কীর্তিমানের মৃত্যু নেই : জীবন তাপস তন্ময়

মুক্তকলাম ।। মানুষের জীবনটাই একটা রহস্যকাব্য। লুকিয়ে আছে রহস্যের খেলা। জীবনের পরতে পরতে। জন্ম নিয়েই আলো-আঁধারি পাঠ। কখনও রোদ কখনও মেঘ। হাসি-কান্নার গোলকধাঁধা। কেউ কি জানে কখন ফুরায় এ জীবনের লেনদেন?

ছোটবেলায় ঘুমুতে ইচ্ছে করতো না। রাত হলেও। মা বিছানায় শুইয়ে দিয়ে রাজা-রানী গল্প বলতেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। পীঠে হাত বুলিয়ে দিতেন। আলতো ক’রে। কখনও বা দোলনায় শুইয়ে ঘুমপাড়ানি গান করতেন। জোর করে আমি তাকিয়ে থাকতাম। চোখের পাতা খুলে। ঘুমুতে ইচ্ছে করতো না। ভয় হতো, ঘুমিয়ে গেলে যদি আর জেগে না উঠি! যদি মরে যাই!

কবিরা মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন হয়। সাধারণত। আবেগ-অনুভুতি আর-সবার থেকে আলাদা হয়। দ্রষ্টা ও স্রষ্টা হয়। প্রেমিক হয়। অনেক দূর দেখতে পায় কবি। অভিমানে নীল হয়। বুকের সরোবরে লালন করে নীল পদ্ম! গভীর মমতায়। শিল্পের জন্য উৎসর্গ করে দেয় জীবনটা! অথচ জীবনের জন্য শিল্প। শিল্পের জন্য জীবন নয়। এই গোলকধাঁধায় এসে কখনও বা খেইঁ হারিয়ে ফেলে জীবনের। হয়ে উঠে বোহেমিয়ান। শিল্পের ভেতর দিয়ে চলে যায় বহুদূর। শেকড়ায়নে। যা কিছু সত্য, যা কিছু সুন্দর_সে পথ ধরে হেঁটে যায়। অনায়াসেই। দ্বিধাহীন অবিচল।

কবি হিসেবেই জানি। আপাদমস্তক একজন শুদ্ধ মানুষ হয়ে উঠার পরিব্রাজক। রাজনীতি করতেন। ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে। তথাকথিত রাজনীতিক থেকে স্বতন্ত্র মণ্ডিত। সম্পূর্ণ আলাদা। কথা কম কাজ বেশি, দেশকে ভালোবাসি প্রকৃতির। মিতভাষী ও সজ্জন। আদর্শের মানদণ্ডে দেখতেন। জীবনকে। জীবনাচারে ছিলেন সহজিয়া। লালনের সহজ মানুষ।

পরিচয়টা সহসা-ই হয়। কাকতালীয়। মঞ্চে কবিতা পড়ছি। জাতীয় কবিতা উৎসবে। দু-হাজার চারে।উৎসবের সমন্বয়েও কাজ করেছি। যোগাযোগ ও দপ্তরের দায়িত্বও পালন করেছি। আয়োজক কমিটির একজন কর্মী হিসেবেই পড়ছিলাম। সামনেই বসা অতিথিবৃন্দ। কবিতাপাঠ শেষে সৈয়দ হক আমাকে ডেকে পাঠালেন। সৈয়দ শামসুল হক। কবি সব্যসাচী। ‘তোমার লেখা কবিতাটির একটি কপি করে দিও।’ বললেন। আমি তৎক্ষণাৎ হাতের লেখা কবিতাটি এগিয়ে দিই। পাশেই বসা লোকটিকে দেখিয়ে বললেন, দেখ শাকিল, ‘তোমার এলাকার ছেলে। কতো সুন্দর হাতের লেখা। সুন্দর কবিতা। উপমা উৎপ্রেক্ষা রূপক আর অনুপ্রাসের সুন্দর ব্যবহার। ভালো পড়েও!’ তখনই জানি তিনি ময়মনসিংহের। হক ভাই-ই পরিচয় করিয়ে দিলেন। সবিস্তারে। আমাকে ফোন নম্বর দিয়ে বললেন, যোগাযোগ রেখো। সেই থেকেই তাঁকে জানা। পরে অনেকবার কথা হয়েছে। শাহবাগ আজিজ মার্কেট, পাবলিক লাইব্রেরি, টিএসসি, বইমেলা বা কোন কবিতা উৎসবে। স্নেহ করতেন। আমার কবিতা পছন্দ ছিল। নিয়মিত লিখতে তাগাদা দিতেন। বছর-দুই আগে দেখা হয়েছিল। বাংলা একাডেমি বইমেলায়। ব্যস্ততার মধ্যেও কথা হয় অনেক। বিশেষ সহকারি ছিলেন। মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর। ব্যস্ততা তারে দেয় না অবসর। এরই মাঝেই তিনি নিজের মতো করে সময় খুঁজে নিতেন। বন্ধু সমেত আড্ডায় মেতে উঠতেন। ইচ্ছে হলেই ঘুরতে যেতেন। ফূটপাতের কোন হোটেল বা চায়ের টঙে বসে খেতেন। ভোজন রসিক ছিলেন। নিজেই রান্নাটা পছন্দ করতেন। তাঁর এই সহজিয়া চলাফেরা দেখে অবাক হই। শেকড়চ্যুত হননি মুহুর্তের জন্যও। সেই একই আদলে মিশতেন। ভাবলেশহীন। একবার বলেছিলাম ভাই আপনি এভাবে সবার সাথে মিশেন, যত্র-তত্র বসে খান, আমার ভয় হয়! তিনি বলতেন ‘দেখো মানুষের উপর বিশ্বাস হারাতে নেই। আমি এমনই সহজ থাকতে পছন্দ করি। এ শিক্ষা আমি ছোটবেলায়ই রপ্ত করেছি। বাবা আমাদের ভাই-বোনদের সঙ্গে বসে এই শিক্ষা দিতেন। বঙ্গবন্ধুর সাধারণ থেকেই অসাধারণ হয়ে উঠার গল্প বলতেন। সেই থেকেই বঙ্গবন্ধুই আমার আদর্শ হয়ে উঠেছিল।’

আমার আগের আইডিটা হ্যাকড। তিনি ছিলেন। কথা হতো চ্যাটবক্সেই। নিয়মিতই। কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের জন্য বড় কিছু করার স্বপ্ন ছিল তাঁর। গুণী অথচ যোগ্য, তাঁদের তিনি সমীহ করতেন। অবহেলিত ও অর্থকষ্টে ছিল যাঁরা, নিজের অবস্থান থেকে সহায়তা করতেন। দেশখ্যাতদের প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা পাইয়ে দিতে আপ্রাণ ছিলেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগেই কথা হয়। আমার একটি ইভেন্টে আসতে অনুরোধ করায় তিনি সম্মত হয়েছেন। জানুয়ারি দুহাজার সতের দিককার কোন একটি দিনে করার কথা ছিল। ‘জলসাঘর লোকসংগীত উৎসব’। সংগঠন চেয়ারম্যান হিসেবে দাওয়াত দিলে খুশি হন। বললেন বৃহত্তর ময়মনসিংহ কেন্দ্রীক বিভিন্ন মাত্রা লোকগানকে উঠিয়ে নিয়ে আসতে। কিছু পরামর্শ ও দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন। উপমহাদেশের কিংবদন্তী তুল্য বাঙালি শিল্পী মান্না স্মরণে যে জলসা করেছিলাম, আমি তাঁকে অনুষ্ঠানের একটি সিডিও দিয়েছিলাম। দেশের খ্যাতনামা শিল্পীদের নিয়ে এই অনুষ্ঠানটি তিনি পছন্দ করেছিলেন খুব। সুবাদেই আগ্রহ দেখিয়েছিলেন আসতে। আর করা হয়নি সেই কাঙ্ক্ষিত লোকসংগীত ইভেন্ট। শাকিল চলে গেলেন। এক বছর হয়ে গেল! ২০১৬ ডিসেম্বরে গুলশানে একটি বিদেশী হোটেলে মৃত্যুবরণ করেন এই মহৎপ্রাণ! তাঁর মৃত্যুশোকে আমি অধিক শোকে পাথর! এমনতো কথা ছিল না! আমরা একজন অভিভাবকে হারালাম!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারি, আওয়ামী লীগের গবেষণা সেল, সেন্টার ফর রিসার্চ এন্ড ইনফরমেশন ( সি আর আই) সিইও, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি সহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক দায়িত্ব পালন করেন মাহবুবুল হক শাকিল। প্রিয় শাকিল ভাই। মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর খুব আস্থাভাজন ছিলেন তিনি। সবসহলেই প্রশংসিত ছিলেন। সজ্জন হিসেবে।

একজন মানুষের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা, মানবিক মূল্যবোধ পরায়ণ হওয়া। তিনি তা হয়ে উঠার অনুশীলন করতেন। সাহসী ছিলেন। সত্যের মতো। ছিলেন স্বকীয় মানদণ্ডে শেকড়ান্বেষী। লালনের সহজ মানুষ। অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল। মননঋদ্ধ। সত্য ও সুন্দরের উপাসক। বঙ্গবন্ধুর আদর্শজাত সময়ের সাহসী সন্তান। ২০ ডিসেম্বর তাঁর জন্মদিন। এই দিনে তিনি পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন প্রথম। সেই থেকেই জেনেছিলেন তাঁর মুক্তি আলোয় আলোয়। সারাজীবন মুক্তচিন্তার আলোয় মুক্তি খোঁজে ফেরেন। বিজয়ের মাসে তাঁকে আমার লাল-সবুজ সালাম। তাঁর কাজ তাঁকে অমর করে রাখবে। তিনি অমর। কীর্তিমানের মৃত্যু নেই।

 

লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট।

Comments

comments

You might also like More from author

Comments are closed.

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ