“রবিউল আউয়ালে” মিলাদুন্নবী (সাঃ) পালনে শরয়ী বিধান

মাওলানা এস.এম. আরিফুল কাদের।। আরবি ১২টি মাসের মধ্যে অন্যতম ১টি গুরুত্বপূর্ণ মাস হচ্ছে- “রবিউল আউয়াল”। যে মাসে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স) এই ধূলির ধরায় আবির্ভূত হন এবং একই মাসে তিরোধান করেন। আর এ কারণে মুসলিমবিশ্ব তথা মুসলিম জাহানে মানবজাতির জন্য এ মহান মাসটি অতি পবিত্র ও তাৎপর্যবহ। হযরত নবী করিম (স) এর আবির্ভাব মানব জাতির জন্য একটি বিস্ময়কর ঘটনা এবং আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনের রহমত, বরকত, নাজিলের এক বিশ্বব্যাপী অভিব্যক্তি। পৃথিবীর ইতিহাসে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স) এর শুভাগমণের দৃষ্টান্ত মহাবিপ্লবের শামিল। তাঁর আবির্ভাবে আল্লাহ পাকের সার্বভৌম কর্তৃত্বে বিকাশ পরিপূর্ণ হয়েছিল এবং নিখিল বিশ্বের অত্যাচার, অবিচার, জুলুম ও ফ্যাসাদের অবসান ঘটিয়ে ন্যায় ও সত্যের রাজত্ব কায়েম করে মহাশান্তির নিশ্চয়তার বিধান করেছিলেন। সুতরাং তাঁর জন্ম দিবস বা মাস নিখিল বিশ্বমানবের কল্যান ও মানবতা প্রতিষ্ঠায় অনন্য ও চমৎকার মাধ্যম। পৃথিবীর তাবৎ ও ধর্মপ্রচারকদের জীবন ও ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, নিখিল বিশ্বমানবের সঠিক পথ নির্দেশনায় আমাদের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স) এর মতো অন্য কোন ধর্ম-প্রবক্তা যথার্থ আহ্বান রাখতে পারেননি। তাঁরা নিজ নিজ সীমিত পরিসরে ধর্ম প্রচার করেছিলেন। কিন্তু তিনিই একমাত্র মহান ব্যক্তিত্ব যার আবির্ভাবে মানবজাতি মহাশান্তির দিশা পেয়েছিলেন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স) এর আবির্ভাবের মহান মাস “রবিউল আউয়াল” এর সারা মাস কিংবা পক্ষকালব্যাপী সর্বস্তরের মুসলিম জনতা গ্রাম.মসজিদ ও মহল্লায় মহল্লায় মিলাদুন্নবী বা সিরাতুন্নবী (স) মাহফিলের আয়োজন করে থাকেন। নবী জীবনের আদর্শ ও শিক্ষাকে নিজের জীবনে বাস্তবায়নের অঙ্গিকারে মিলাদুন্নবী বা সিরাতুন্নবী (স) একটি মহাপ্রশিক্ষণ মাধ্যম।

মিলাদুন্নবী পরিচিতিঃ-

§“মিলাদ” শব্দের অর্থ ও ব্যাখ্যায় ড. ইবরাহিম আনীস ও সঙ্গীগণ. আল-মুজাম আল ওয়াসীত অভিধানে উল্লেখ করে বলেন- মিলাদ শব্দের আভিধানিক অর্থ: জন্মসময়। এই অর্থে “মাওলিদ” শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

§ আল্লামা ইবনে মানযুর তাঁর সুপ্রসিদ্ধ আরবি অভিধান “লিসানুল আরাবে” লিখেছেন, মিলাদ হচ্ছে সে সময়ের নাম; যে সময় সে (ব্যক্তি) জন্ম গ্রহণ করেছে।

§ আরবি ভাষার বৃহত্তম অভিধান তাজুল আরুছ, কামুস, মুহকাম, আছাছ, ছেহাহ, জাওহরি ও মিছবাহ প্রভৃতিতে বর্ণিত আছে যে, অলিদ বা মওলুদ অর্থ নবজাতক শিশু। মওলুদুর রেজাল অর্থ মানুষের জন্মকাল বা জন্মদিন। মিলাদুর রেজাল অর্থ মানুষের জন্মকাল ও জন্মদিন। মিলাদ শব্দটি জন্মকাল ও জন্মদিন ব্যতীত অন্য কোন অর্থে ব্যবহৃত হয় না। সুতরাং মিলাদুন্নবী ব্যাখ্যায় দাড়ায় হযরত মুহাম্মদ (স) এর জন্ম কাহিনী ও তৎসংশ্লিষ্ট ঘটনাবলী আলোচনা করা।

স্বভাবতঃ মিলাদুন্নবী বলতে; মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স) এর জন্ম কাহিনী ও তৎসংশ্লিষ্ট ঘটনাবলী আলোচনা করাবে বুঝায়।

শরয়ী বিধানঃ-

মিলাদুন্নবী (স) নিয়ে বর্তমান সমাজের উলামায়ে কেরামগণের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত করা হয়। প্রকৃত শরীয়াপন্থায় মিলাদুন্নবী (স) পালনে আকাবিরে দেওবন্দ, জৈনপুর, ফুরফুরা তথা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মধ্যে কোন মতভেদ দেখা যায় না। তবে প্রগতির ছোঁয়ায়, আধুনিকতার নামে বর্তমান সমাজে প্রচলিত যে মিলাদুন্নবী (স) উদযাপন করা হয় তা নিয়ে সমস্ত উলামায়ে কেরামগণের মধ্যে মতভেদসহ ঝগড়ার রুপ ধারণ করেছে। যা নিতান্তই নিচক ও লজ্জাজনক কাজে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই ফ্যাসাদের দাবানলে জ্বলছে বাংলাদেশসহ পার্শ্ববর্তী মুসলিম রাষ্ট্রের সাধারণ জনগণ। তা থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রয়োজন সঠিক মত ও পথ। মনে রাখা উচিত যে, মুসলিম জাহানের প্রসিদ্ধ ৪টি মাজহাবে বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদ লক্ষ্য করা যায়। যেমন- ইমাম আযম আবু হানিফা (রহ) মতে, তিলাওয়াতের সিজদা ১৪টি; কিন্তু ইমাম শাফেয়ী (রহ) মতে, ১৫টি। ইমাম আবু হানিফার মতে, ছাহেবে নিসাবকে কুরবানী করা ওয়াজিব; কিন্তু ইমাম শাফেয়ী (রহ) মতে, ছাহেবে নিসাবকে কুরবানী করা সুন্নাত। এভাবে প্রসিদ্ধ চার মাজহাবসহ প্রায় সব মাজহাবে মতভেদ লক্ষ্য করা যায়। তাঁরা নিজস্ব দলিলে দৃঢ় ছিলেন। তবে কখনো তাঁরা বিপক্ষ মাজহাবকে কাফির, ফাসিক, বিদআতি ও ভন্ড বলে হেয় প্রতিপন্ন না করে নিজ নিজ দলিলে স্থীর ছিলেন এবং দলিল পেশ করে প্রমাণ করে দিয়েছেন। ঠিক তেমনি বর্তমান সমাজে কিছু কিছু ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরামগণের মধ্যে মতভেদ লক্ষ্য করা যায়। প্রত্যেক পক্ষের আলেমগণ কুরআন ও হাদীস ভিত্তিক দলিল পেশ করে থাকেন। এভাবে সব বিষয়ে দালিলিক প্রমাণ থাকায় কেউ কাউকে কাফির, ফাসিক ও ভন্ড বলে আখ্যায়িত করায় সমাজে বিবেধ ছড়িয়ে দেয়। তাই নিজ নিজ দলিল ভিত্তিক আমলে আত্মনিয়োগ করা ভাল মনে হয়। এসব বিবেধ মিমাংসায় হক্বপন্থী আলেমগণের একতা কামনা করি। তবে প্রশ্ন হলো সমাজে প্রচলিত মিলাদুন্নবী (স) নামে কিছু ইসলাম বহির্ভূত কাজ করা হয়; যা অবশ্য পরিত্যাজ্য। যেমন- রবিউল আউয়াল মাস আসলে মিলাদুন্নবী (স) উৎসব হিরিক পড়ে। কেন তা হবে? নবী করিম (স) এর মিলাদ বা সিরাত ১২মাসের যে কোন সময় যে কোন দিন আলোচনা করা চলে। যা নির্দ্দিষ্ট সময়, মাস বা দিনের প্রয়োজন হয় না। যেমন- ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (রহ) তাঁর এক কিতাবে উল্লেখ করেছেন- হযরত আবু দারদা (রা) হতে বর্নিত। একদা তিনি রাসুল (স) সহ আবু আমের আনসারী (রা) এর বাসায় উপস্থিত হয়ে দেখলেন, তিনি তাঁর সন্তানাদি, আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদেরকে নিয়ে রাসুল (স) এর জীবন চরিত আলোচনা করতেছেন। তখন রাসুল (স) তাঁর বাড়িতে উপস্থিত হয়ে বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক তাঁর রহমতের দরজা তোমাদের জন্য খুলে দিয়েছেন এবং আকাশের সমস্ত ফিরিশতাগণ তোমার জন্য মাগফিরাতের দোয়া করছেন। অন্য এক বর্ণনায় এই হাদীসটিতে এসেছে যে, সাহাবী হযরত আবু আমের আনসারী (রা) জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর হাবিব (স)! এটা কি আপনার আগমনে হয়েছে? রাসুল (স) উত্তরে বললেন, না। কিয়ামত পর্যন্ত যদি এভাবে কেউ আমার জীবন চরিত আলোচনা করে, আল্লাহ পাকের ফেরেশতাগণ তার জন্য মাগফিরাত কামনা করবেন। (দৈনিক ইনকিলাব ৮ডিসেম্বর ২০১৬ ইং)

এখানে নবীজি (স) এর জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা সাহাবী কোন একদিন করেছিলেন বলে এবং হাদীসের শেষাংশে বুঝা যায়। শুধু তাই নয় বিশ্বনবী (স) এর জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা যে কোন দিন করার প্রমাণও পাওয়া যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত। একদিন হযরত আব্বাস (রা) কিছু লোক নিয়ে নিজ গৃহে নবী করিম (স) এর জন্মকালীন ঘটনাবলি বর্ণনা করেছিলেন এবং তাঁর প্রশংসাবলি আলোচনা করে দরুদ ও ছালাম পেশ করেছিলেন। ইত্যবসরে প্রিয়নবী (স) হাজির হয়ে এ অবস্থা দেখে বললেন, তোমাদের জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব হয়ে গেল। (ইবনে দাহইয়ার আত-তানবীর)

এভাবে অসংখ্য হাদীসে মহানবী (স) এর জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা রয়েছে। তবে গবেষণা করে দেখা যায় এই হাদীসগুলোর মধ্যে কোন হাদীসে ১২ই রবিউল আউয়াল নির্দ্দিষ্ট করে লাল-নীল বাতি জ্বালিয়ে, গোলাপজল ছিটিয়ে, নারী পুরুষ একসাথে নিজেদের কণ্ঠে হারমোনিয়াম বাজিয়ে, উৎসব মিছিল করে ভ্যান সংগীতে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে রাস্তায় বের হওয়ার কোন দলীল পাওয়া যায়নি। তাই উচিত এই মাসে বিশেষ কোন আমল করতে চাইলে রোজা রাখা, বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা এবং বিশ্বনবীর (স) শাফায়াতের দোয়া করা। এ বিষয়েও একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, আর তা হলো- হযরত আবু কাতাদা (রা) হতে বর্ণিত। রাসুলে পাক (স) এর দরবারে আরজ করা হলো- হে আল্লাহর রাসুল (স)! আপনি প্রতি সোমবার রোজা রাখেন কেন? উত্তরে নবীজি (স) বললেন, এই দিনে আমি জন্ম গ্রহণ করেছি, এই দিনে আমি প্রেরিত হয়েছি এবং এই দিনে আমার উপর পবিত্র কোরআন নাযিল হয়েছে। (সহীহ মুসলিম ২য় খ- ৮১৯পৃ./ বায়হাকী: আহসানুল কুবরা ৪র্থ খ- ২৮৬পৃ./ মুসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল ৫ম খ- ২৯৭ পৃ./ মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ৪র্থ খ- ২৯৬পৃ./ হিলিয়াতুল আউলিয়া ৯ম খ- ৫২ পৃ.)

এখানে আরেকটি প্রশ্ন রয়েছে, আর তা হলো- আমাদের অঞ্চলে ঘরে ঘরে, মসজিদে, নতুন দোকান উদ্ভোধন করতে ঘোষণা করা হয়, আজ আমাদের এখানে মিলাদ-মাহফিল হবে; সকলেই আমন্ত্রিত! কিন্তু দেখা যায় সেখানে সূরা ফাতেহা ৩বার, সূরা ইখলাস ১০বার, দরুদ শরীফ ১১বার পাঠ করে দোয়া করা হয়। এটার নামকি মিলাদ? না; আমাদের বলা উচিত যে, আজ আমাদের এখানে দোয়া-দরুদ হবে; সকলেই আমন্ত্রিত!

পরিশেষে বলিব যে, শুধুমাত্র রবিউল আউয়াল চাঁদে এবং রমজান মাসে মিলাদুন্নবী বা সিরাতুন্নবী (স) পালন না করে; প্রত্যেক চাঁদে, প্রত্যেক মাসে, প্রত্যেক সপ্তাহে একবার করিয়া মিলাদুন্নবী বা সিরাতুন্নবী (স) আলোচনা করতে পারিলে এবং যথার্থরুপে সার্থ্যকভাবে সমাধা করিলে আমাদের জন্য উহার মধ্যে যে কল্যান ও মঙ্গলের পথ লাভ করা যায়, তাহা কল্পনাতীত। আল্লাহ আমাদের সঠিক পদ্ধতীতে মিলাদুন্নবী বা সিরাতুন্নবী (স) পালন করার তৌফিক দান করুন!!!

লেখক : ইসলামী গবেষক, বহুগ্রন্থ প্রণেতা, জাতীয় কলামিস্ট ও আইসিটি সম্পাদক, বাংলাদেশ তা’লিমে হিজবুল্লাহ, কিশোরগঞ্জ জেলা শাখা।

 

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ