দারিদ্রতা বিমোচনের হাতিয়ার : যাকাত

মাওলানা এস. এম. আরিফুল কাদের।। ইসলাম ধর্ম ৫টি ভিত্তির উপর স্থাপিত। এগুলোর মধ্যে অন্যতম ভিত্তি হল যাকাত। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ধনীদের সম্পদের উপর গরিবের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ধনী-গরিবের সেতু বন্ধনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাকাত কিন্তু গরিবের জন্য কোন ধরণের দয়া প্রদর্শন নয়। বরং এটি যাকাত প্রাপ্ত ব্যক্তিকে পরিশোধ না করা পর্যন্ত তার ধন-সম্পত্তি পাক-পবিত্র হয় না। যাকাত প্রাপ্তিতে ধনীদের প্রতি গরিবের দাবি রয়েছে। কারণ ইসলাম ধর্মমতে, সবার মধ্যে সামঞ্জস্যতা বজায়ে এর গূরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রয়েছে। পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদের মালিক মহান আল্লাহ তা’য়ালা। তিনি এর সবকিছু মানুষের কল্যাণে সৃষ্টি করে মানগোষ্ঠির জন্যই ভোগ-ব্যবহারের উপযোগী করেছেন। আল্লাহর সৃষ্ট সম্পদে সকলের ভোগের অধিকার থাকা সত্ত্বেও তা এমনিতেই প্রত্যেকের নিকট পৌঁছে যায় না। প্রয়োজন নিজের চেষ্টা ও শ্রমের। যেমন- কুরআনে পাকে এসেছে “কোন মানুষই চেষ্টা ও শ্রম ব্যতীত কোন কিছু লাভ করতে পারে না”।(সূরা আন্ নাজম;৩৯) তাই ভোগের জন্য নিজের বা অন্য কারো উপার্জন করা জরুরি। প্রকৃতির স্বাভাবিক এ নিয়মে আল্লাহর অফুরন্ত ভান্ডার হতে সম্পদ বণ্টন হয়ে সকলের নিকট পৌঁছে যাচ্ছে। এ নিয়মে সম্পদ অর্জনের জন্য মানবজাতির শ্রম, মেধা, যোগ্যতা এবং দক্ষতার বিনিয়োগ জরুরি। কিন্তু সকলের সামর্থ্য, মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতা সমান না হওয়ায় প্রকৃতির ভান্ডার হতে সকলে সমপরিমাণ বা প্রত্যেকে তার প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ অর্জন করতে সব সময় সামর্থ্য হয় না। উল্লেখিত কারণে মানুষের তারতম্যে সম্পদ উপার্জনেও তারতম্য সূচিত হয়। যার কারণে কিছু মানুষ তাদের প্রয়োজনের তুলনায় অধিক সম্পদ অর্জনে সক্ষম হয়। অপরদিকে আরেক শ্রেণির মানুষ তার প্রয়োজন পূরণের জন্য যা জরুরি তাও আহরণ করতে ব্যর্থ হয়। অধিকন্তু ইয়াতিম বালক-বালিকা, বয়সের ভারে বৃদ্ধ, বিধবা মহিলা, অন্ধ, অসুস্থ, শারীরিক প্রতিবন্ধী যারা কাজ করতে সক্ষম ব্যক্তি। কিন্তু জীবিকা উপার্জনের ক্ষেত্রে কোন কাজ না পাওয়ায় নিজের ও পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণের জন্য যথেষ্ট অর্থ উপার্জনে অক্ষম, এ সকল অসহায় লোকদের কি অবস্থা হবে? তাই আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন যাদের অতিরিক্ত সম্পদ আছে, তাদের সম্পদে গরিব ও বঞ্চিত শ্রেণির জন্য সুনির্দিষ্ট হক নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আল্লাহর বানী- “আর তাদের সম্পদে অভাবী ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে”। (সূরা আয্যারিয়াত : ১৯)

এ হক আদায় করাকে ক্ষেত্র বিশেষ আবশ্যক করে দিয়েছে। যেমন- যাকাত, ফিতরা ও সদকাহ ইত্যাদি। আর এ হক ব্যবস্থার মূল কথা হলো, যাদের প্রয়োজনের তুলনায় অধিক সম্পদ রয়েছে, তাদের উক্ত সম্পত্তি হতে বিশেষ একটি অংশ দান করতে হবে। আর যাদের প্রয়োজন পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ নেই, ধনীদের প্রদত্ত সম্পদ দ্বারা তাদের প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। যাকাতের উপযুক্ত ব্যক্তিবর্গ যাকাত না দিলে সমাজে ক্ষুধা, বৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। যার কারণে সমাজে হাহাকার সৃষ্টি হয়ে সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। যেমন- বিশ্বনবী (স) ইরশাদ করেন, যাকাত কোন সম্পদের সাথে মিশ্রিত হয় না বরং তা তাহাকে (সম্পদকে) ধ্বংস করে দেয়। (মিশকাতুল মাছাবীহ; কিতাবুয যাকাত)

রাসুল (স) আরো ইরশাদ ফরমান, যে ব্যক্তি যাকাত খাওয়ার যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও তা গ্রহণ করে; নিজের সম্পদের সাথে মিশ্রিত করে নেয়, যাকাতের সম্পদের সাথে তাদের সম্পদের মিশ্রিত থেকে তাদের সম্পদকে ধ্বংস করে দেয়। আরো ইরশাদ হচ্ছে- যে লোকেরা যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানাবে, আল্লাহ তাদের কঠিন ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষে নিপতিত করবেন। (তাবরানী, হাকেম ও বায়হাকী)

এর ফলে অনাবৃষ্টি হয়েও কেবল জন্তু জানোয়ারদের কারণেই সামান্য বৃষ্টি হয়ে থাকে। ( প্রাগুক্ত, ইবনে মাজাহ, বাজ্জার ও বায়হাকী) উপরোক্ত হাদীসগুলির প্রেক্ষিতে সরাসরি বুঝা যায় যে, যাকাত প্রদানে উপযুক্ত ব্যক্তি যাকাত না দেওয়ার কারণে সমাজে দারিদ্রতার প্রভাব পড়ে। যার কারণে অভাবের তাড়নায় তারা সমাজর বিভিন্ন খারাপ কাজে লিপ্ত হতে কুণ্ঠবোধ করেনি। তাই দারিদ্রতা বিমোচনে যাকাতের ভুমিকা অতিব গুরুত্বপূর্ণ। সমাজ থেকে দারিদ্রতা দুরীকরণে নি¤œ লিখিত খাত সমূহে যাকাত প্রদান করতে হয়।

১ম খাত : ফকীর :- ফকীর হলো সেই ব্যক্তি যার নিছাব পরিমাণ সম্পদ নেই। অর্থাৎ যে ব্যক্তি রিক্ত হস্ত, অভবি মেটানোর যোগ্য সম্পদ নেই, ভিক্ষুক হোক বা না হোক, এরাই ফকীর। যে সকল সামর্থ্যের দরিদ্র মুসলমান যথাসাধ্য চেষ্টা করা সত্ত্বেও বা দৈহিক অক্ষমতা হেতু প্রত্যাহিক ন্যায় সংঘত প্রয়োজনটুকু মেটাতে পারে না, তারাই ফকীর। তাদেরকে যাকাত প্রদানের মাধ্যমে দারিদ্রতা বিমোচন সম্ভব।

২য় খাত : মিসকীন :- মিসকীন সেই ব্যক্তি যার কিছুই নেই, যার কাছে এক একবেলা খাবারও নেই। যেসব লোকের অবস্থা এমন খারাপ যে, পরের রিকট সওয়াল করতে বাধ্য হয়। নিজের পেটের আহারও যারা যোগার করতে পারে না। তবে লক্ষ্য রাখা উচিত যে, ফকীর বা মিসকীন যাকেই যাকাত দেওয়া হবে তারা মুসলমান ও নিসাব পরিমান সম্পদের মালিক না হয়।

৩য় খাত : আমেলীন :- ইসলামী সরকারের পক্ষে লোকদের কাছ থেকে যাকাত, উশর প্রভৃতি আদায় করে বায়তুল মালে জমা প্রদান, সংরক্ষন ও বণ্ঠনের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ।তাদের পারিশ্রমিক যাকাতের খাত থেকেই আদায় করতে হবে। কোরআনের বর্ণনানুযায়ী তাদেরকে যাকাতের অর্থ হতে বেতন/পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। এত ফকির বা মিসকীন হওয়ার কোন শর্থ নেই।

৪র্থ খাত : মুআল্লাফাতুল কুলুব :- নতুন মুসলিম যার ইমান এখনোও পরিপক্ষ হয় নাই বা ইসলাম গ্রহণ করতে ইচ্ছুক অমুসলিম। যাদের দ্বীন ইসলামের প্রতি আকর্ষণ করেও উৎসাহিত করনার্থে যাকাত প্রদান করা যেতে পারে।

৫ম খাত : বন্দী মুক্তি :- এ ক্ষেত্রে ক্রীতদাস-দাসী/বন্দী মুক্তির জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে। অন্যায়ভাবে কোন নিঃস্ব ও অসহায় ব্যক্তি বন্দী হলে তাকেও মুক্ত করার জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে।

৬ষ্ঠ খাত : ঋণগ্রস্থ : এ ধরণের ব্যক্তিকে তার ঋণ মক্তির জন্য যাকাত দেওয়ার শর্ত হচ্ছে- সেই ঋণগ্রস্থের কাছে ঋণ পরিশোধ পরিমাণ সম্পদ না থাকা। আবার কোন অবৈধ কাজের জন্য- যেমন : মদ কিংবা নাজায়েজ প্রথা অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে কো কোন ইমাম শর্তারুপ করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

৭ম খাত : আল্লাহর পথে : সম্বলহীন মুজাহিদের যুদ্ধাস্ত্র/সরঞ্জাম উপকরণ সংগ্রহ এবং নিঃস্ব ও অসহায় গরিব দ্বীনি শিক্ষারত শিক্ষার্থীকে এ খাত থেকে যাকাত প্রদান করা যাবে।

৮ম খাত : অসহায় মুসাফির : যে সমস্ত মুসাফির অর্থ কষ্টে নিপতিত তাদেরকে মৌলিক প্রয়োজন পূরণ হওয়ার মতো এবং বাড়ী ফিরে আসতে পারে এমন পরিমাণ অর্থ যাকাত থেকে প্রদান করা যায়।

পবিত্র কোরআনের ভাষ্যানুযায়ী উপরোক্ত খাতে যাকাত প্রদান করা অবশ্য কর্তব্য। আর এই খাতগুলো দরিদ্রসীমার ভিতরে থাকায় যাকাত প্রদানের মাধ্যমে সমাজ দরিদ্রমুক্ত করা সম্ভব। তাইতো আল্লাহ পাকের হুকুম যাকাত ব্যবস্থার কারণে সমাজের হতদরিদ্র জনগণ কিছুটা সুখের দিশা পাবে। নতুবা নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী ব্যক্তিবর্গের সম্পদ না হবে পবিত্র ও সংশোধিত এবং দরিদ্র অসহায়দের আহাজারিতে নেমে আসবে না দেওয়া সাহেবে নিসাব ব্যক্তিবর্গের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত। যেমন- পবিত্র কোরআনে পাকে উল্লেখ আছে “যারা সোনা, রূপাকে জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করেনা তাদের কঠিন আজাবের সংবাদ দাও। কিয়ামতের দিন ঐ সমস্ত ধাতুকে গরম করে এর দ্বারা তাদের কপালে, শরীরের পার্শ্বে ও পিঠে ছেক দেওয়া হবে। (আর বলা হবে) এটা হচ্ছে ঐ সম্পদ যা তোমরা জমা করে রেখেছিলে নিজেদের জন্য। আর ঐ জিনিস জমা রাখার শাস্তি গ্রহণ কর। (সূরা তাওবাহ ৩৪-৩৫)

হাদীসে নববীতেও যাকাত প্রদানে সক্ষম ব্যক্তি যাকাত প্রদান না করার শাস্তি। যেমন- “আল্লাহ যাকে সম্পদ দিলেন, কিন্তু সে তার যাকাত আদায় করল না, কিয়ামতের দিন তার সম্পদ বিষধর সাপে রুপান্তরিত করা হবে। সে সাপের দু’পার্শ্বে তিলক থাকবে। ঐ সাপ তার দু’চোয়ালে ধরে দংশন করবে আর বলবে, আমি তোমার সেই সম্পদ যা তুমি গরিবদেরকে না দিয়ে নিজে সঞ্চয় করেছ। (বুখারী ও মুসলিম)

এভাবে পবিত্র কোরআন ও হাদীসে অসংখ্যবার সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। যা প্রদানের মাধ্যমে সমাজে বিত্তশালীদের পাশাপাশি রাস্তায় পড়ে থাকা অসহায়, দরিদ্র ও মিসকীন জাতি সুখের ছায়া পাওয়ায় তাদের খুশিতে আল্লাহ খুশি হওয়ায় সমাজ ও রাষ্ট্রে নেমে আসবে রহমতের এক ঝা-া। যার কারণে মানবজাতি পাবে ইহ ও পরকালীন স্বর্গীয় শান্তি।

লেখক : ইসলামী গবেষক, বহুগ্রন্থ প্রণেতা, জাতীয় কলামিস্ট ও আইসিটি সম্পাদক, বাংলাদেশ তা’লিমে হিজবুল্লাহ, কিশোরগঞ্জ জেলা শাখা।

 

 

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ