ন্যায়বিচার হলে বেকসুর খালাস পাওয়ার আশা খালেদার

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ,
ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৮ ১০:৩৯ অপরাহ্ণ

ডেস্ক রিপোর্ট ।। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে ন্যায়বিচার হলে বেকসুর খালাস পাওয়ার আশা করছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। পাশাপাশি ইনসাফ পাওয়া নিয়ে সংশয়ও প্রকাশ করেন তিনি।

কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত নন দাবি করে প্রাক্তন এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যদি শাসকমহলকে তুষ্ট করার জন্য অন্যরকম কোনো রায় হয়, তাহলে তা কলঙ্কের ইতিহাস হয়ে থাকবে।’

বুধবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় তার পাশে দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারণ রয়েছে। ওই মামলায় খালেদা জিয়া প্রধান আসামি। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ের একদিন আগে এই সংবাদ সম্মেলন করলেন তিনি।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে আসা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের দায়েরকৃত আলোচিত মামলার দুই পক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ মো. আখতারুজ্জামান রায়ের দিন আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি ঠিক করেন।

ওই মামলা প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আদালত রায় দেওয়ার বহু আগে থেকেই শাসকমহল চিৎকার করে বলে বেড়াচ্ছে, আমার জেল হবে। যেন বিচারক নন, ক্ষমতাসীনরাই রায় ঠিক করে দিচ্ছে। প্রধান বিচারপতিকে চাপের মুখে পদত্যাগ ও দেশত্যাগে বাধ্য করার পর কোনো আদালত শাসকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ কায়েম করতে সাহস পাবে কি না, তা নিয়ে সকলেরই সন্দেহ আছে।’

‘তারপরেও দেশবাসীর উদ্দেশে সগৌরবে জানাতে চাই যে, আপনাদের খালেদা জিয়া কোনো অন্যায় করেনি। কোনো দুর্নীতি আমি করিনি। এ মিথ্যা মামলায় ন্যায়বিচার হলে আমার কিছুই হবে না। ইনশা আল্লাহ্ আমি বেকসুর খালাস পাব। আর যদি শাসকমহলকে তুষ্ট করার জন্য অন্যরকম কোনো রায় হয়, তাহলে তা কলঙ্কের ইতিহাস হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের মানুষ অন্যায়কারী কাউকেই ক্ষমা করে না, করবে না।’

যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছেন জানিয়ে প্রাক্তন এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত আছি। আমাকে জেল বা সাজার ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ হবে না। আমি মাথা নত করব না। জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি থেকে পিছু হটব না।’

‘জনগণকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। আমাকে রাজনীতির ময়দান ও নির্বাচন থেকে দূরে রাখা এবং জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য আদালতকে ব্যবহার করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু তাতেই একদলীয় শাসন কায়েম ও খালি মাঠে গোল দেওয়ার খায়েশ পূরণ হবে বলে আমি মনে করি না।’

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অর্থের উৎস সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কুয়েতের তৎকালীন আমীরের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। তার নামকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য কুয়েতের আমীর যে অনুদান প্রদান করেন তা তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমানের উদ্যোগে নিয়ে আসা, তিনিই অর্থের বিলিবণ্টন, তহবিল পরিচালনা করেন।’

‘জিয়া অরফানেজের সঙ্গে আমি কখনো কোনোভাবেই জড়িত ছিলাম না। তা ছাড়া এই অর্থ সরকারি অর্থ নয় এবং ট্রাস্টটিও প্রাইভেট ট্রাস্ট। ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে এ মিথ্যা মামলায় আমাকে জড়িত করা হয়েছে। আমার আইনজীবীরা আদালতে তা প্রমাণ করেছেন। সব চেয়ে বড় কথা হচ্ছে, জিয়া অরফানেজের একটি টাকাও তছরূপ হয়নি। সমস্ত টাকা প্রতিষ্ঠানের নামেই ব্যাংকে জমা আছে। এখন সুদাসলে সেই টাকা বেড়ে প্রায় তিনগুণ হয়েছে।’

বিএনপি প্রধান বলেন, ‘দেশে ন্যূনতম আইনের শাসন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকলে এই জালিয়াতিপূর্ণ মামলা যারা দায়ের করেছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হওয়া উচিত। যারা এই মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়েছে তাদেরও সাজা হওয়া উচিত।’

আদালতকে ব্যবহার করে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সরকার ষড়যন্ত্র করছে অভিযোগ করে ‘গণতান্ত্রিক আন্দোলন’ করতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান বিএনপি চেয়ারপারসন।

‘আপনারা গণতন্ত্রের জন্য, অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য, জনগণের সরকার কায়েমের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য ছাত্র, জনতাকে আহ্বান জানাই এগিয়ে আসতে। বিএনপি, ২০ দলসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক দল, কৃষক-শ্রমিকসহ সকল শ্রেণি পেশার মানুষকে আমি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি।’

‘আওয়ামী লীগেও অনেকে আছেন যারা গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারে বিশ্বাস করেন এবং ভবিষ্যত পরিণতির কথা ভাবেন। তাদের প্রতিও আমার একই আহ্বান রইলো,’ বলেন তিনি।

রায়কে কেন্দ্র করে সরকার ভীত হয়ে জনগণের প্রতিবাদের অধিকার বন্ধ করেছে অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘রায়কে কেন্দ্র করে শাসকমহল আমাদের চেয়ে বেশি অস্থির-ভীত হয়ে জনগণের চলাচলের অধিকার, প্রতিবাদের অধিকার, সভা-মিছিলের সাংবিধানিক অধিকার প্রশাসনিক নির্দেশে বন্ধ করছে। ভিত্তিহীন ও মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিবাদের ভয়ে ভীত হয়ে এ হীন পথ খুঁজে নিয়েছে সরকার। সারা দেশে তারা বিভীষিকা ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। জনগণের প্রতিবাদের সম্ভাবনাকে তারা এতটাই ভয় পায়!’

বিএনপি সংঘাত চায় না জানিয়ে ক্ষমতাসীনদের ‘শান্তির পথে আসার’ আহ্বান জানান বিএনপি চেয়ারপারসন।

‘আগামীতে অনেক ফাঁদ পাতা হবে, অনেক ষড়যন্ত্র হবে, সবাই সাবধান ও সতর্ক থাকবেন। বুঝে-শুনে কাজ করবেন। এই দেশ আমাদের সকলের। কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়। আমরা সংঘাত, হানাহানি, নৈরাজ্য চাই না। আমরা শান্তি চাই। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। এখনো আমরা আশা করে বসে আছি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হবে। সেই প্রত্যাশা রেখেই আহ্বান জানাই, হুমকি-ধামকি ও নির্যাতনের পথ ছেড়ে আসুন, আমরা আলোচনার মাধ্যমে শান্তির পথে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করি।’

বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও রাজনীতিতে নিজের অবদান তুলে ধরে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমি কম বয়সেই স্বামী হারিয়েছি। দেশের জন্য জিয়াউর রহমান জীবন দিয়েছেন। দলের নেতা-কর্মীদের দাবিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় রাজনীতির বিপদসংকুল পথে পা বাড়িয়েছি। আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তির জীবন বিসর্জন দিয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘আমার প্রিয় দেশবাসী আমাকে তার প্রতিদান দিয়েছে অপরিমেয় ভালোবাসায়। প্রতিবারের নির্বাচনে পাঁচটি করে আসনে পর্যন্ত তারা আমাকে নির্বাচিত করেছেন। কোনো নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে আজ পর্যন্ত আমি পরাজিত হইনি। জনগণের সমর্থনে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হবার গৌরব আমি অর্জন করেছি। তিন-তিনবার তারা আমাকে প্রধানমন্ত্রী করেছেন। আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।’

দেশবাসীকে উদ্দেশ করে বিএনপি নেত্রী বলেন, ‘রাজনীতির অঙ্গনে পা রাখার পর থেকে আমি জনগণকে যতটা সময় দিয়েছি, পরিবার ও সন্তানদের ততটা সময় দিতে পারিনি। কারাগারে থাকতে আমি আমার মাকে হারিয়েছি। অফিসে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় আমি একটি সন্তান হারিয়েছি। আরেকটি সন্তান নির্যাতনে পঙ্গু হয়ে দূরদেশে এখনো চিকিৎসাধীন। আমার এই স্বজনহীন জীবনেও দেশবাসীই আমার স্বজন। আল্লাহ্ আমার একমাত্র ভরসা। আমি যেমন থাকি, যেখানেই থাকি যতক্ষণ বেঁচে থাকবো দেশবাসীকে ছেড়ে যাব না।’

বিএনপি চেয়ারপারসন তার বক্তব্যে দাবি করেন উন্নয়নের নামে শোষণ, বঞ্চনা, লুটপাট ও অত্যাচারের এক দুঃসহ দুঃশাসন আজ জনগণের বুকের ওপর চেপে বসেছে। তিনি বলেন, ‘এই স্বৈরশাসন জনগণকে ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। তারা মানুষকে আজ ভাতে মারছে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। মানুষের কাজের সংস্থান নেই। চাকরির খোঁজে লুকিয়ে বিদেশে যাবার পথে আমাদের তরুণেরা সাগরে ডুবে মরছে। উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় পাঁচ-দশ গুণ বাড়িয়ে এরা লুটের রাজত্ব কায়েম করেছে। কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট স্থাপনের নামে বিদ্যুৎ খাতকে বানিয়েছে হরিলুঠের কারখানা। শেয়ার বাজার এরা লুটে খেয়েছে। অর্থ লোপাট করে ব্যাংকগুলো করে ফেলেছে দেউলিয়া। বিদেশে পাচার করছে হাজার হাজার কোটি টাকা। সুইস ব্যাংকে এরা পাচার করা অর্থের পাহাড় গড়েছে।’

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি নেতাদের মধ্যে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেনেন্ট জেনারেল মাহবুবুর রহমান, মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

Comments are closed.