মহররমে আমাদের করণীয় ও বর্জনীয়

মাও. এস. এম. আরিফুল কাদের।। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনের এই পৃথিবীতে আরবি বারোটি মাস নির্ধারণ করা হয়েছে। ইহার মধ্যে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ মাসও রয়েছে। বলা হয়; কোরআন ও হাদীসের ভাষায় ‘রমজান’ মাসকে অন্য মাসের তুলনায় বান্দার জন্য বিশেষ সুযোগ সুবিধা করে দেওয়া হয়েছে। যেমন- অন্য মাসে বান্দা যা আমল করে ‘রমজান’ মাসে তা দশ থেকে সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি হয়। উদাহরণ স্বরুপ বলা যেতে পারে যে, বান্দা যদি নফল ইবাদত করে; রমজান মাসে আল্লাহ পাক তার সওয়াব সুন্নাতের সমতুল্য করে দেন। একটি সুন্নাত আদায় করলে; একটি ওয়াজিবের সমতুল্য করে দেন। ওয়াজিব আদায় করলে; ফরজের সমতুল্য সওয়াব লিখে দেন। একটি ফরজ আদায় করলে; সত্তরটি ফরজের সমতুল্য সওয়াব লিখে দেন। এরুপভাবে সাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখলে সম্পূর্ণ বৎসর নফল ইবাদতের সওয়াব লিখে দেন। শা‘বান মাস সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে বান্দার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করেছেন। এইভাবে আরবী বারোটি মাসের প্রত্যেকটি মাসেরই কিছু সুযোগ সুবিধা বান্দার জন্য রয়েছে; যা কোরআন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। তেমনি আরবি মাসের প্রথম মাস ‘‘মহরম’’ এরও কিছু গুরুত্ব ও মাহাত¦্য রয়েছে। আবার আমাদের সমাজে এমন কিছু প্রচলিত কাজও রয়েছে যা কোরআন ও হাদীস পরিপন্থি, যা থেকে আমাদের দূরে থাকা অতীব জরুরী। গুরুত্ব ও মাহাত্ব্য বলতে গিয়ে বলা হয়ে থাকে; এই এই মহরম মাসের ১০তারিখ থেকে আল্লাহর দুনিয়া সৃষ্টির সূচনাও হয়েছে। এই এই মহরম মাসের ১০তারিখ নূহ নবী (আঃ) তাঁর দলেরা মহা প্লাবন থেকে মুক্তি পেয়েছে। এই এই মহরম মাসের ১০তারিখ মুসা (আঃ) তাঁর দল বনী ঈসরাইল ফেরাউনের অত্যচারের হাত থেকে আল্লাহ পাক অব্যহতি দিয়েছেন এবং অত্যাচারী-যালিম ফেরাউনকে পানিতে ডুবিয়ে মৃত্যু দিয়েছেন। ঈসা (আঃ) কে এই ১০তারিখ তিরোদান করেছেন। আবার যে কারণে আমাদের দিলকে সবচেয়ে মর্মান্তিক করে তুলে যে ঘটনা; সেই ঘটনাটি হলো আমাদের প্রাণপ্রীয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদরের নাতী সায়্যিদিনা হযরত হুসাইন (রা) কে নির্মমভাবে-নির্দয়ভাবে কারবালার প্রান্তরে শহীদ করা হয়েছে। এককথায়, এই মহরম মাসে অনেক ঘটনা ঘটেছে যা নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিকগণ বর্ণনা করেছেন।

মহররম মাসের করণীয় কাজগুলো আলোচনা করা হলো-

১. রোজা রাখাঃ

হাদীসঃ- ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় আসিয়া ইহুদিগণকে আশুরার দিন রোজা রাখতে দেখিলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের এই রোজার কি উদ্দেশ্য? এই দিনটি বিশেষ বরক্বতের দিন, এই দিন আল্লাহ পাক বনী ঈসরাইলকে শত্রু ফেরাউনের ক্বল থেকে মুক্তি দান করিয়াছিলেন। (আল্লাহ তা‘য়ালার শুকরিয়া আদায় করণার্থে এবং সেই মহান নিয়ামত স্মরণার্থে) মূসা (আঃ) এই দিন রোজা রাখিয়াছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলিলেন, মূসা (আঃ) এর সহযোগীতার জন্য আমরা অধিক আগ্রহশীল। এই বলিয়া নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোজা রাখিলেন এবং রোজা রাখতেও আদেশ করিলেন। (বুখারী ২য় খ- ২৬৭ পৃ.)

হাদীসঃ- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণিত। যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশুরার দিন অর্থাৎ মহরমের ১০তারিখ রোজা রাখতেন এবং ঐ দিন রোজা রাখার হুকুম দেন।

(বুখারী ও মুসলিম: রিয়াদুস সালেহীন ১৩৪ পৃ. দ্র.)

হাদীসঃ- হযরত আবু কাতাদা (রা) থেকে বর্ণিত। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আশুরার দিনের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাস করা হয়েছিল। তিনি বললেন, এতে (আশুরার দিন রোজা) বিগত দিনের কাফফারা হয়ে যায়। (মুসলিম: রিয়াদুস সালেহীন ১৩৪ পৃ. দ্র.)

হাদীসঃ- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণিত। যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন ঃ আগামী বছর পর্যন্ত যদি আমি বেঁচে থাকি তাহলে নয় তারিখের (আশুরার আগের দিন) রোজা রাখবো।

(মুসলিম: রিয়াদুস সালেহীন ১৩৫ পৃ. দ্র.)

হাদীসঃ- হযরত আবু মূসা আশআরী (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, ইহুদীরা আশুরার দিন ঈদের ন্যায় আনন্দ উৎসবের অনুষ্ঠাণ করিত (এবং ইহার সম্মানার্থে রোজা রাখিত)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানগণকে আদেশ করিলেন, তোমরাও এই দিন রোজা রাখ। (বুখারী ২য় খ- ২৬৭ পৃ.)

হাদীসঃ- মুসলিম শরীফে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, আমি যদি আগামী বৎসর বেঁচে থাকি; তাহলে নয় তারিখও রোজা রাখব। কিন্তু পরবর্তী মুহাররমের আগেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করেন। তবে আমাদের জন্য হুকুম রয়ে গেছে যে, ইহুদীদের অনুকরণ ও সামঞ্জস্যতা থেকে বেঁচে থাকার জন্য আশুরার পূর্বে বা পরে আরেকটি রোজা রাখতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মহররম মাসের দশ তারিখ রোজা রাখা সুন্নত; ওয়াজিব নয়। তবে রোজা ফরজ হওয়ার পূর্বে এর শরয়ী মর্যাদা সম্মন্ধে ইমামদের মধ্যে মতভেদ আছে। ইমাম আবু হানীফার (র) মতে, এই রোজা ওয়াজিব ছিল এখন সুন্নত। ইমাম শাফেয়ী (র) বলেন, পূর্বেও এটা সুন্নত ছিলো। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর এখন সুন্নতে যায়েদা বা মুস্তাহাব।

২. বেশী বেশী তওবা ও ইস্তিগফার করা। কেননা এই মাসে তওবা ক্ববুলের সমধিক আশা করা যায়।

৩. পরিবার পরিজনের প্রয়োজনে অন্যান্য দিনের তুলনায় সামর্থ্য অনুযায়ী অধিক ব্যয় করা।

এছাড়া বিশেষ কোন আমল এই দিনের ব্যাপারে বর্ণিত হয়নি।

মহররমের উপলক্ষে বর্জনীয় কাজঃ-

আমাদের সমাজে মহররমকে উদ্দেশ্য করে অনেক কুপ্রথা ও বিদআতি কাজ শুরু হয়েছে। যা থেকে আমাদের বেঁচে থাকা বাঞ্চণীয়। এছাড়া এইসব কাজ কর্মে, আচারÑঅনুষ্ঠাণে, খাওয়া-পানে খরচ হতেও দূরে থাকা উচিত। যেসব কাজ আমাদের সমাজে হয়ে থাকে; তা কোনো সুস্থ মস্তিস্কের লোকেরা করতে বাধ্য হওয়ার কথা নয়। কারণ, এইসব কিছু অহেতুক কাজ আমাদের উপকারের জন্য না হয়ে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। যেমনিকরে তাহাতে অর্থ-সম্পদ অপচয় হয়, তেমনিকরে ঈমানী ক্ষতিরও আশংকা থাকতে পারে। আমাদের যে সব কাজ থেকে বেঁচে থাকতে হবে, তা হলো-

১. তা‘জিয়া নির্মাণ করে আনন্দ করা হতে।

২. ঢাকঢোল ও বাজনা বাজানো হতে।

৩. অনর্থক আহাজারী, অথচ আহাজারী অর্থাৎ মাতম করে কান্না কাটি করাও এক পর্যায়ে কুফুরিতে পরিনত হতে পারে। যা মুসলিম শরীফের কিতাবুল ইমান পর্বে উল্লেখ আছে।

৪. শোকের পোশাক পরা হতে।

৫. ইমাম হুসাইন (রা) এর শোকে কাতর হইয়া শোক মিছিল করা হতে।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পানাহার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা(প্রাঃ), করিমগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ। আইসিটি সম্পাদক, বাংলাদেশ তা’লিমে হিজবুল্লাহ, কিশোরগঞ্জ জেলা শাখা।

Comments are closed.