শীতকালে ভাবনা : নকীবুল হক

সাহিত্য ও সংস্কৃতি ।। পৌষ মাস। সকাল সাতটা বাজে। চারিদিক কুয়াশার চাদরে ঢাকা। শরীরে গরম কাপড় জড়িয়ে একমনে হাটছে আবির। কি যে মজা এই শীতে! কত্তরকমের পিটা, কুয়াশার মাঝে গরম কাপড় গায়ে জড়িয়ে হাটা, ব্যাডমিন্টন খেলা, আসলে শীতের মজাটাই আলাদা, ভাবছে আবির। আবির হাটছে আর ভাবছে। কত ভাবনা আবিরের। কাল বাবা ঢাকা থেকে আসবে, আমার জন্য আরও সুন্দর সুন্দর নতুন জামা আনবে। শীতের নতুন জামা গায়ে জরিয়ে হাটবো,কি যে আনন্দ হবে তখন! ইশ্! বাবা কখন আসবে? কালই তো। কিন্তু আজকের দিনটা যে কেন শেষ হচ্ছে না! আবিরের কাছে আজকের দিনটা একবছরের মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছে। বিশেষ করে তার ভাবনার সময়। হঠাৎই মনে হলো মাদরাসায় যেতে হবে। তাড়াতাড়ি বাড়ি আসল। নাস্তার কাজ সেরে মাদরাসার উদ্দেশ্যে রওনা হল। প্রতিদিনের মতো আজও দুপুর দুই টায় ছুটি হলো মাদরাসা। মাদরাসা থেকে আবিরদের বাড়ির পথে একটা ছাত্রও আসে না। তাই তাকে প্রতিদিন একা একা একা বাড়ি ফিরতে হয়। আজও আবির বাড়ির পথে হাটছে আর ভাবছে বাবা কখন আমার জন্য নতুন জামা নিয়ে আসবে। হাটতে হাটতে আদনানদের বাড়ি পর্যন্ত এসে গেল। আদনান স্কুলে পড়ে। সে তার বিকেলবেলার খেলার সাথি। তাদের বাড়ির কাছে আসতেই দেখে একটি কুকুর ঘুমিয়ে আছে। আবির চতুর্থ শ্রেণিতে পড়লেও কুকুরকে বেশ ভয় পায়। তার সাথে আবার দেখল দুটি দুষ্টু ছেলে কুকুরের গায়ে ঢিল ছুড়ার ফন্দি আঁটছে। আবির কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। এক পা সামনে এগোয় আর এক পা পিছনে। এভাবেই চলছিল। হঠাৎ কে যেন পিছন থেকে আবিরের কাঁধে হাত রাখল। একদিকে কুকুরের ভয়, অন্যদিকে কে আবার গায়ে হাত দিল? আবির ভয়ে থমকে উঠল। পিছনে তাকাতেই হলুদ দাঁতগুলো বের করে একগাল হেসে দিল একটি ছেলে। অনেকদিন যাবৎ হয়তো মিসওয়াক না করার কারণে দাঁতগুলো হলুদ হয়ে গেছে। গায়ে একটি লুঙ্গি আর একটি টি-শার্ট,তাও আবার ছেড়া। শীতে ঠোঁট-মুখ ফেটে যেন ঠিলা পাহাড়ের মতো হয়ে গেছে। “ভয় পেয়ে গেলে নাকি?” ছেলেটি বলল। আবির অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করতে লাগল। কোনো ভয় নেই। চল আমার সাথে, তোমাকে বাড়ি দিয়ে আসবো। তোমাদের বাড়ি কি এই পথেই? ছেলেটি আবিরকে জিজ্ঞাসা করল। আবির মাথা নাড়ল। ছেলেটিকে দেখার পর থেকেই আবিরের মনটা যেন কেমন হয়ে গেল। আবির ফিসফিসে ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কি কর ভাই?” “কি আর করব? এইতো কাগজ কুড়াই। আমিও খুব ভার ছাত্র ছিলাম। কিন্তু বাবা গরিব তাই পড়ালেখা হয়নি। এখন গ্রামে গ্রামে ঘুরে কাগজ কুড়িয়ে যা টাকা পাই তা দিয়েই এই পেটটিকে শান্ত রাখার চেষ্টা করি।” একটি লম্বা শ্বাস ফেলে ছেলেটি বলল। আবির আবার বলল, ভাই তোমার বাড়ি কোথায়? আবারও ছেলেটি একটি লম্বা শ্বাস ফেলল। এইতো আজ তোমাদের গ্রামে এলাম, তাই কিছুদিন তোমাদের গ্রমেই। কয়েকদিন থাকবে তো শীতের কাপড় নিয়ে আসনি? আবিরের এই প্রশ্ন শুনেই ছেলেটি একগাল হাসল। কোনো উত্তর পেলনা আবির। দু’জন এই গল্প করতে করতে আবিরদের বাড়ির কাছে এসে পড়ল। আবির আঙুল দিয়ে ইশারা করে বলল, এইতো আমাদের বাড়ি। এবার তুমি যেতে পার। আচ্ছা বাড়ি যাও বলে ছেলেটি চলে গেল। বাড়িতে এসে আবিড় ভাবছে ছেলেটির হয়তো কোনো শীতের জামা নেই। তাই লজ্জায় আমার কাছে বলেনি। কিন্তু আব্বুকে কেমনে বলি তার জন্যও একটি জামা আনতে। ভাবতে ভাবতে আবির তার সবটুকু সংকোচই দূর করে ফেলল। তার বাবাকে ফোন করে বলল, বাবা! আমার এক বন্ধু আছে, তার কোনো শীতের জামা নেই। তার জন্যও একটি জামা আনতে হবে। আবিরের মুখে এই কথা শুনে তার বাবা অনেক খুশি হল এবং তার প্রস্তাবে রাজি হলো। পরদিন সকালে আবিরের বাবা আসল। দু’সেট শীতের জামা নিয়ে। আবির দেখে খুব খুশি হল। সে মাদরাসায় যাওয়ার সময় ছেলেটির জন্য একটি জামা নিয়ে গেল। বাড়ি থেকে বের হয়ে কিছু পথ যাওয়ার পরই ছেলেটির সাথে সাক্ষাত হল আবিরের। তারপর আবির ছেলেটির হাতে জামার ব্যাগটি তুলে দিয়ে বলল, নাও। বাবা আমার জন্য জামা আনবে বলেছিল। তারপর আমি তোমার জন্যও আনতে বললাম। তাই আব্বু এই জামাটি তোমার জন্য এনেছে। জামাটি খোলা মাত্রই ছেলেটি বলে উঠল, এত সুন্দর জামা আমার জন্য? জামাটির দিকে ছেলেটি কতক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর তার কপোল বেয়ে আনন্দের দু’ফোটা রহস্য মাঠিতে গড়িয়ে পড়ল এবং ছেলেটি ভাবতে লগল, “সবাই যদি আবিরের মতো হতো, তাহলে কি আমাদের আর কষ্টে ভুগতে হত?”

Comments are closed.