ছাতক সিমেন্ট কারখানায় অনিয়ম দুর্নীতি, ৯২ লাখ টাকার ভুয়া ব্যাংক ড্রাফট : তদন্ত কমিটি

আরিফুর রহমান মানিক, ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি ।। ছাতক সিমেন্ট কারখানা যেন দুর্নীতিবাজদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত এ কারখানার অভ্যন্তরীণ এসব অনিয়ম-দুর্নীতি চলছেই। একটি সংঘবদ্ধ চক্র ভুয়া কাগজপত্রে প্রায় কোটি টাকার সিমেন্ট তুলে নিয়ে গেছে। এ ঘটনায় সর্বত্র ব্যাপক তোলপাড় চলছে।

অভিযোগে জানা গেছে, ছাতক সিমেন্ট কারখানা থেকে ভুয়া কাগজপত্রে কোটি টাকার সিমেন্ট তোলার পর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিভিন্ন ব্যাংকের ১৭টি চেক দিয়ে বিষয়টি কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিষ্পত্তি করেছে সম্পা এন্টারপ্রাইজ ও হানিফ এন্টারপ্রাইজ। এসব প্রতিষ্ঠান ছাতক সিমেন্ট কারখানার নতুন প্রজেক্টের ডিপিডি আবদুর রহমান বাদশার মাধ্যমে এ ভয়াবহ জালিয়াতি করে জাল কাগজে ৯২ লাখ টাকার সিমেন্ট তুলেছে। ব্যাংকের ক্রেডিট ভাউচার জাল করে এসব সিমেন্ট তোলা হয়েছে। ১৩ ডিসেম্বর ছাতক পূবালী ব্যাংকের দেয়া মাসিক হিসাব বিবরণীতে এ জালিয়াতির ঘটনায় কারখানার হিসাব কর্মকর্তা রেজাউল করিম ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেন। এতে জাল ক্রেডিট ভাউচার দিয়ে কারখানার ৯২ লাখ টাকার সিমেন্ট তোলা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

জানা গেছে, সম্পা ও হানিফ এন্টারপ্রাইজের নামে ভুয়া ৭টি ভাউচারে ৯২ লাখ টাকা ছাতক পূবালী ব্যাংকে পেমেন্ট দেখানো হলেও এগুলো ছিল জাল। পরে কারখানা ও ব্যাংক হিসাবে গরমিলের জন্য ঘটনার ব্যাপারে অধিকতর তদন্তে ধরা পড়ে।

সূত্র জানায়, রূপালী ব্যাংক ঢাকার একটি শাখায় সম্পা ও হানিফ এন্টারপ্রাইজের দেয়া ২ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি ভুয়া ও জালিয়াতির মাধ্যমে দেয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তাকে ধমক দিয়ে ব্যাংক গ্যারান্টির টাকা পরিশোধের বিষয়টিও জাল জালিয়াতির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করেন আবদুর রহমান বাদশা। জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত রয়েছে কারখানার নতুন বিএমআরই প্রজেক্টের শীর্ষ কর্মকর্তা বাদশাসহ কারখানার হিসাব বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা।

এ ঘটনায় ছাতক সিমেন্ট কারখানার হিসাব কর্মকর্তা আতিকুল ইসলামসহ ৪ জনকে শোকজ করা হয়েছে বলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নেপাল কৃষ্ণ হাওলাদার জানান। হাতিয়ে নেয়া ৯২ লাখ টাকার ব্যাপারে কম্প্রোমাইজ হয়েছে বলেও দাবি করেন। জানা গেছে, কেপিএম থেকে দুর্নীতির অভিযোগে বদলিকৃত জনৈক কর্মকর্তা কারখানার লুটপাটের মূল হোতা বলে স্থানীয়রা জানান। এ ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনায় ছাতক সিমেন্ট কারখানার রোপওয়ের বিভাগীয় প্রধান মাহবুব এলাকে প্রধান করে ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিসিআইসি।

এ টিমের তদন্তে জালিয়াতিসহ লুটপাটের ঘটনায় জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে আবদুর রহমান বাদশার নাম চলে আসে। একটি সূত্র জানায়, নতুন প্রজেক্টের ডিপিডি আবদুর রহমান বাদশা কারখানার বড় ধরনের লুটপাট, অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। ওই কর্মকর্তা বিনা টেন্ডারে মাত্র ৩৫ লাখ টাকায় কারখানার পাওয়ার প্ল্যান্ট বিক্রি করেছিল। পরে এলাকাবাসীর প্রতিবাদের মুখে টেন্ডার দিয়ে এটি আড়াই কোটি টাকা বিক্রি করা হয়। এ ছাড়া গত ১ বছরে কারখানার নামে ভারত থেকে আসা প্রতি টন ১৮শ’ টাকার চুনাপাথর খোলাবাজারে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে কারখানার কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বাদশাসহ একটি সিন্ডিকেট। এভাবে নতুন বিএমআরই প্রজেক্টের উত্তোলিত ১৩ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ১ কোটি টাকার কাজ দেখিয়ে ১২ কোটি টাকা লাপাত্তা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে। সম্পা এন্টারপ্রাইজ ও হানিফ এন্টারপ্রাইজের পরিচালক রুবেল মিয়া জানান, সিমেন্টের টাকা নিয়ে কারখানার সঙ্গে তার কিছু জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল। বিষয়টি সমাধান হয়ে গেছে।

এ ব্যাপারে ছাতক সিমেন্ট কারখানার সিবিএ সেক্রেটারি আবদুল কুদ্দুছ জানান, সম্প্রতি কারখানায় একটি জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। বিএমআরই নতুন প্রজেক্টের ১৩ কোটি টাকা এ পর্যন্ত তোলা হয়েছে। তবে এসব টাকার কাজ চলমান রয়েছে। ডিপিডি আবদুর রহমান বাদশা তার বিরুদ্ধে আনীত লুটপাট ও জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এ ব্যাপারে তার সংশ্লিষ্টতা নেই। ছাতক সিমেন্ট কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নেপাল কৃষ্ণ হাওলাদার সম্পা এন্টারপ্রাইজ ও হানিফ এন্টারপ্রাইজের বিষয়টি কম্প্রোমাইজ হয়েছে। তবে এ বিষয়ে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কারখানার ৪ কর্মকর্তাকে শোকজ করার বিষয়ে তিনি জানান, বিএমআরই প্রজেক্টের বিষয়ে তার কিছু জানা নেই।

Comments are closed.