ফিচার - March 14, 2018

ভারত নিরজাকে আঁকড়ে রাখে শ্রদ্ধায়, আর আমরা পৃথুলাকে…

ডেস্ক রিপোর্ট ।। যেদিন ইউএস বাংলার বিমান বিধ্বংস হলো, সেইদিনই মিরপুরে বস্তিতে আগুন লেগে হাজারটা পরিবার গৃহহীন হলো। তার কিছুদিন আগেই ট্রাক দুর্ঘটনায় কয়েকজন শ্রমিকের জীবন গেল। এবং বাংলাদেশে হরহামেশাই এখানে ওখানে লোক মারা যাচ্ছেন। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, ফেসবুকে কেবল “বড়লোকদের” নিয়েই শোক করতে দেখা যায় কেন? বস্তির মানুষ বা শ্রমিকগণ বা বাস/লঞ্চ যাত্রীদেরও তো পরিবার আছেন, স্বজন আছেন – তাঁদের প্রাণও তো মানুষেরই প্রাণ।

দেখুন, বিমান যাত্রীদের নিয়ে মানুষের বুকে হাহাকার উঠার প্রধান কারন হচ্ছে তাঁদের ফেসবুকের পোস্টগুলো। বিমানে উঠার আগে আগে তাঁরা ছবি দিয়েছেন, কত সুন্দর হাসিখুশি কিছু মানুষ ছুটিতে আনন্দ করতে যাচ্ছেন নেপালে, এবং মাত্র একঘন্টার মধ্যেই তাঁরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। জীবনের এই আকস্মিক নাটকীয়তা সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। বিশেষ করে নবদম্পতি, কিংবা ছোট শিশুগুলোর ছবি কেউই মাথা থেকে সরাতে পারছে না। গতকাল রাতে আমার নিজেরও ভাল ঘুম হয়নি, দুঃস্বপ্ন দেখেছি, নিজের ছেলেকে জড়িয়ে ধরেছি কিছুক্ষন পরপর। কে জানে, কয়দিন এই সুযোগ পাব! মনে পড়ে গেল একবার বাবার সাথে কথা কাটাকাটি থেকে অভিমান করে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। তাঁরা তখন আমার বাসায় বেড়াতে এসেছেন। এক মাস পরেই দেশে ফেরত যাবেন। এক রাত শুধু কথা বলিনি। সারা রাত ছটফট করেছি। ভেবেছি শুধু শুধু ফালতু বিষয় নিয়ে এইসব মান অভিমান পুষে রেখে লাভ কী? নিজেরই তো বাবা। আর কবে এমন সুযোগ আসবে তাঁকে কাছে পাবার?

পরেরদিনই আমরা বাপ ব্যাটা এমন ভাব নিলাম যেন আগেরদিন কিছুই ঘটেনি। এর এক বছর পরেই এক সকালে বাবার হার্টঅ্যাটাক হলো, এবং সব শেষ। হ্যাঁ, আমার বাড়িতে বাবার আর কোনো দিন আসা হয়নি। জীবন এমনই অনিশ্চিত। মৃত্যুই একমাত্র নিশ্চয়তা যেদিকে আমরা সবাই ধাবমান। এবং প্রতিবারই সে আমাদের চমকে দেয়! তা এইসব বিমানযাত্রীদের সাথেও আমরা সবাই সহজেই নিজেদের সংযুক্ত করে ফেলেছিলাম তাঁদের এই ফেসবুকীয় পোস্টগুলোর কারণেই। আমরাও তো এভাবেই যেকোন আনন্দের আগে নিজেদের খুশি সবার সাথে শেয়ার করি। এবং আমাদেরও তো জীবনে এমন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমি নিশ্চিত বস্তিবাসী বা নিহত শ্রমিকদের জীবনের গল্পগুলো যদি সবাই জানতে পারতো, তাহলে একইরকম মাতম উঠতো যেমনটা বিমান দুর্ঘটনার কারণে উঠেছে। এখানে ধনী গরিব কোন ইস্যু না, আমরাও তো মানুষ, আমাদের বুকেও হৃদপিন্ড আছে, যা অন্যের কষ্টে হাহাকার করে উঠে।

একদল লোক ঘেউ ঘেউ শুরু করেছে মহিলা পাইলটের কারণেই নাকি এমনটা হয়েছে। মেয়েদের দিয়ে কাজ করালে দুর্ঘটনা তো ঘটবেই। আসলে তাদেরও দোষ দিয়ে লাভ নেই। নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই তারা বলছে। তাদের পিতাগণ তাদের মাতাগণকে তাদেরকে দুনিয়াতে আনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন, এবং তারাই প্রমাণ করে তাদের জন্মগ্রহণ করাটা মানব ইতিহাসের জন্য কত বড় দুর্ঘটনা ছিল! কাজেই, তারা অভিজ্ঞতা থেকেই ধরে নিয়েছে, যেহেতু তাদের মায়েরা তাদের জন্ম দিয়ে দুর্যোগ ঘটিয়ে ফেলেছেন, কাজেই মহিলা মাত্রই যাবতীয় দুর্ঘটনার কারণ। ওদের পাত্তা দিয়ে লাভ নেই। ওরা ঘেউ ঘেউ করতে থাকুক। আমরা বরং পৃথুলাকে নিয়ে কথা বলি। বাংলাদেশের গর্ব যে এমন একটি মেয়ে বাংলাদেশে জন্মেছিল। আমাদের মতন নোংরা, স্বার্থপর, অসুস্থ মানসিকতায় ভরপুর একটি সমাজে এমন মেয়ের জন্ম নেয়ার কথা ছিল না। তাঁর মতন মেয়ে আমাদের সমাজের জন্য স্রষ্টার করুনা এবং মিরাকেল ছাড়া আর কিছুই না।

কিছুদিন আগে নিরজা নামের একটি সিনেমা (সোনম কাপুর এবং শাবানা আজমী) দেখেছিলাম। বলিউডে এত ভাল সিনেমা খুব কম তৈরী হয়। সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত সিনেমা, যেখানে দেখায় একটি হাইজ্যাক হওয়া বিমানে একজন এয়ারহোস্টেস কিভাবে মৃত্যুর গরম নিঃশ্বাস কাঁধে নিয়েও তাঁর দায়িত্ব পালন করে গেছে। শেষ পর্যন্ত মেয়েটি মারা যায়। একটি সম্ভাবনাময় প্রাণের অকাল মৃত্যু। খুব কম সিনেমা দেখে চোখ ঝাপসা হয় আমার, এই সিনেমায় মেয়েটির জন্য আমি কেঁদেছিলাম। এবং অন্তর থেকে দোয়া করেছিলাম তাঁর জন্য, তাঁর মায়ের জন্য, তাঁর পরিবারের জন্য। সময় পেলে সিনেমাটা দেখে নিবেন। বস্তাপঁচা মশলাদার সিনেমা দেখে পেট পঁচাবেন কেন? এই সিনেমা আত্মার উন্নতির জন্য দেখুন।

এবং কল্পনা করুন ভারতীয় নয়, আমাদের দেশের মেয়েটি মৃত্যুর একদম বুকের উপর দাঁড়িয়ে জীবনের জয়গান গাইছে। তাঁর হাত ধরেই দশটি ভিনদেশি প্রাণ এখনও পৃথিবীর বুকে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। তাঁর বীরত্বে বিদেশী মিডিয়া পর্যন্ত হতবাক হয়ে গিয়ে অকুন্ঠ প্রশংসায় কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে। কুরআনের সেই আয়াতটির কথা মনে পরে যায়, “যে একজন মানুষের প্রাণ রক্ষা করলো, সে যেন গোটা মানবজাতির প্রাণ রক্ষা করলো।”

পৃথুলা সেখানে দশজনের প্রাণ রক্ষার জন্য সরাসরি যুক্ত। কুরআন অনুযায়ী তাঁর স্থান তাহলে কোথায় বুঝতে পারছেন? এইসব ঘেউ ঘেউ করা কুকুরের কী যোগ্যতা তাঁর নাম মুখে নেয়ার?

এই মেয়েটিকে নিয়ে আমরা গর্ব করবো না তো কে করবে? ভারত বলেই নিরজাকে ওরা হারিয়ে যেতে দেয়নি। সেলুলার সিনেমায় তাঁকে অমর করে রেখেছে। বাংলাদেশে কী কোনদিন এই বাঘিনীকে নিয়ে গল্প লেখা হবে? সিনেমা তৈরী হবে? ছোটবেলায় শিখেছিলাম কীর্তিমানের মৃত্যু নেই। একটি বীজ থেকে জন্ম নেয় মহীরুহের, হাজার হাজার ফলের। কয়টা মেয়ে (এবং ছেলেও) মনে মনে প্রতিজ্ঞা নিয়েছে ভবিষ্যতে কিছু হতে হলে পৃথুলার মতন হবো, স্বার্থপর নপুংশকের হাজার বছরের জীবনের চেয়ে বাঘিনীর মৃত্যু অনেক ভাল। এই এক পৃথুলা যে কত মৃতপ্রাণকে জীবিত করে গেল সেই হিসেব সময়ই দিবে।

হ্যাঁ, যদি সে আমার নিজের মেয়ে হতো তাহলে তার উপর আমার খুব অভিমান হতো। স্বার্থপর পিতার স্বার্থপর প্রেম বলে কথা! কেন তুই অন্যের জন্য নিজের প্রাণ দিতে গেলি? একবারও কী তোর বাবার কথা, মায়ের কথা মনে আসেনি? একবারও কী মনে হয়নি তোর মৃত্যুতে তোর স্বজনেরাও মারা যাবে? খুব অভিমান হতো তার উপর। এবং তারপর নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতাম। সিজদাহ দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে তাঁকে ধন্যবাদ দিতাম যে আমার মতন অধমের ঘরে তিনি এমন এক মহামানবীর জন্ম দিয়েছিলেন। এবং সেই সাথে আফসোস করতাম, আমাকে এরকম আরও দশটা কেন সন্তান দিলেন না!

পরম করুণাময় সবার উপর তাঁর করুণাবর্ষণ করুন। কোন পিতাকে যেন তাঁর সন্তানের জানাজা কাঁধে নিতে না হয়। কোন মা’কে যেন সন্তানহারা না হতে হয়। কোন শিশু যেন পৃথিবী দেখার আগেই চিরতরে চোখ না বুজে। এই পৃথিবীটা অসম্ভব রকমের সুন্দর! কেউই যেন সময়ের আগে এখান থেকে বিদায় না নেয়।


আরও পড়ুন

৪ Comments

  1. I just want to say I am just new to blogging and site-building and certainly savored you’re page. Likely I’m planning to bookmark your blog . You absolutely have outstanding articles and reviews. Thanks a bunch for sharing your website page.

  2. My brother suggested I might like this website. He was entirely right. This post actually made my day. You cann’t imagine just how much time I had spent for this info! Thanks!

Comments are closed.