ঘাতক ও ঘৃণিত ভিক্ষাবৃত্তি : যৌতুক

Muktijoddhar Kantho , Muktijoddhar Kantho
জানুয়ারি ৯, ২০১৮ ৩:৫৯ অপরাহ্ণ

মাওলানা এসএম আরিফুল কাদের।। যৌতুক প্রথা যুগ যুগ ধরে চলে আসা এক সামাজিক ব্যাধি। যৌতুকের দাবি পূরণ করতে না পারায় ভেঙ্গে গেছে হাজারো বিয়ে, ঘর-সংসার। হারিয়ে গেছে অসংখ্য প্রাণ। এই প্রথার আবর্তে শুধু অসহায় মেয়েরাই বিপন্ন অবস্থার শিকার হয় তা নয়; কন্যা দায়গ্রস্থ পিতা-মাতারাও এই নির্মম অপসংস্কারের বলি হয়।

অত্যাচার চলছে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। পঙ্গুত্ব জীবন কাটাচ্ছে অসংখ্য মা-বোন। কেটে ফেলা হয়েছে কারো কান, উপড়ে ফেলা হয়েছে কারো চোখ, আগুনে ঝলসে দেয়া হয়েছে কারো শরীর, ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে কারো হাত-পা, এসিড মেরে ঝলসে দেয়া হয়েছে কারো মুখ। এ ঘাতক ও ঘৃণিত ভিক্ষাবৃত্তি দ্বারা শুধু স্বামীর কাছ থেকে নয়, শশুর-শাশুড়ি, ননদ-দেবর-ভাসুর সবাই একত্রে মেয়েকে পণ্যের জন্য অকথ্য নির্যাতন করে থাকে। সেই ভয়াবহতা প্রতিরোধ করার উপায় যে কি তা ভেবে কূল পাওয়া যায় না। নির্যাতনের মাত্রা এমনই হয়যে, এ দুর্ভোগে কোন মেয়েকে হয়ত বা শেষ অবধি পৃথিবী থেকেই বিদায় নিতে হয়। বেঁচে থাকলেও ক্ষত-বিক্ষত শরীর আর মন নিয়ে জীবনভর চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়।

প্রিণ্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়ায় এসবের খবর আমরা নিত্যদিনই পাচ্ছি। তবুও যৌতুক বহাল তবিয়তে চালু রয়েছে। এ সমাজে যৌতুক প্রদানও হচ্ছে, গ্রহনও হচ্ছে। ইসলামী শরীয়াহসহ সরকার মহল যৌতুক আদান-প্রদান এবং মধ্যস্থতা করায় ঘৃণ্যতা পোষণ করে বিভিন্ন মত ও পথ দেখিয়ে সংসারে শান্তি ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেমন- পবিত্র কোরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে- “তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ গ্রাস করো না এবং জেনে-শুনে লোকদের ধন-সম্পদের কিয়দংশ অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে বিচারকগণকে উৎকোচ দিও না”। (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৮)

বরপণ দিতে না পারলে শশুড়ালয়ে কনের অত্যাচার-নির্যাতন করার পাশাপাশি হারিয়ে ফেলে স্বামীর সোহাগ। পরিশেষে হয় বিবাহ-বিচ্ছেদ; নচেৎ আত্মহত্যা অথবা লোভী পাষ-দের পরিকল্পিত বধুহত্যা। এই ভয়েই নারী নারীর দুশমন। মাতৃজঠরে কন্যা-ভ্রুণ হত্যা করা হয়। আবার কন্যা জন্মালে স্বামী ও তার বাড়ির লোকজন বধুর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যায়। এদের অবস্থা হয় সেই জাহেলীযুগের মানুষদের মত যা আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন- “কাউকেও যখন কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়। তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায় এবং অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। ওকে যে সংবাদ দেয়া হয় তার গ্লানি হেতু সে নিজ সম্প্রদায় হতে আত্মগোপন করে অপমান সহ্য করে ওকে রেখে দেবে, না মাটিতে পঁতে ফেলবে! সাবধান! ওরা যা সিদ্ধান্ত করে তা অতি নিকৃষ্ট”। (সূরা আন-নাহল ১৬ : ৫৮-৫৯)

পবিত্র কোরআনে যৌতুক আদান-প্রদানে নিষেধপূর্বক আরো ইরশাদ হয়েছে- আর বিয়ের সময় থেকে আজীবন স্ত্রীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব স্বামীর উপর। বিয়ের সময় স্ত্রীকে দেনমোহর (যা যৌতুকের গণ্ডিতে নেই) তথা উপঢৌকন দেয়ার দায়িত্বও স্বামীর। যেমন- “পুরুষরা স্ত্রীলোকদের অভিভাবক, কেননা আল্লাহ তাদের কতককে কতকের উপর শ্রেষ্টত্ব দিয়েছেন এবং এ কারণেও যে, তারা নিজেদের ধন-সম্পদ থেকে স্ত্রীলোকদের জন্য খরচ করে (যা পুরুষদের উপর অবশ্য কর্তব্য)”।    (সূরা আন-নিসা ৩৪)

তা না করে নিজ ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ভোগের জন্য চাপ দিয়ে থাকে অবলা-সরলা, অসহায়, নির্যাতিত, নিষ্পেষিত স্ত্রীজাতিকে। যা ইসলাম হারাম ঘোষণা করেছে এবং পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণিত ভিক্ষাবৃত্তিতে পরিণত হয়েছে। যৌতুক লেনদেন এত জঘন্য অপরাধ ও হারাম বা কবিরা গোনাহ যা হাদীসে নববীতে (স) পাওয়া যায়।

“হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (স) ইরশাদ করেছেন-যদি কোন ব্যক্তি ফেরত না দেয়ার নিয়াতে অর্থপ্রাপ্তির লোভে কোন নারীকে বিয়ে করে, তবে ঐ ব্যক্তি একজন যিনাকারী। আর যে ব্যক্তি ফেরত না দেয়ার নিয়াতে কোন ঋণ গ্রহণ করে, তবে ঐ ব্যক্তি একজন চোর”। (মিশকাতুল মাসাবিহ : আলহাজ্ব মাওলানা ফজলুল করীম এমএ, বিএল সংকলিত) “হযরত আবু হারারাতুর রুকাশা (রা) বর্ণনা করেন। রাসুল (স) ইরশাদ করেন, সাবধান! জুলুম করবেনা। সাবধান! কারো মাল হালাল হয় না, যতক্ষন না সে সন্তষ্টচিত্তে তা প্রদান না করে”। (মিশকাত শরীফ)

অত্র হাদীসে জুলুম বলতে যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে চাপে ফেলে নির্যাতন করে বাবার বাড়িতে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। মনে রাখা উচিত যে, যাকে আপনি শরীয়াহ মোতাবেক দেনমোহর ব্যবস্থার মাধ্যমে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন; সেতো আপনার দাসী বা চাকরানী নয়। তাকে জুলুম-অত্যাচার করে উপযুক্ত জিনিসের জন্য যে পাঠিয়েছেন তার ফলাফল খুবই ভয়াবহ। যেমন- হাদীসে এসেছে “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, নবী করীম (স) হযরত মুয়াজ (রা) কে ইয়ামানে পাঠানোরকালে বলেন, মজলুমের বদদোয়াকে ভয় কর, কেননা তার বদদোয়া ও আল্লাহর মাঝে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকে না অর্থাৎ মজলুসের দোয়া বিনা পর্দায় আল্লাহর কাছে ক্ববুল হয়”। (সহীহ বুখারী ২২৮৬ নং হাদীস এবং ৩৪৪ পৃষ্টা দ্র.)

বিদায় হজ্বের ভাষণে নবী করীম (স) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন- “নিঃসন্দেহে তোমাদের জান, মাল, ইজ্জত, আব্রু তোমাদের পরস্পরের জন্য এমনভাবে সংরক্ষিত, যেমন হজ্বের দিবসটি, হজ্বের মাসও মক্কায় সংরক্ষিত। সুতরাং কারো জান-মাল, ইজ্জত আব্রুতে হস্তক্ষেপ করা হজ্বের সম্মানিত দিবসে হারাম শরীফের উপর হামলার মতো অপরাধ”। (সহীহ বুখারী ১৭৩৯, সহীহ মুসলিম ১৬৭৯ নং হাদীস)

ঠিক তেমনি; স্ত্রীজাতির জান, মাল, ইজ্জত-আব্রু স্বামীর জন্য এক মহা আমানত। যে আমানত নষ্ট করা হজ্বের সম্মানিত দিবসে হারাম শরীফের উপর হামলার শামিল।

যৌতুক হারাম হওয়ার বিষয়ে কুরআন, হাদীসসহ ফতোয়ার কিতাবে উল্লেখ আছে যে, “কোন পক্ষ যেওরের শর্ত করা নিষেধ এবং ছেলের পক্ষ থেকে যৌতুক চাওয়া সম্পূর্ণ হারাম”।(আহসানুল ফতোয়া ৫ : ১৩)

এককথায় বলতে পারি যে, কোন পক্ষকে বিশেষ করে কনে পক্ষকে টাকা, বাড়ি, গাড়ি, মোটরসাইকেল ইত্যাদি সহ যে কোন বিষয়ে বিয়ের পূর্বে বা পরে স্ত্রী বা স্ত্রীর পরিবারবর্গের উপর একান্ত চাপানো বড় গর্হিত কাজ। শুধু তাই নয়; এ আগ্নি দগ্ধে স্ত্রীকে পোড়ালে নিজেকে সংসারে বা সমাজে খাটো করার পাশাপাশি নেমে আসবে সুখের জীবনে এক ধরণের মারত্মক ভয়াবহতা। যা দুনিয়া জীবন থেকে শুরু করে পরকালীন জীবনে অশান্তি ছাড়া আর কি হতে পারে?

এবার প্রশ্ন আসতে পারে যে, কনে পক্ষ যদি খুশি হয়ে বরকে বা বর পক্ষকে কোন কিছু উপঢৌকন দেন, তাহলে ইসলামী শরীয়াহ মোতাবেক এর হুকুম কি হতে পারে? উত্তরে আমি বলব, “ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান”। সকল সমস্যার সমাধান রয়েছে এই ইসলামে। ঠিক উক্ত প্রশ্নের জবাবও ইসলাম ১৫০০বছর পূর্বে দিয়েছে।যেমন-

“হযরত আলী (রা) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসুলে আকরাম (স) হযরত ফাতিমা (রা) কে বড় পাড়ওয়ালা চাদর, পানির পাত্র, এমন বালিশ বা উপাদান যার উপরের খোলটা চামড়া দিয়ে তৈরী এবং ভিতরে সুগন্ধিযুক্ত ঘাস ভর্তি থাকে, তা দিয়েছিলেন”।    (মুসনাদে আহমাদ)

অন্য বর্ণনায় পাওয়া যায়, প্রিয় নবী (স) তাঁর কন্যা হযরত ফাতিমা (রা) কে বিয়েতে মেয়ের সংসারের জন্য একটি জাঁতা (ডাউল বা চাউল ভাঙ্গার যন্ত্র বিশেষ) উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। আরেক বর্ণনায় পাওয়া যায় তিনি (স) হযরত ফাতেমা (রা) কে একটি পশমে নির্মিত সাদা রঙ্গের চাদর, একটি ইজখির ঘাস নির্মিত বালিশ এবং চর্ম নির্মিত পানির মশ্ক দিয়েছিলেন।  (আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ) উপরোক্ত হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, কনেকে বিয়েতে তার নিজের ও সংসারের কাজের জন্য কিছু জিনিসপত্র দেয়া সুন্নাত ছাড়া বৈ কি? পূর্বে উল্লেখিত বিষয়ে হয়তো অনেকে মন্তব্য করে এবং মনে মনে কষ্ট পেয়ে থাকার সত্যেও বা মেয়েকে মেয়ের জামাতাকে কোন কিছু না দেয়ায় খুশি হওয়ার পরও নবী করীম (স) এর সুন্নাত পালনে অর্থাৎ কনেকে বা বরকে খুশি হয়ে কোন কিছু দেয়া প্রথা নয় বরং সুন্নাতে নববী (স)। আর সুন্নাত পালনের ক্ষেত্রে বিশ্বনবী (স) এর উম্মত হিসেবে আমাদের একান্ত কর্তব্য বলে মনে করি।

উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে যৌতুক হারাম বা কবিরা গোনাহ হিসেবে পরিলক্ষিত হওয়ায় সে দাবানল থেকে নারীজাতিকে রক্ষা করা শুধুমাত্র সরকারই নয়, বরং আলেম সমাজসহ সমাজের সকল শ্রেণির ব্যক্তিবর্গ সরকারের প্রদত্ত যৌতুক নিরোধ আইন ১৯৮০, ২০০০ ও ২০০৩ প্রয়োগ করে সরকারকে সহযোগতিার মাধ্যমে কনে লোভী বা আত্মসাথকারী বরও বর পক্ষকে শাস্তির ব্যবস্থা করে সমাজে অবহেলিত
নারীজাতিকে সঠিক মর্যাদার আসনে সমাসীন সমাজ ও দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সকলেই একযোগে কাজ করি। নতুবা নিপীরিত, নির্যাতিত, অবহেলিত নারী সমাজের হৃদয় কাঁদানো আহাজারীতে ধ্বংস হবে জালিম, লোভী যৌতুক ভক্ষনকারীসহ সমাজের নিরপরাদ জনগোষ্টি। সেই মহামারী থেকে ফিরিয়ে আসার কোন পথ পাওয়া যাবে না।

এজন্যই আল্লাহ পাক বলেন- “স্থলে ও জলে যে সমস্ত বিপদ প্রকাশ হয়, সব কিছুই মানুষের হাতের কামাই করা”। (সূরা রুম : ৪১) এবার চিন্তা করে দেখা যাক! বিপর্যয় যেসময় আবির্ভুত হয়, তখন কি শুধু পাপীদের উপর হয় না সর্বসাধারণগণও ভোগ করতে হয়? তাই নিজেকে, সমাজকে ও রাষ্ট্রকে এই পাপের দায়ে আবির্ভুত বিপর্যয় হতে রক্ষা পাবার জন্যে সকলে একসাথে বলি- “যৌতুক দিবো না, যৌতুক নিবোও না।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পানাহার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা(প্রাঃ), করিমগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ।আইসিটি সম্পাদক, বাংলাদেশ তা’লিমে হিজবুল্লাহ, কিশোরগঞ্জ জেলা শাখা।

Comments are closed.