একজন মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধে যাওয়ার, যুদ্ধের প্রশিক্ষন নেওয়ার ও যুদ্ধ জয় করার গল্প (১ম পর্ব)

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঘুমন্ত বাঙালির উপর অস্ত্রসহ ঝাপিয়ে পরে এবং ঐ রাতেই বঙ্গবন্ধু তৎকালীন ইপিআরের ওয়্যারলেসে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। অতঃপর পাক সেনারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, পিলখানার ইপিআর হেড কোয়াটার ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আক্রমণ চালায়। সঙ্গে সঙ্গেই পাক সেনরা ইপিআর, পুলিশ ও ছাত্র জনতার প্রতিরোধ যুদ্ধের মুখে পরে। ঐ রাতেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়। পাক সেনারা গণহত্যায় লিপ্ত হয়ে সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে পরার সময়ই বাঙালীর প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়।

আমি (নিছার আহমদ রতন) তখন কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজের ছাত্র। বয়স প্রায় ২০ বছর। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের স্বাধীনতা সংগ্রামের ভাষণের অগ্নিমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধ করার মানসিক প্রস্তুতিতে থাকার এক পর্যায়ে ২৫শে মার্চের পরেই একদল বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্য বিদ্রোহ করে কিশোরগঞ্জে আজিম উদ্দিন হাই স্কুলে ক্যাম্প স্থাপণ করে। আমিসহ কতক ছাত্র তাদের হাতে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু স্বল্প সময় ও অস্ত্রের অভাবে প্রশিক্ষণ নেয়া সম্ভব হয় না। ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল মুজিব নগর সরকার গঠিত হলে আমরা প্রাণ ফিরে পাই। ১৯শে এপ্রিল পাক সেনারা কিশোরগঞ্জে প্রবেশ করলে আমরা সংগঠিত হয়ে কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল থানার কাজলা গ্রামের এডভোকেট মরতুজ আলীর বাড়িতে আশ্রয় নেই। সেখানে কিছুদিন থাকার পর জানতে পারি যে মুজিব নগর সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা গ্রহন করে। তারপর আমার পিতা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আব্দুর রাজ্জাক (কোম্পানি)’র অনুপ্রেরণায় আমরা ৫ জন প্রতিবেশী তরুন ছাত্র মিলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে নৌকা যোগে ভারতের দিকে রওনা হই। ৩ দিন ৩ রাত নৌকায় করে বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলার বর্তমান বিসম্ভরপুর উপজেলার চিনাকন্দি বাজারে পৌছি এবং রাতে মোহাম্মাদ আলী মীরের দোকানের দোতলায় আমাদের থাকতে দেয়। কারন তাহার বাড়ি কিশোরগঞ্জ সদরের নীলগঞ্জ বাজারের কাছাকাছি। পরদিন সকালে আমরা ভরতের বর্ডার ক্রস করে মেঘালয় রাজ্যের বালাট থানার মৈলাম রিক্রুটিং কেম্পে যাই।

কেম্পের মূল দায়িত্বে ছিলেন বর্তমান বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ (তৎকালিন এমএনএ)। তিনি আমাদের একটা প্রাথমিক বাছাই দেন (অর্থাৎ বয়স ১৬ বছরের উপরে হতে হবে) এবং বলেন যে ভারতের ইকোওয়ানে প্রথম ব্যাচের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ চলিতেছে এরপর তোমাদের নেয়া হবে। তোমারা কোন নিরাপদ স্থানে অপেক্ষা কর এবং প্রতিদিন খবর রাখবে। পরেরদিন আমি চিনাকান্দি বাজার সংলগ্ন শারফানের বাড়িতে লজিং পাই এবং শারফানের মা আমাকে জামাই আদরে খাওয়া দাওয়া করান। কদিন পর মৈলাম মুক্তিযোদ্ধা কেম্পে আমাদের ডাক এলো এবং ঐ কেম্পে দুই দিন যাচাই বাছাই, তালিকা তৈরি ও সামরিক পরিবহণ ট্রাকের জন্য থাকতে হলো। থাকার জায়গা খোলা তাবুতে এবং খাওয়া পাতলা খিচুরি।

পরবর্তীতে জানতে পারি আমার পিতা ২০ জন তরুন যুবক নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের জন্য ভারতের মহেশখলায়  চলে যান।

চলবে… 

 

লেখকঃ

বীর মুক্তিযোদ্ধা নিছার আহমদ (রতন)
সম্পাদক ও প্রকাশক
মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ