শিক্ষককে মারধর,জঙ্গি আস্তানা সহ ২০১৭ সালে রাজশাহীর আলোচিত ঘটনা

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ,
জানুয়ারি ১২, ২০১৮ ৭:০৬ অপরাহ্ণ

কালের আবর্তে হারিয়ে গেলো আরো একটি বছর ২০১৭ সাল। ২০১৭ সাল বিভিন্ন ঘটনার কারণে টক অব দ্যা রাজশাহীতে পরিণত হয়। এরমধ্যে কয়েকটি ঘটনা রাজশাহী এবং বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাচ্যর ক্যাম্ব্রিজ বলে
খ্যাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বছরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।

তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, রাজশাহী মহানগর পুলিশের রাজপাড়া থানার সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার সরফরাজের মৃত্যু, ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী ও মালদ্বীপের ভোগের বিখ্যাত মডেল কণ্যা রাউধা অতিফের মৃত্যু, রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে জঙ্গি আস্তানা, তানোরে জঙ্গি আস্তানা, রাবিতে ক্যাম্পাসের ভিতর থেকে প্রকাশ্য দিবালোকে ছাত্রীকে অপহরণ, সম্পত্তির জন্য পুত্র কর্তৃক পিতাকে হত্যা, ছাত্র কতৃক শিক্ষককে মারধর, দুই শিশুর মাপলার দিয়ে ট্রেন থামানো,ইয়াবা ব্যবসা চক্রের তালিকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী কর্মচারীদের নাম, শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌতুক মামলায় গ্রেফতারী পরোয়ানা, সাংবাদিককে হত্যা চেষ্টা, ছাত্রলীগের অস্ত্র হাতে শোডাউন, কেন্দ্রীয় সভাপতি সম্পাদকসহ ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে শিবিরের মামলাসহ নানা ঘটনা।

মডেল রাওধার মৃত্যুঃ গত ২৯ শে মার্চ দুপুরে রাজশাহী ইসলামি ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছাত্রী হোস্টেলের ২০৯ নম্বর কক্ষ থেকে রাউধা আতিফের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর ১২ দিন পর গত ১০ই এপ্রিল তার সহপাঠী সিরাতকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন রাউধার বাবা ডা. মোহাম্মদ আথিফ। কিছুদিন যেতে না যেতেই রাওধা আতিফের বাবা রাজশাহীতে মেয়ের বিচার চাইতে এসে এক মেয়েকে বিয়ে করে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেন। বিষষয়টি কিছুদিন রাজশাহীর মানুষের মুখে মুখে ব্যাপক আলোচিত ও সমালোচিত ছিল। মামলায় পুলিশের চার্জশিটে একে আত্মহত্যা বলা হয়। কিন্ত এতে মামলার বাদী রাউধার পিতা আপত্তি করেন। তারপর সিআইডি এবং বর্তমানে গত ২৩শে ডিসেম্বর থেকে পিবিআই নতুন করে তদন্ত শুরু করেছে।

জঙ্গিআস্তানাঃ গত ১১ই মে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়নের বেনীপুর গ্রামে জঙ্গি আস্তানায় অপারেশন ‘সান ডেভিল’র অভিযান শুরু হলে জঙ্গিরা সংঘবদ্ধভাবে আক্রমণ চালিয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মী আব্দুল মতিনকে
ধারালো অস্ত্র কুপিয়ে ও খুন্তি দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। পুলিশ পাল্টা গুলি ছুড়লে ও জঙ্গিদের বিস্ফোরণে পাঁচ জঙ্গি নিহত হন। তবে জঙ্গিসাজ্জাদের বড় মেয়ে সুমাইয়া (২৮) তার দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে আত্মসমর্পণ করেন।

এর রেশ কাটতে না কাটতেই গত ১১ই জুন তানোর উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের ডাঙাপাড়া গ্রামে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে চার শিশুসহ প্রায় ১২ জনকে আটক করে পুলিশ। এই অভিযানের সময় ওই বাড়ি থেকে দুইটি সুইসাইডাল ভেস্ট, ৫ রাউন্ড গুলিসহ পিস্তল উদ্ধার করা হয়।

প্রকাশ্যে দিবালোকে রাবি হল থেকে ছাত্রীকে অপহরণঃ ১৭ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ছাত্রী হল বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের সামনে থেকে প্রকাশ্যে দিবালোকে উম্মে শাহী আম্মানা শোভা নামে এক আবাসিক শিক্ষার্থীকে অপহরণ করার ঘটলে দেশ জুড়ে সৃষ্টি হয় ব্যাপক সমালোচনা। এরপ্রেক্ষিতে ভিসির বাসভবন ঘেরাও, দিনব্যাপী ব্যাপক বিক্ষোভ ও গণআন্দোলনের মুখে একদিন পর অপহৃত শিক্ষার্থীকে উদ্ধার ও অপহরনকারী সোহেল রানাকে গ্রেফতার। করে পুলিশ। শোভার সাবেক ‘স্বামী’ সোহেল রানার নেতৃত্বে তিন চার জন যুবক একটি মাইক্রোবাসে জোর করে তাকে তুলে নিয়ে গেলে এ আন্দোলনের ঘটনা ঘটে।

বছরের শেষদিকে ১৮ই ডিসেম্বর বাঘার দুই শিশুর বুদ্ধিমত্তায় তেলবাহী একটি ট্রেন দুর্ঘটনার কবল থেকে রক্ষা পায়। সেদিন সকাল ৯টায় ভাঙ্গা রেললাইন দেখে লাল মাফলার দেখিয়ে ট্রেনটি থামায় সিহাবুর ও টিটোন নামের দুই শিশু। ঘটনার পর থেকেই রাজশাহীতে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হওয়ার পর পশ্চিমাঞ্চল রেল, জেলা প্রশাসন, বিভাগীয় প্রশাসন সহ অন্যান্য সংগঠনের উদ্যোগে তাদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

শিক্ষককে মারধর, শিক্ষার্থীকে স্থায়ী বহিস্কারঃ গত ২৫ সেপ্টেম্বর ইন্টার্নশিপ পেপারে স্বাক্ষর করানো নিয়ে রাবি ব্যবসায়
প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) প্রফেসর মো. হাছানাত আলীকে বেধড়ক মারধর করে ওই ইনস্টিটিউটের এক শিক্ষার্থী। মারধরকারী শিক্ষার্থী আবু নাহিদ মোহাম্মদ হায়দার ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) এমবিএ (দিবা) নবম ব্যাচের
শিক্ষার্থী। তাকে আটক করে নগরীর মতিহার থানায় পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়। গত ৭ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. এম. আব্দুস সোবহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ৪৭৪তম সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষককে মারধরের থটনায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়।

গত ৪ জুলাই স্ত্রীর দায়ের করা যৌতুকের মামলায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের প্রফেসর ড. মো. হাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারির আদেশ দেন আদালত। গত ৩০ এপ্রিল প্রফেসর
হাফিজুর রহমান স্ত্রীর কাছে ৫০ লক্ষ টাকা যৌতুক দাবি করে স্ত্রী- সন্তানদের ভাড়া বাড়িতে রেখে চলে গেলে নানাভাবে আপোষ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হওয়ায় মামলার বাদী হয়ে আদালতেমামলা স্ত্রী। এ ঘটনা ক্যাম্পাসে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

সাংবাদিককে হত্যা চেষ্টা, ছাত্রলীগ নেতাদের বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহারঃ ১০ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে ছাত্রলীগ কতৃক বাস ভাঙচুরের ছবি তুলতে গেলে ডেইলি স্টারের রাবি প্রতিনিধি আরাফাত রহমানকে বেধড়ক মারধর করে হত্যার চেষ্টা করে ছাত্রলীগের ৫-৭ নেতাকর্মী। সংবাদমাধ্যমে মারধরের খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর ওইদিন সন্ধ্যায়
ছাত্রলীগেরর দুইজনকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় কমিটি। এছাড়া ওই রাতেই ছাত্রলীগের চার নেতার নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ৮-১০ জনকে আসামি করে নগরীর মতিহার থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা দায়ের করে ভূক্তভোগী সাংবাদিক। কিন্তু আসামীদেরতো গ্রেফতার করা হয়নি, অন্যদিকে ১৬ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি সেক্রেটারীর সুপারিশের পরিপেক্ষিতে মারধরের ঘটনায় বহিষ্কৃত এক ছাত্রলীগ নেতার বহিষ্কারাদেশ করেছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ।

ইয়াবা চক্রের তালিকায় রাবি ও রুয়েটের শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মচারীর নাম, দেশ ব্যাপী সমালোচনার ঝড়, সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলাঃ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের মাদক শাখার গোপন গোয়েন্দার রিপোর্টের আলোকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ও রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে (রুয়েট) ঘিরে গড়ে ওঠা ইয়াবা ব্যবসা চক্রের ৪৪
জনকে শনাক্তের খবর ১০ নভেম্বর জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশ হলে দেশ ব্যাপাী ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ওই তালিকায় রাবির ৩৪ জন ও রুয়েটের ১০ জন শিক্ষক-কর্মচারী-শিক্ষার্থী  ও রাজশাহী অঞ্চলভুক্ত পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) চারজন কর্মকর্তার নামও ইয়াবা চক্রের তালিকায় উঠে আসে এই গোয়েন্দা রিপোর্টে।
সংবাদ প্রকাশের জের ধরে তিন সাংবাদিকের নামে ৫০০, ৫০১ ও ৫০২ ধারায় মানহানির মামলা দায়ের করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের দু’জন নেতা।

রাজশাহীর পবা উপজেলায় সম্পত্তির জন্য পিতাকে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে খুন করে ছেলে। ঘটনার পর তার ছোট ভাই বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করে। আসামী পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে।

গত ২১ সেপ্টেম্বর রাবির শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করার ঘটনায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি- সম্পাদকসহ ২৪ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে রাজশাহী চীফ মেট্রোপলিটন মেজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক নাবিউল ইসলাম। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছাত্রশিবিরের ১৩ জন নেতাকর্মীকে মারপিট করায় ১৪৩, ১৪৭, ১৪৮, ১৪৯, ৩০৭, ৩২৩, ৩২৪, ৩২৫ ও ৩২৬ ধারায় এ মামলা দায়ের করলে ক্যাম্পাসে ব্যাপক আলোচিত হয় ঘটনাটি।

ভর্তি পরীক্ষার রাতে ছাত্রলীগের অস্ত্র হাতে শোডাউনঃ গত ২১ অক্টোবর রাতে প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলকে প্রতিহতের মাধ্যমে পরীক্ষার প্রথম রাতেই অস্ত্রবাজী দিয়ে শুরু হয় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগের শুভেচ্ছা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে ছাত্রদলের পোষ্টার, ব্যানার লাগানো হচ্ছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে বের হয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
আধাঘন্টাব্যাপী ‘হই-হই রই-রই, ধর-ধর, মার- মার’ চিৎকারে গোটা ক্যাম্পাস ও আশেপাশের এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়ায়
ছাত্রলীগ। তাছাড়া ওই রাতে চাপাতি, রাম-দা ও লোহার রড ঠেকিয়ে ইচ্ছেকৃতভাবে উচ্চশব্দ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এতে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যু; প্রশাসন ভবন ঘেরাওঃ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের উপ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক সানিউর রহমান হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলে জানাজায় অংশ নিতে তার গ্রামের বাড়ি যাওয়ার জন্য  বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বাস চায়। কিন্তু ভিসি প্রফেসর ড. এম আব্দুস সোবহান বাস দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে ক্যাম্পাসের বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়ে প্রশাসন ভবন অবরোধ করে রাখেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও
ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

এসব ঘটনা নিয়ে রাজশাহী বছরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

সর্বশেষ পাওয়া