একজন মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধে যাওয়ার, যুদ্ধের প্রশিক্ষন নেওয়ার ও যুদ্ধ জয় করার গল্প (২য় পর্ব)

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ,
ডিসেম্বর ১৮, ২০১৭ ১১:১৬ অপরাহ্ণ

প্রথম পর্বের পর : রাতে ট্রেনিংয়ের ট্রাক এলো। খুব ভোরে মইলাম ক্যাম্প হইতে রওনা দিয়ে ভারতের চলতি নদী পার হয়ে বালাট থানার সামনে দাড়ানো সামরিক ট্রাকে তালিকা অনুযায়ী আমাদের ৪০ জন করে উঠানো হয়। তখন আমরা খালি পেটে সামান্য আদার টুকরো মুখে দিয়ে (যাতে বমি না হয়) ট্রাকের মেঝেতে বসি। এরপর আনুমানিক সকাল ৮ টার দিকে মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলংয়ের উদ্দেশ্যে ট্রাক ছাড়লো। ট্রাকগুলো আকাবাকা পাহাড় বেয়ে চুড়ায় উঠে গেলো। কিছুক্ষণ পর পর পাহাড়ের চুড়ায় উঠে আবার নিচে নামে। পাহাড়ের গড় উচ্চতা প্রায় ৫০০০ ফুট। পাহাড় ভাঙ্গা রাস্তায় বাম দিকে পাহাড় আর ডানদিকে সাদা মেঘ। এরপর শুরু হলো বমি করার পালা। আমরা তিনজন বাদে প্রায় সবাই ট্রাকের ভিতর বমি করলো। বমিতে ট্রাকের মেঝে প্রায় ২ ইঞ্চি পুরু হয়ে গড়াগড়ি করতে লাগলো। এইভাবে সারাদিন না খেয়ে বিকাল আনুমানিক ৫ টার দিকে সিলং ক্যান্টনম্যান্ট পৌছলাম। ক্যান্টনম্যান্ট ভূমি থেকে আনুমানিক ৪০০০ ফুট উপরে।

আমাদের নামে রাত্রে খাবারের জন্য রেশন মঞ্জুর করলে সন্ধ্যার পূর্বে আমরা বোঝা বয়ে রেশন স্টোর হইতে রন্ধন শালায় রেশন পৌছাই। রাত ১০ টার দিকে আমাদের খাবার দেয়া হলো। খাবার হিসেবে ১ বারা ভাত ও বাধাকপির সবজি। আমরা অভ্যাস না থাকলেও খুদা থাকায় কোনমতে খেয়ে নিলাম। কিন্তু পাহাড়ের উপরে খাবার পানি না থাকায় আমাদের খাবার জন্য পানি দেয়া হলোনা। পানি না থাকায় অনেকের ভাত গিলে খেতে কষ্ট হয়েছে। পরে কাপড় কাঁচার টাঙ্কি হতে সাবানের গন্ধ যুক্ত কিছু পানি খেয়ে নিলাম। রাতে গরমকালে সিলং পাহাড়ে প্রচন্ড ঠান্ডা থাকায় ফ্লোরে শুয়ে একে অপরকে জরাজরি করে রাত কাটাই। পরদিন খুব ভোরে ট্রাক হাজির, আমরা কেউ কেউ ক্যান্টনমেন্টের ক্যান্টিন থেকে ১-২ টা বিস্কুট খেয়ে ট্রাকে উঠলাম। এইভাবে আকাবাকা উচুনিচু পাহাড় বেয়ে ট্রাক চলতে লাগলো। আবার শুরু হলো বমির পালা। ঠিক সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ইকোওয়ান নামক ট্রেনিং সেন্টারে পৌছলাম। ইকোওয়ান ট্রেনিং সেন্টারটি ছিলো ভূমি থেকে ১০০০০ ফুট উপরে। ভারতীয় সৈন্যরা আমাদের নাম ডেকে ডেকে ট্রাক থেকে নামিয়ে লাইন করে পাহাড়ের পাইন গাছের নিচে বসালো। আল্লাহ্‌র অশেষ রহমতে সেদিন ইকোওয়ানে ২ ঘন্টা বৃষ্টি বন্ধ ছিলো (ইকোওয়ান অঞ্চলে সবসময় বৃষ্টি থাকে)। আমাদের শুরু হলো খাওয়া এবং পড়ার জিনিস দেয়ার পালা- এরমধ্যে ভাত খাওয়ার গারুয়া থালা, ৭৫০ এমএল পানি ধরার একটা মগ, কাপড়ের এক জোড়া জুতা, ২ টি শার্ট, ১ টি পাজামা, ২ টি হাফ প্যান্ট, ১ টি ছতরঞ্জি ও ১ টি ছয় ফুট লম্বা মোটা পলিথিন। পাহাড়ের ছরার উপর চিকন গাছের তৈরি সেতু পার হয়ে ১ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ বেয়ে ৪০ জন করে একটা তাবুতে আমাদের তোলা হলো। তাবুতে যাওয়ার পরপরই বৃষ্টি শুরু হলো। রাত ১০ টার সময় আমাদের খাবারের ডাক এলো। আমরা গেলাম থালা ধরলাম- ১ প্লেট ভাত, সবজি শিদ্ধ, শিদ্ধ মাসকালাইয়ের ছোলা সহ ডাল ও একটা নাসপাতি ফল। আমরা কোনমতে খেয়ে পাহাড়ের ঝড়না থেকে ১ মগ পানি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন ভোর ৫ টায় বাঁশির হইসাল শুনে আমাদের উঠতে হলো। খোলা তাবুতে ঘুমানোর কারনে আমাদের সবার শরীরে ৩-৪ টা করে চিনা জোঁক রক্ত চুষে মোটা হয়ে গিয়েছিলো। আমরা সেগুলোকে হাত দিয়ে শরীর থেকে আলাদা করি। এরপর খোলা ল্যাট্রিনে সবার পায়খানা সারার কাজ। ল্যাট্রিনটি হচ্ছে ৩০০ ফুট লম্বা একটা নালা, পাদানি হিসেবে ২ ফিট পর পর তেজপাতা গাছের ডাল, কোন দেয়াল নেই সম্পুর্ন খোলা। আমরা সবাই মিলে ছোটবেলার মতো একে অপরের সঙ্গে গল্প করে খোলা আকাশের নিচে পায়খানা সেরে নিলাম। এরপর ডালডা দিয়ে ভাজা ১ টি পুরি ও আধা কেজি পরিমান পাওডার দুধের চা খেলাম। চা টা খুব মজা হলো। মনেমনে ভাবলাম যদি আরেকটা পুরি দেয়া হতো তবে খুব ভালো হতো। খাওয়া শেষে বৃষ্টির মধ্যে আমাদের পিটি প্যারেড ও ক্রলিং শিখানো হলো সন্ধ্যা পর্যন্ত। শুধু দুপুরে খাওয়ার ১ ঘন্টা বিরতি ছিলো। পরদিন শেখানো শুরু হলো অশ্রের নাম ও হিন্দি ভাসায় খুলনা, জোড়না ও সাফাই কারনা (খোলা, লাগানো ও পরিষ্কার করা)। ট্রেনিংয়ের অশ্র গুলোর নাম রাইফেল, এসএলআর, এলএমজি, এসএমজি, স্টেন্ডগান, পিস্তল, হ্যান্ড গ্রেনেড, এক্সক্লুসিভ, ২ ইঞ্চি মর্টার ও তিন প্রকারের মাইন (পার্সোনাল, এন্টি পার্সোনাল ও এন্টি টেঙ্কের মাইন)। এরপর শুরু হয় অশ্রের কিলিং রেঞ্জ, মর্টারের গোলা কত এঙ্গেলে কতদূর নিক্ষেপ করা যায়। তারপর অশ্র চালনার ট্রেনিং এবং ফায়ারিং। পরবর্তীতে গেরিলা যুদ্ধের কৌশল হিট এন্ড রান ও এম্বুশ শিখানো হয়। এম্বুশের ৩ টি গ্রুপ : এসাল্ট গ্রুপ বলতে শত্রু চলাচলের পথে উৎ পেতে বসে থাকা, সাপোর্ট গ্রুপ বলতে তারা আক্রান্ত হলে সাপোর্ট দিবে, কাটাপ গ্রুপ বলতে শত্রুদের সাহায্যকারী দলকে প্রতিহত করা। এরপর শুরু হয় এক রাত ব্যাপি জঙ্গল প্যারেড। এভাবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে মোট ২১ দিন একটানা আমরা ট্রেনিং নেই। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত আমার নামে বরাদ্দকৃত জুতাগুলো আমার পায়ের চেয়ে অনেক বড় থাকায় খালি পায়ে প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে প্রায় দিনই পাহাড়ের পাথরের গায়ে লেগে পা কেটে রক্ত বের হতো। আমাদের প্রতিদিনের খাবার ছিলো সকালে পুরি, চা এবং দুপুরে ও রাতে একদিন পর পর ছাগলের মাংস, সবজি ও ডাল শিদ্ধ। এভাবে আমরা ট্রেনিং শেষ করে ২ দিন ট্রেনিং প্রেক্টিস করে ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ড জেনারেল জাগজিত সিং অরোরার নিকট পবিত্র কোরআন, গীতা, জাতীয় পতাকা ও মা বাবার নামে আমরা ৬২৮ জন মুক্তিযোদ্ধা শপথ গ্রহণ করি। শপথ শেষে পরদিন ভোরে ট্রাকযোগে আমরা পুনরায় সিলং ক্যান্টনমেন্টে ফিরে আসি এবং অশ্র ও গুলির বাক্স বুঝে নেই। আমার নামে একটি রাশিয়ান এসএমজি (সাব মেশিনগান) বরাদ্দ হলো। এখানে এক রাত থেকে ভোরে আমাদের আবার ৪০ জন করে ট্রাগ যোগে বাংলাদেশ স্বাধীনের উদ্দেশ্যে বালাটে ফেরত পাঠায়। আমাদের ট্রাক বহরের মধ্যে একটি ট্রাক ৩০ কি: মি: আসার পর পাহাড় থেকে ছিটকে  ৮০০ ফুট নিচে পরে যায় এবং একটি মেহগিনি গাছে আটকে যায়। এই দুর্ঘটনায় ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা প্রান হারান। এরমধ্যে একজন কিশোরগঞ্জের, একজন নান্দাইলের ও একজন সুনামগঞ্জের। আর ৩৭ জন মুক্তিযোদ্ধা গুরুতর আহত হয়। তারপর ঝুকিপূর্ন ভেবে ট্রাক আমাদের সকাল ১১ টায় এই স্থানে নামিয়ে দেয়। সমগ্র রাস্তা পাহাড় বেয়ে পায়ে হেটে অশ্র, গুলি ও বেডিং পত্র নিয়ে রাত ১০ টার দিলে বালাটের কাছাকাছি একটি পাহাড়ে রাত কাটাই। খুব ভোরে বালাটের মিলিটারি ক্যাম্পের মেজর ডিসুজার নিকট রিপোর্ট পেশ করি এবং ২ দিন আমরা পাহাড়ের নিচু টিলায় বিশ্রামে থাকি। এরপর শুরু হয় গেরিলা যুদ্ধের পালা…..

চলবে…

 

লেখক :

বীর মুক্তিযোদ্ধা নিছার আহমদ (রতন)
উপ-অধিনায়ক, ডি কম্পানী, ৫ নং সাব সেক্টর সুনামগঞ্জ।
সম্পাদক ও প্রকাশক, মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ডটকম।

 

প্রথম পর্বের লিঙ্কঃ 

একজন মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধে যাওয়ার, যুদ্ধের প্রশিক্ষন নেওয়ার ও যুদ্ধ জয় করার গল্প (১ম পর্ব)

Comments are closed.