করা হয় ১৭৩৬ সালে। অথচ ইসলাম কন্যা সন্তানকে অভিহিত করেছে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে। কন্যাসন্তানকে ঘোষণা করেছে জান্নাতের কারণ হিসেবে। নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তিনটি কন্যা সন্তান লালন-পালন করেছে, পুত্র সন্তানকে কন্যাদের ওপর প্রাধান্য দেয়নি, তাদেরকে উত্তম আদশ শিক্ষা দিয়েছে, তাদেরকে বিয়ে দিয়েছে, তাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করেছে, , সে জান্নাত লাভ করবে।’ (আবু দাউদ: ৫১৪৯)। নারীর সম্পত্তি রাখার অধিকার ছিল না। হিন্দু নারীরা আজো বঞ্চিত উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে। ১৮৮২ সলের দগধৎৎরবফ ডড়সবহ্#৩৯;ং চৎড়ঢ়বৎঃু অপঃ ১৮৮২’ এর পূর্বে বৃটিশ আইনে নারীর সম্পত্তিতে ছিল না কোনো অধিকার। বিবাহপূর্ব সময়ে নারীর উপার্জিত সম্পদের মালিকানা বিয়ের সঙ্গে সঙ্গেই চলে যেত তার স্বামীর হাতে। (উইকিপিডিয়া, এনসাইক্লোপিডিয়া)। জার্মানী নারীদের ১৯০০ সাল, সুইস নারীদের ১৯০৭, অষ্ট্রেলীয় নারীদের ১৯১৯ সালের আগে ছিল না কোনো উত্তরাধিকার সম্পত্তি। অথচ ইসলামের নবী, বিশ্বমানবতার পরম বন্ধু হজরত মুহাম্মাদ (সা.) ‘সভ্য পৃথিবীর’ও ১৩০০ বছর আগে মরুভূমির প্রান্তে দাঁড়িয়ে উত্তরাধিকারসহ সম্পত্তিতে নারীর অধিকারের কথা ঘোষণা করেছিলেন দীপ্তকণ্ঠে। একজন পূর্ণ বয়স্ক মুসলিম নারী, তিনি বিবাহিত হন বা নাই হন, কারো সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই সম্পদের মালিক হতে পারেন, মালিকানা হস্তান্তরও করতে পারেন। এ সংক্রান্ত পবিত্র কোরআনের আয়াত মানবতার কাছে পৌঁছে দেন তিনি। আল্লাহ বলেন, ‘পুরুষ যা অর্জন করে সেটা তার অংশ এবং নারী যা অর্জণ করে সেটা তার অংশ।… ।’ (সুরা নিসা : ৩২)। রয়েছে তার মাতাপিতার পরিত্যক্ত স্পত্তিতে ন্যয়সঙ্গত অধিকার।

ইসলামপূর্ব সমাজে যৌতুকে অভিষাপ থাকলেও ইসলামে যৌতুক নামে কোনো কালো অধ্যায় নেই। অধিকন্তু বিয়েতে যৌতুকের সম্পূর্ণ উল্টো ব্যবস্থা করেছে ইসলাম। নারীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুরুষদের কষ্টর্জিত অর্থ বিয়েতে বাধ্যতামূলকভাবে তুলে দিতে হয় নারীর হাতে। স্বামীর চিতায় স্ত্রীকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার নির্মম আইন ছিল হিন্দু ধর্মে। রাজা রামমোহন রায়ের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ১৮২৯ সালে হিন্দু নারীদের স্বামীর সঙ্গে পৃড়িয়ে মারা নিষিদ্ধ হয়। মুসলিম নারীদেরকে তাদের স্বামীর সঙ্গে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার কোনো বিধান ছিলো না বলেই এর বিরোদ্ধে আন্দোলনের প্রয়োজনও হয়নি। ইসলামের আলো যেখানে ছিল না সেখানে বিধবাদের দেখা হতো অসম্মানের চোখে। এই তো সেদিনও ভারতীয় উপমহাদেশেও বিধবাদের বিয়ে করা বৈধ ছিল না। ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ১৮৫৬ সালে আইনগতভাবে বিধবাবিবাহ সিদ্ধ হয়। কিন্তু এরও বারো শত ৬০ বছর আগে মহান সংস্কারক আমাদের প্রিয়নবী (সা.) নিজে খাদিজা নামের ৪০ বছর বয়স্কা একজন বিধবাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে বিধবাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। খাদিজা (রা.) ও আয়েশাসহ (রা.) স্ত্রীদের তিনি যেভাবে ভালোবাসতেন, কন্যা হজরত ফাতেমাকে (রা.) যেভাবে স্নেহ করতেন তা পৃথিবীতে বিরল। বেগম রোকেয়া সুন্দর বলেছেন, ‘জগতে যখনই মানুষ বেশি অত্যাচার অনাচার করিয়াছে, তখনই এক- একজন পয়গম্বর আসিয়া দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করিয়াছেন।

আরবে স্ত্রী জাতির প্রতি অধিক অত্যাচার হইতেছিল; আরববাসীগণ কন্যা হত্যা করিতেছিল। তখন হযরত মুহাম্মদ কন্যাকুলের রক্ষকস্বরূপ দন্ডায়মান হইয়াছিলেন। তিনি কেবল বিবিধ ব্যবস্থা দিয়েই ক্ষান্ত থাকেন নাই, স্বয়ং কন্যা পালন করিয়া আদর্শ দেখাইয়াছেন। তাহার জীবন ফাতেমাময় করিয়া দেখাইয়াছেন-কন্য কিরূপ আদরণীয়া। সে আদর, সে স্নেহ জগতে অতুল। আহা! তিনি নাই বলিয়া আমাদের এ দূর্দশা।’ (অর্ধাঙ্গী, মতিচুর, প্রথম খন্ড-৪৮)।

বিশ্ব মানবতার পরম বন্ধু হজরত মুহাম্মাদ (সা.) যেমন নারীর অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন, তেমনি প্রতিষ্ঠা করেছেন নারীর সামাজিক নিরাপত্তা। কখনো মা হিসেবে, কখনো কন্যা হিসেবে, কখনো স্ত্রী হিসেবে তাকে মর্যাদার আসনে আসীন করেছেন। পৃথিবীর যত নারীই নবীজির এ অধিকার প্রতিষ্ঠাকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে দেখেছে, তারাই ইসলাম গ্রহণ করে ইসলামের মধ্যেই তাদের সবটুকু চাওয়াকে পাওয়ায় পরিণত করার চেষ্টায় সফল হয়েছেন। নোবেল পুরস্কারের তালিকায় ওঠা পৃথিবীবিখ্যাত কবি ও লেখিকা কমলা দাস ইসলাম গ্রহণ করে হয়ে যান কমলা সুরাইয়া। ড. কমলা সুরাইয়াকে প্রশ্ন করা হয়েছিল- ‘মানুষ মনে করে আপনার ইসলামগ্রহণের পেছনে একজন পুরুষের হাত রয়েছে। কমলা দাস বলেছিলেন- ‘অবশ্যই! ঠিকই শুনেছেন। আমার মুসলামান হওয়ার পেছনে অবশ্যই একজন পুরুষের হাত রয়েছে। তিনি হলেন হজরত মুহাম¥াদ (সা.)। তাঁর কারণেই আমি আজ মুসলমান। এই মহামানবের শিক্ষাই আমার জীবন বদলে দিয়েছে।’ (নওমুসলিমদের ইমানজাগানিয়া সাক্ষাৎকার- ৪: ৩৭৯)।

সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী ছিলেন খাদিজা নামে একজন জ্ঞানী ও সম্ভ্রান্ত নারী। নারীর প্রতি নবীজি (সা.) যে সম্মান দিয়েছেন, তা দেখে ইসলামের দাওয়াত প্রদানের দেয়ার আগেই যিনি স্বতস্ফুর্তভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আজও পৃথিবীর শান্তিকামী নারীদের মিছিল ছুটছে
ইসলামের দিকেই। ভারতের রাষ্ট্রীয় অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত তামিল অভিনেত্রী মনকিা আলী ইসলামের সৌন্দর্যের কাছে হার মেনে নিজেকে মাথায় হিজাব পরে হয়ে যান এমজি রহিমা। তিনি বলেন, ‘কাউকে ভালোবাসা বা অর্থের লোভে আমি ইসলাম গ্রহণ করিনি, ইসলামের মৌলিক নীতিকে পছন্দ করেই এর সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছি’। (টাইমস অব ইন্ডিয়া: ৩১ মে ২০১৪)। ব্রিটিশ মডেল কারলি ওয়াটসের পরনেও বোরকা উঠেছে একইভাবে। ফরাসি সঙ্গীত শিল্পী দিয়ামস, মার্কিন চিকিৎসক ডা. ইউ এস অরিভিয়ার মতো হাজারো নারী আজ ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিয়েই নিজেদের ধন্য মনে করছেন।

 

লেখক: জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ক্বারি; ডেইলি সান ও কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন ইংরেজি ও বাংলা জাতীয় দৈনিকের নিয়মিত কলামিস্ট।

 

 

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/১৭-নভেম্বর২০১৭ইং/নোমান

Comments are closed.